আওয়ামী আমলের তিন নির্বাচনের পর (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪) আওয়ামী লীগ কল্পনাও করতে পারেনি যে তাদের একদিন পতন হবে। নিয়তি এই যে ২০২৬-এ যারা নির্বাচিত হবে তারা ভাববে এর চেয়ে হেরে যাওয়া ঢের ভালো ছিল!–– ভবিষ্যদ্বাণী।
ভবিষ্যদ্বাণীর কথা লেখার শেষে থাকবে। জেনারেল জিয়াউর রহমান বীরউত্তম ও তাঁর পুত্র তারেক রহমানের মিল ‘ডিফিকাল্ট’ বিষয়ে। জিয়াউর রহমান বলেছিলেন–‘আই উইল মেক পলিটিক্স ‘ডিফিকাল্ট’। রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি কঠিন করে দেওয়ার কথা তিনি বলেছিলেন। আর তারেক রহমান বলেছেন–এবারের নির্বাচন খুব ‘ডিফিকাল্ট’ হবে। নির্বাচনি বৈতরণী পাড়ি দেওয়া আগের মতো সহজ হবে না! এই লেখাটা সেই ডিফিকাল্ট বিষয়ে!
প্রথমেই প্রশ্ন–
প্রশ্ন নম্বর– এক. নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সবচেয়ে ভালো কথা কোথায় লেখা থাকে?
উত্তর–সরকারি প্রেসনোটে।
প্রশ্ন নম্বর– দুই. যদি সন্দেহ হয়?
উত্তর– প্রশ্ন নম্বর এক এর উত্তর মেনে চলুন।
ভয়টা এই প্রশ্নের ভেতরেই আছে। আমাদের ‘নির্বাচনি কপাল’ খুব খারাপ। এবার মোটাদাগে কিছু নির্বাচনি তথ্য (সত্য) তুলে ধরি–
এক. স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুর নির্বাচন থেকে শুরু করে (১৯৭৩) ১৯৯০-এর ডিসেম্বরে এরশাদের পতন পর্যন্ত যে চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল, প্রত্যেকটি বিতর্কিত ছিল। ১৯৯১ সালের নির্বাচনকে সবচেয়ে ‘ছহিহ’ নির্বাচন ধরা হয়। এই অভিজ্ঞতায় এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বাংলাদেশে ‘ছহিহ’ নির্বাচনের কোনও রেকর্ড নাই!
দুই. ২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তোলেন। এক এগারোর সময় কালকে বলা হয় সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাল। আওয়ামী লীগের অধীন ২০১৪, ২০১৮ আর ২০২৪-এর নির্বাচনের নাম ছিল যথাক্রমে একদলীয় একপক্ষীয়, দিনের নির্বাচন রাতে আর ‘আমি ডামি’র নির্বাচন। ২০২৬-এর নির্বাচন কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হচ্ছে, আদালতের রায় থাকা সত্ত্বেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হচ্ছে না! ২০০৮-এর মতো এই নির্বাচনও কি বিএনপির জন্য ‘ডিফিকাল্ট’?
তিন. বিএনপি জামায়াতসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো যখন নির্বাচনে অংশ নিতো না তখন আওয়ামী লীগ বলতো সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণেই নির্বাচন হচ্ছে কিন্তু সারা বিশ্বের মিডিয়া বলতো সবার অংশগ্রহণে বা ‘ইনক্লুসিভ’ নির্বাচন হচ্ছে না। ২০২৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ আরও কিছু দল অংশ নিচ্ছে না। তাহলে এটা কি ‘ইনক্লুসিভ’ নির্বাচন হচ্ছে? এর উত্তর আওয়ামী লীগ যা দিতো, ড. ইউনূস সরকারের কর্তাব্যক্তিরাও তাই দিচ্ছেন। নতুন একটা কথা যোগ হয়েছে– আওয়ামী লীগ এত তাড়াতাড়ি ‘অপ্রাসঙ্গিক’ হয়ে যাবে কেউ ভাবেননি!
