শেষমেষ তাকে ফেরানো যায়নি। বৃষ্টির কান্না উপেক্ষা করে পুলিশের যে চৌকস দলটি শহীদ মিনারে তাকে গান স্যালুট দিলো, বিউগলে তাদের করুন সুর শুনে লাকী আখন্দের কী মনে হয়েছিল যে এটা শেষ খেলার সুর কিংবা হাসিমুখে বিদায়? তার কি মনে হয়েছিল এটা কবিতা পড়ার প্রহর? আকাশ ভাঙা বৃষ্টির কান্নায় সীমান্তের ওপাশে শুয়ে তার কি মনে পড়েছিল প্রিয় ছোট ভাই হ্যাপী আখন্দের মুখ? নাকি তিনি ভেবেই রেখেছিলেন যেভাবে ফিরে আসে বদলে যাওয়া বাতাসের বেগ, বিনাশি আবেগ কিংবা ক্ষয়ে যাওয়া অভিমানি ঢেউ সেভাবে তিনি আর কখনওই ফিরবেন না! যেন তিনি জানতেন যতোটুকু জল টেনে নেয় ভাটা তার সবটুকু ফেরে না জোয়ারে!
তবে তার ফেরার ইচ্ছে ছিল প্রবল! অন্তত প্রিয় মানুষদের বলতেন তার একটা প্রিয় গানের কথা। সেই গানটা ছিল এমন-পলাতক আমি বহু জনপদ ঘুরে! আবার এলাম তোমার কাছেই ফিরে! পেরিয়ে এসেছি অজস্র নদী সময়ের হাত ধরে/এসেছি আবার মোমেরই স্নিগ্ধ তোমারই শূন্য ঘরে! সেই রিক্ত বেদনাসিক্ত ঘরটাতেই হয়তো তিনি ফিরেছেন, থাকবেনও নিজের মতো করে একা! স্মরণের জানালায় দাঁড়িয়ে থেকে আমরা তাকে কখনও ডাকতে ভুলবো না!
ভুলবো না তার অমর কীর্তি। পরবর্তী কালে বহুবার তিনি গানে গানে বলেছেন আগে যদি জানতাম তবে মন ফিরে চাইতাম! তবে মন তাকে ফেরাতে পারেনি। ১৯৭১ সালে মাত্র ষোল বছর বয়সে দেশের টানে তিনি দেশ ছেড়েছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের তিনি ছিলেন কণ্ঠ সৈনিক। ‘মজিবর মজিবর’ এই শিরোনামে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটা গানের সুর করেছিলেন তখন। লাকি আখন্দ নামের একজন কিশোরের সুর করা আরও একটি গান তখন জনপ্রিয় হয়। সেই গানটির প্রথম লাইন ছিল এমন-জন্মভূমি বাংলা মাগো শুধাই তোমারে। এদেশের খুব কম মানুষই জানেন যে এই লাকি আখন্দ মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সেই এইচএমভি পাকিস্তানের সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে অন্তর্ভূক্ত হন। পনের বছর বয়সে অন্তর্ভূক্ত হয়েছিলেন এইচএমভি ইন্ডিয়াতে!
স্বাধীনতার পরপর বিজয়ীর বেশে দেশে ফিরেও মন থেকে গানকে ফেরাতে পারেননি। সেই একদিন ছিল বাংলাদেশের। যুদ্ধ ফেরত লাখো যুবকের চোখে তখন দেশ গড়ার স্বপ্ন। ছিল প্রতি বিপ্লবের হাতছানি আর মানুষকে বিভ্রান্ত করার শত আয়োজন। তবু আজম খান কিংবা লাকি আখন্দরা বিভ্রান্ত হলেন না। মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট ভাঙিয়ে জমি কিংবা পরিত্যক্ত কারখানা দখল করতে গেলেন না। পাটের গুদামে আগুন লাগাতে কিংবা নব্য ব্যবসায়ী হয়ে টু পাইস কামাতে নামলেন না। যে হাতে ছিল স্টেনগান সেই হাতেই ধরলেন গিটার। যে আঙুলের পরশ না পেলে গর্জে উঠতো না বন্দুক সেই আঙুলই রাখলেন হারমোনিয়াম আর কি-বোর্ডে। স্বাধীনতার পর পর আমরা পেলাম ঝাকড়া চুলের গান পাগল কিছু যুবককে। তারা বাংলা গানের প্রচলিত ফর্মটা ভেঙে দিলেন। হারমোনিয়াম ঢোলের সঙ্গে স্টেজে দেখা গেল কঙ্গো, গিটার এবং পরে কী-বোর্ড। চওড়া কলারের টাইট জামা আর বেলবটম প্যান্ট পরা ঝাকড়া চুলের যুবকরা গানে আনলেন নতুন ধারা। তাদের পোশাকই এদেশের তরুণ যুবকের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ালো। