‘মেয়েদের ধরতে হলে তাদের যৌনাঙ্গ খামচে ধরতে হয়। তাহলেই তুমি ওদের যা খুশি তাই করতে পারো’--- ট্রাম্প বলেছিলেন ২০০৫ সালে। এই নারীবিদ্বেষী ট্রাম্প আজ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি আরও নারীবিদ্বেষী মন্তব্য করে যাচ্ছেন। তিনি নারীকে বিচার করেন নারী দেখতে কেমন তা দিয়ে। একবার তিনি এস্কোয়ার ম্যাগাজিনকে বলেছিলেন, ‘যদি তোমার একটা যুবতী আর সুন্দরী ‘পিস অফ অ্যাস’ থাকে তাহলে কারা তোমাকে নিয়ে কী লিখলো না লিখলো কিছু যায় আসে না’। যে লোক মেয়েদের ‘শুয়োর, নোংরা, জঘন্য জন্তু’ বলেন, ‘যৌনাঙ্গ’ ছাড়া আর কিছু মনে করেন না মেয়েদের, তিনি কেন ওভাল অফিসে মেয়েরা হাই হিল আর স্কার্ট জাতীয় ‘মেয়েদের পোশাক’ পরে ঘোরাঘুরি করুক চাইবেন না? যে লোক ১৯৯৬ সালে আমেরিকার মিস আমেরিকা সুন্দরী প্রতিযোগিতায় বলেছিলেন, ‘বিকিনি আরও ছোট হতে হবে, হিল আরও উঁচু হতে হবে’, তিনি কেন চাইবেন না ওভাল অফিসেও মেয়েরা যৌনাবেদনময়ী হয়ে থাকুক। সুন্দরী প্রতিযোগিতার দিন ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আপনারা যদি কোনও রকেট সায়েন্টিস্টকে দেখতে চান, তাহলে আজ রাতে টিউন করবেন না, যদি সত্যিকারের সুন্দরীকে দেখতে চান, তবেই করবেন’। ট্রাম্প ধরেই নিয়েছেন যে মেয়েরা রকেট সায়েন্টিস্ট তারা সুন্দরী নয়। যে মেয়েরা গুণী সে মেয়েরা সুন্দরী নয়। মেয়েরা তার কাছে নিতান্তই মুখ, বুক, পেট, নিতম্ব, যৌনাঙ্গ। মেয়েরা তার কাছে নিতান্তই শরীর।
রিয়ালিটি টিভি শো করতেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি কি হোয়াইট হাউসে ‘দ্য রিয়্যাল হাউজওয়াইফ’ নামের রিয়ালিটি শো’র মতো শো চাইছেন, যে শো’তে মেয়েরা আসে সেজেগুজে শরীর দেখানো পোশাক পরে? ওরকম পোশাক যদি মেয়েরা পরতে চায় পরবে, কিন্তু পোশাক বিধি কেন থাকবে হোয়াইট হাউসে? মেয়েদের কেন তাদের শরীর আর পোশাক দিয়ে মাপা হবে হোয়াইট হাউসে, হোয়াইট হাউস কি র্যাম্প নাকি যেখানে সুন্দরীদের কোমর বাঁকিয়ে হাঁটতে হবে? মেয়েদের তো মাপা উচিত তাদের কাজ দিয়ে। পুরুষদের মাপা হয় তাদের কাজ দিয়ে, কিন্তু মেয়েরা পুরুষ যা করতে পারে, মেয়েরাও তা পারে প্রমাণ করার পরও মেয়েদের শারীরিক সৌন্দর্যকে মেয়েদের একমাত্র পরিচয় করে তোলে নারীবিদ্বেষী লোকেরা। ঘরে তো বটেই, ঘরের বাইরে মেয়েদের যে নিষ্ঠা, দক্ষতা, সাফল্য – তা যেন কোনও ঘটনা নয়।
হাজারো মেয়ে প্রতিবাদ করছে। টুইটারে হ্যাশট্যাগ পড়েছে #ড্রেসলাইকএউওম্যান। নারীর গুণকে যারা তুচ্ছ করে, নারীর রূপকে নারীর একমাত্র পরিচয় বলে মনে করে – তাদের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা সম্পর্কে আমরা জানি। তাদের আমরা শিক্ষিত করার চেষ্টা করি। কিন্তু তাদের মধ্যে একজন আমাদের চোখের সামনে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে মানুষকে নষ্ট করতে চাইছেন, কথায় বার্তায় আচার আচরণে নারীকে যৌনবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করছেন--- এ সময় প্রতিবাদ না করলে চলবে কেন! প্রেসিডেন্ট খুব শক্তিশালী কেউ। সাধারণ মানুষ ক্ষমতাশালী শক্তিশালী বিত্তশালী—এসব মানুষ দ্বারা ভীষণ রকম প্রভাবিত হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আজকের নারীবিদ্বেষ লক্ষ মানুষের নারীবিদ্বেষে উৎসাহ জোগাবে। সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পাবে নারীবিদ্বেষ। মানবসভ্যতার ক্ষতি এর চেয়ে বেশি কী আর আছে!
যে সমাজে নারীনির্যাতন, নারীধর্ষণ, নারীহত্যাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত করা হতো না, সেই সমাজকে ধীরে ধীরে সভ্য করছি আমরা, সেই সমাজে আমরা নারীর সমানাধিকার হয় প্রতিষ্ঠিত করেছি, নয়তো সমানাধিকারের জন্য জোর আন্দোলন করছি। যে সমাজে মেয়েদের সতিদাহের আগুনে পুড়তে হতো, স্কুল কলেজে পড়ার অনুমতি ছিল না, সেই সমাজে মেয়েরা এখন বড় বড় শিক্ষাবিদ, বড় বড় বিজ্ঞানী, বড় বড় চিকিৎসক, বড় বড় প্রকৌশলী। পুরুষেরা যা, তার কী নয় আজ মেয়েরা? যতটুকু এগিয়েছে সমাজ, ততটুকু পেছনে টানতে ট্রাম্পের মতো মানুষের জুড়ি নেই। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যদি নারীকে যৌনবস্তু হিসেবে দেখতে পারেন, তবে আমাদের দেখতে দোষ কী! এটি এখন অনেকের মনের কথা। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের উচিত নারীবিদ্বেষী ট্রাম্পকে শিক্ষিত করা। যে লোক বিত্তের জোরে অশিক্ষিত হয়ে থাকতে আপত্তি করেন না, তাকে শিক্ষিত করতে আমেরিকার আদালত অবশ্য ভালো ভূমিকা নিয়েছে। আদালত এর মধ্যেই ট্রাম্পের মুসলিম বিরোধী পদক্ষেপের লাগাম টেনে ধরেছে, সাতটি মুসলিম দেশের মানুষের আমেরিকা ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন ট্রাম্প, তার সেই আদেশ আদালত স্থগিত রেখেছে। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা অর্ধেক কমে গেছে, জরিপেই দেখা যাচ্ছে। প্রবল হতাশার মধ্যে এটুকুই আশা।
লেখক: কলামিস্ট