কেউ কেউ বলেন, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মানুষ ভোট দেয় পরবর্তী পাঁচ বছর কার দ্বারা শোষিত হবেন সেটা ঠিক করতে। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না, জানা থাকলেও ভোট এক উৎসবের নাম। এই উৎসব না থাকলে নাকি গণতন্ত্রই থাকে না! নির্বাচন গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলেও রাজনীতিবিদরা দেশটা ভালো চালাবেন এর কোনও নিশ্চয়তা নেই। বাংলাদেশে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর নির্বাচন সে সময়কার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কাছে ছিল নিয়ম ও সংবিধান রক্ষার নির্বাচন। আর বিরোধীদের কাছে এই তিন নির্বাচন ছিল একপেশে- একদলীয়, দিনের ভোট রাতে ও আমি-ডামির নির্বাচন। ক্ষমতায় থাকলে আপনি অনেক কিছু করতে পারেন। ক্ষমতা হারানোর পর দেশে থাকতে পারবেন কিনা নির্বাচনের আগে সেটাও ভেবে রাখা দরকার। ২০০৭-২০০৮-এর পরে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ফখরুদ্দীন সাহেবদের মতো ২০২৪-এ শেখ হাসিনাও দলবলসহ দেশে থাকতে পারেননি। সেই তুলনায় স্বৈরাচার এরশাদ ভাগ্যবান। জেলে যেতে হলেও তিনি দেশে থাকতে পেরেছিলেন। ড. ইউনূস ও তার উপদেষ্টাদের ভাগ্যে কী আছে সেটা এখন না বলি। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে যথেষ্ট সংশয় ও শঙ্কা আছে।
এবার নির্বাচন নিয়ে কিছু প্রশ্ন ও উত্তর পরখ করে দেখা যাক–
এক. ‘ইনক্লুসিভ’ নির্বাচন কী?
উত্তর– প্রশ্ন করার মতো একটা নির্বাচন। এ দেশে ‘ইনক্লুসিভ নির্বাচন সহসা হয় না! ২০১৪ এবং ২০২৪-এর যে নির্বাচন সেখানে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী অংশ নেয়নি। ২০২৬-এ যে নির্বাচন হবে সেখানেও আওয়ামী লীগ অংশ নেবে না। শেষমেশ কী হলো?
দুই. এই নির্বাচন নিয়ে এত শঙ্কা কেন?
উত্তর– নির্বাচন হলে বোঝা যাবে! না হলেও বোঝা যাবে!
তিন. ‘বি টিম’ কাকে বলে?
উত্তর– জামায়াতে ইসলামীর সাথে নির্বাচনি জোট করেছে এনসিপি। অনেকেই বলছেন শুরু থেকেই তারা জামায়াতের বি টিম ছিল!
চার. এনসিপি জামায়াতের বি টিম অথবা জামায়াতে বিলীন হইলে লাভ কার?
উত্তর– কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের! তারা প্রথম থেকে বলে আসছিল ২৪ নাকি বিএনপি-জামায়াত ষড়যন্ত্রের ‘মেটিকুলাস’ ডিজাইনের ফসল। মূলত জামায়াত এনসিপিকে সামনে রেখে এটা করেছে!
পাঁচ. উভয় সংকট কী?
উত্তর– বর্তমান আওয়ামী লীগ হচ্ছে উভয় সংকট। নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি বলে ‘অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচন হবে না, হবে সংকটমূলক। আবার আওয়ামী ভোট যার মার্কায় যায় সেটা নিয়েও সংকট ও শঙ্কা বাড়বে। যে জিতবে বলা হতে পারে সে বা তারা স্বৈরাচারের অনুগতদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছে!
ছয়. রাজনীতিবিদ আর মোবাইলের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর– মোবাইলে ‘সাইলেন্ট মুড’ থাকে। রাজনীতিবিদদের থাকে না। নির্বাচন এলে কর্কশ রিংটোন আর ভাইব্রেশনের বাহার বাড়ে!
কোনও দল জিতলে কী করবে সেটা বলা থাকে ইশতেহারে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধী দলে গেলে কী করবেন এটা বলা থাকে না। জামায়াত, বিএনপি বা কোনও দলের ইশতেহারে এটা আছে বলে শুনিনি। কিন্তু যা শোনা যাচ্ছে–
এক. ২০০৮-এর মতো ‘মেটিকুলাস’ ডিজাইনে হবে ২০২৬-এর নির্বাচন। তখনও বিএনপি ডিজাইনের শিকার ছিল, এবারও কি তাই হবে? এরশাদের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজগুলোতে ছাত্রদল জয়লাভ করতো। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৯১-এ জাতীয় নির্বাচনে ভোটে জেতে বিএনপি। এবার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির জয়লাভ করেছে বলে প্রচার করা হচ্ছে জাতীয় নির্বাচনেও জামায়াত জিতবে। যে ডিজাইনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জিতেছে, এবারের নির্বাচনেও নাকি সেই ডিজাইন বহাল থাকবে। তাহলে? এমন প্রচারণা যখন তুঙ্গে তখন ভোটের মাত্র দুই দিন আগে পদত্যাগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. নিয়াজ আহমেদ খান। এটাকে উপলক্ষ করে এক রসিকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন–এটা দেখে প্লিজ ড. ইউনূস আপনি পদত্যাগ করবেন না!