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে এই গান পপ গান হিসেবে দারুন জনপ্রিয়তা পেল। আজম খান যখন গাচ্ছেন- ওরে সালেকা ওরে মালেকা, হাইকোর্টের মাজারে কত ফকির ঘোরে কিংবা রেল লাইনের ওই বস্তিতে ঠিক তখন লাকি আখন্দ নিয়ে আসেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সুর। নিজে তখনও খুব কমই গান, তার সুরের গান শুনি আমরা অন্য শিল্পীদের কণ্ঠে। যেমন-মামনিয়া মামনিয়া কিংবা আগে যদি জানতাম তবে মন ফিরে চাইতাম! তারও কিছুদিন পরে সারা বাংলাদেশ যেন ভেসে গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের এক গানের সুরে। আর সেই গানটি হচ্ছে- আবার এলো যে সন্ধ্যা শুধু দুজনে... বাংলার মানুষের মনে ঢুকে গেলো এই গান, প্রায় সব শ্রেণির মানুষের আত্মার গান হয়ে উঠলো এটি। গানটি শ্রদ্ধেয় সালাউদ্দিন জাকি তার ঘুড্ডি ছবিতে ব্যবহার করেছিলেন। লাকি আখন্দ এই ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার সাথে যুক্ত ছিলেন। এই ছবির আরও একটি গান ধুন্দুমার জনপ্রিয় হয়ে যায় তখন। গানটি ছিল -কে বাঁশি বাজায় রে! মন কেন নাচায় রে!
রূপকথার গল্পের মতো হ্যামিলিনের বাঁশিওয়ালা হয়ে এরপর সুর তুলেছেন অদ্ভুত অদ্ভুত সব গানে। একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় বাংলা গানকে আধুনিকত্বের ছোঁয়া দিতে পেরেছিলেন তিনি। ১৯৮৪ সালে নিজের একক অ্যালবাম নিয়ে হাজির হন লাকী আখন্দ। বাংলা গানের অন্যতম সেরা একটা অ্যালবাম সেটি। এই নীল মনিহার এই স্বর্নালী দিনে, আমায় ডেকো না ফেরানো যাবে না, আগে যদি জানতাম, রীতিনীতি জানি না প্রেমপ্রীতি বুঝি না, পলাতক আমির মতো গানগুলো আজো মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
শুধু কেন যেন তিনি জীবনে ফিরতে পারেননি! নিয়তি যেমন তাকে দিয়েছে অনেক, কেড়ে নিয়ে সর্বশান্ত করেছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি। স্বাধীনতার কিছুদিন পর থেকেই প্রিয়তম ছোট ভাই হ্যাপী আখন্দকে নিয়ে গান করতেন। দুই ভাইয়ের গানের অনুষ্ঠান দেশে বিদেশে দারুণভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। দুই ভাইয়ের ঐকান্তিক চেষ্টার ফসল হচ্ছে কে বাঁশি বাজায় রে, আবার এলো যে সন্ধ্যা, এই নীল মনিহার কিংবা তুমি কী দেখেছ পাহাড়ি ঝর্ণার মতো গানগুলো। শচীনদেব বর্মনের মতো সঙ্গীতজ্ঞ দুই ভাইয়ের সুর আর গানের প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু বিধিবাম। প্রথম আঘাত এসেছিল পরিবার থেকেই। লাকী আখন্দের বাবা মা আলাদা হয়ে গেলেন। বাবা আব্দুল হক বাংলাদেশ বেতারের সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন। মা নূরজাহান খানম ছিলেন গৃহিনী। তাদের পৃথক হয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছিল যেন তাদের ছেলে মেয়ের জীবনে। সে সময়ে হ্যাপী আখন্দ হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে গান বাজনা করতেন। নিঃস্ব অভিমানে হ্যাপী ক্রমশ এই গান বাজনার জগত থেকে আলাদা হতে শুরু করেন। তার প্রিয় বন্ধুরা যখন হ্যাপীকে জিজ্ঞাসা করতেন হ্যাপী তখন উত্তরে নাকি একটা কথাই বলতো- সময় এখন নিজের ভেতর নিঃস্ব হলেই পারি! বাবা মার বিচ্ছেদের পর বড় ভাই শেলি মারা যান বুড়িগঙ্গায়। পরিবারটা আরও বেশি অসহায় হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ বেতারে লাকী আখন্দের চাকরিটাই ছিল সম্বল। নিঃস্ব হতে হতে হ্যাপী যে জগতে চলে গিয়েছিল সেই জগত থেকে তাকে ফিরিয়ে আনা যায়নি। ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে ঘুমের ভেতরেই মারা যান বাংলা আধুনিক গানের আরেক ক্ষণজন্মা শিল্পী হ্যাপী আখান্দ। ব্যান্ড গায়ক মাকসুদ, লাকী আখন্দসহ আরও অনেকেই হ্যাপীকে নিয়ে গান বেধেছেন, আজও সেইসব গান এই প্রজন্মের কোনও না কোনও গায়ক গায়! হ্যাপীকে হারানোর বেদনা ভুলতে পারেননি লাকী আখন্দ। পরবর্তী দশ বছর তিনি গান থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যান। যেন হ্যাপীর ওই কথাটাই তাকে তুমুল বেদনায় স্তব্ধ করে দিতো- সময় এখন নিজের ভেতর নিঃস্ব হলেই পারি!