দুই. ১৯৯১ সালে সর্বগ্রাসী প্রচারণা ছিল এই যে ক্ষমতায় আসবে আওয়ামী লীগ। সব হিসাব-টিসাব উল্টে দিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। এবারের প্রচারণা এমন– আওয়ামী লীগকে দেখেছি, বিএনপিকে দেখেছি, এবার জামায়াতকে দেখবো। প্রচারণায় বলা হচ্ছে যেভাবেই হোক জামায়াত ক্ষমতায় আসবে। ১৯৯১-এর মতো এমন প্রচারণা আবার উল্টো ফল দেবে না তো?
তিন. পাপ মোচনের সময় এখন। ড. ইউনূসের চমৎকার সুযোগ ছিল। তিনি একাত্তরের দিকে হাঁটেননি, উল্টো স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে হাত মিলিয়েছেন বলে অভিযোগ জোরদার হয়েছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নেই। বিএনপি যদি জামায়াতের সাথে ভবিষ্যতে ভোট বা অন্য কোন কারণে জোট না করে তাহলে ভবিষ্যতের রাজনীতিতে জামায়াত নির্ভরতা কমতে পারে। এই নির্বাচন হোক তার পূর্বাভাস। আওয়ামী লীগও জামায়াতের সাথে আঁতাত করেছিল, নির্বাচনে গিয়েছিল। বিএনপি বিরোধী আন্দোলন করেছিল। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের এখন বোঝা উচিত, জামায়াত যার কাছে যায় তাকে সে ‘গুপ্ত’ভাবে কুরে কুরে খায়।
রাজনীতিতে জামায়াতের চেয়ে বড় ঘুণপোকা আর নাই। ক্ষমতাসীন ড. ইউনূস সরকারের কিংস পার্টি বানানোর চেষ্টা, এনসিপির এক নেতাকে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী বলা, জামায়াত এনসিপি কেন্দ্রিক সব প্রচারণা, সব মেটিকুলাস ডিজাইন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংঘবদ্ধ প্রচারণা, প্রশাসনকে ব্যবহার, সব কিছু ছাপিয়ে বাংলাদেশের মানুষ সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে বলে বিশ্বাস করি। সঠিক জনরায়কে শ্রদ্ধা করাই গণতন্ত্রের বড় সৌন্দর্য।
বিষ চিরকালই বিষ। চুন খেয়ে মুখ পুড়েছে বলে দই দেখে ভয় লাগতে পারে। কিন্তু বিষ খাওয়ার কোনও মানে নেই। এ দেশের মানুষ জেনেশুনে বিষ পান করবে না! ভবিষ্যদ্বাণী এটাই! তবে এবার ভোট গুনতে যে সময় চেয়ে নেওয়া হয়েছে সম্ভবত নির্বাচনের ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ সেখানে লুকানো থাকতে পারে। ভোট শুরুর আগেই কেন্দ্রে উপস্থিত থাকা, কড়া নজর রাখা আর ‘ইউনূস লীগ’, ‘আনসার বা পুলিশ লীগ’ হয়ে বাংলাদেশ বিরোধী কোনও ভূত যেন চেপে বসতে না পারে সে বিষয়ে সাবধান থাকা জরুরি।
এবারের নির্বাচনে কি জালভোট পড়তে পারে? বলে রাখা ভালো যে এই লেখা বা নিচের গল্পের সাথে ২০২৬ সালের নির্বাচনের সাথে কোনও সম্পর্ক বা মিল নেই! গল্পটা ২০১৯-এর।
খুলনার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট দিতে গেছেন ৯২ বছর বয়সের এক বৃদ্ধ। তিনি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। পোলিং এজেন্ট বলল– দাদু আপনি তো ভোট দিয়ে গেছেন কিছুক্ষণ আগে। সম্ভবত ভুলে গেছেন। বৃদ্ধ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। পোলিং এজেন্ট আবারও বললো- দাদু শুধু আপনি না, দাদিমাও ভোট দিয়ে গেছেন। বৃদ্ধ হাউমাউ করে কান্না শুরু করলেন। তারপর কোনও মতে কান্না থামিয়ে বললেন– ও তো দশ বছর আগেই মারা গেছে। দশ বছর পরে ফিরে সে সরাসরি ভোটকেন্দ্রে আসলো, আমার সাথে একবার দেখাও করলো না! আমাকে সাথে নিয়ে ভোটও দিলো না!
এমন ভোটের সাথে আর কখনও আমাদের দেখা না হোক।
লেখক: রম্যলেখক