হ্যাপীর কণ্ঠে রেকর্ড করা কয়েকটি গান এবং নিজের গাওয়া কিছু গান নিয়ে ফিরেছিলেন নব্বই দশকের শেষ দিকে। দীর্ঘ নীরবতার পর তার গাওয়া- আজ আছি কাল নেই অভিমান রেখ না কিংবা জিপসীরা ঘর বাধে না’র মতো গানগুলো আবারো জনপ্রিয় হয়। দীর্ঘদিন পর আইয়ুব বাচ্চু, তপন চৌধুরী আর জেমস এর জন্য একটা অ্যালবাম করেন লাকী আখন্দ। স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বাধিক বিক্রিত অ্যালবামগুলোর একটা হচ্ছে ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’। গোলাম মুর্শিদের লেখা ও জেমসের গাওয়া- লিখতে পারি না কোনও কিছু আজ তুমি ছাড়া, কিংবা ভালোবেসে চলে যেও নার মতো গানগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। গানের ক্ষেত্রে ‘এভার লাস্টিং সং’ বলে একটা কথা আছে। লাকী আখন্দের অনবদ্য সৃষ্টি আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে, কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে কিংবা যেখানেই সীমান্ত তোমার এর মতো গানগুলো আসলে কালজয়ী গান।
স্মরণের জানালা থেকে এই নীল মনিহার, আবার এলো যে সন্ধ্যা, আগে যদি জানতাম কিংবা আমায় ডেকো নার মতো গানকে কখনওই মুছে ফেলা সম্ভব না।
আর তাই আকাশ আর বৃষ্টির কান্না দেখে লাকী আখন্দের কথা মনে পড়বেই। চিরচেনা মানুষের সাথে বিচ্ছেদ হলেও তার কথা মনে পড়বে। কেউ কেউ তখন গাইবে- আগে যদি জানতাম তবে মন ফিরে চাইতাম! স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা কিংবা চিরায়ত প্রেমিক প্রেমিকারা তখনও গাইবে- আবার এলো যে সন্ধ্যা/শুধু দুজনে /চলো না ঘুরে আসি অজানাতে/যেখানে নদী এসে থেমে গেছে। যেখানে নদীরা থেমেছে ঠিক সেখানেই চলে গেছেন লাকী আখন্দ!
বিশেষ দ্রষ্টব্য: শিল্পীর পাশে আমরা সংগঠনের এরশাদুল হক টিংকু লাকী আখন্দ অসুস্থ হওয়ার পর সার্বক্ষণিক তার সাথে থাকতেন। যখনই খুব বেশি অসুস্থ হয়ে পড়তেন, টিংকুকে ইশারা দিয়ে লাকী আখন্দ নিজের বুকটা দেখাতেন। সেখানে হাত রাখার পর টিংকুকে কানে কানে বলতেন- হ্যাপী হ্যাপী! শহীদ মিনারে ঝুম বৃষ্টির ভেতর টিংকু একবার বললো লাকী ভাই হ্যাপীর কাছে চলে গিয়েছেন। সংগীত পরিচালক শওকত আলী ইমন অসুস্থ লাকী ভাইকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। লাকি ভাই তাকে বলেছিলেন- তুমি আমাকে কবরে নামানোর সময়ে থেকো ইমন। এক মুঠো মাটি দিও! ফেসবুকে শওকত আলী ইমন লিখেছে- লাকী ভাই আমি আমেরিকায়। আপনার কথা রাখতে পারলাম না! কান্না ছাড়া আপনাকে দেবার আর কিছু নেই। নাট্যকার আক্তার ফেরদৌস রানা (ফেরদৌস হাসান) জানিয়েছেন ট্রেনে করে তাদের দুজনের হারিয়ে যাবার কথা ছিল। রানা ভাই জানতে চেয়েছেন কতোদূর ট্রেনে চড়ে গেলে লাকী আখন্দকে পাওয়া যাবে? একশ কিংবা একহাজার মাইল? লাকি ভাইয়ের কাছ থেকে বাংলার একটা সেরা গান নিয়ে ফিরতে চান তিনি।
দ্বীপ জ্বালা রাতে জীবনের সব আঁধার কেটে গেলেও লাকী আখন্দকে আর ফেরানো যাবে না!
লেখক: রম্যলেখক