প্রসঙ্গ জার্মান নির্বাচন

দাউদ হায়দারশীতের হাওয়ার নাচন পাতায় পাতায়, বৃক্ষ নিপত্র নয় এখনও, তবে ক্রমশ রঙিন, হলুদ, লাল। ঝরবে অচিরেই। জার্মানিসহ গোটা ইউরোপে। বদলাবে চেহারা। বদলের পালা রাজনীতির অন্দর-বাইরেও। লক্ষণ ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। জল ঘোলা করে সুবিধা হয়নি ব্রেক্সিটের। এখন ত্রাহি মধুসূদন।
জার্মানি ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বৃহত্তম দেশ, অর্থনীতিতে পয়লা, ইইউ’র মাতব্বর, শাহেনশাহও। ব্রেক্সিট ইতরামোয় আরও বেশি। ইইউ’র বাকি দেশ জার্মানির মুখাপেক্ষী। হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড ঘাড় কাৎ করছিল একটু-আধটু, জার্মানির ধমকে চুপ আপাতত। বলা ভালো অপেক্ষমাণ।
২৪ সেপ্টেম্বর জার্মানির সংসদীয় (লোকসভা) নির্বাচন। যে-দলই ক্ষমতাসীন হোক ‘ইউরোপের খোলনালচে পাল্টাবে’, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জনসভায় নেতা নেত্রীর বক্তৃতায়, কণ্ঠে ‘প্রতিজ্ঞা’ ধ্বনিত। কিন্তু কী পাল্টাবে? খোলাসা করা হচ্ছে না। কানার মনে-মনেই জানা। এই জানা, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অজানা নয়। বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন। ‘আমূল’ না হলেও ‘আংশিক’ তো বটেই। বিশেষত আমেরিকা এবং রাশিয়ার বেলায়। ইউক্রেনের ক্রিমিয়া নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে জার্মানিসহ ইইউ’র যে সমস্যা, টানাপোড়েন, নিজের স্বার্থেই জার্মানি চটজলদি মিটিয়ে ফেলতে চায়। কারণও আছে রাশিয়ার গ্যাসের ওপরে জার্মানি নির্ভরশীল; যদিও পুরোপুরি নয়। অর্ধেকের কম। রাশিয়ার গ্যাস না পেলে গ্যাসের-চুলো জ্বলবে না। বহু কলকারখানা অচল। নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ বন্ধ করছে জার্মানি, জনগণের চাপে করতে বাধ্য হচ্ছে। সৌরশক্তি (সোলার এনার্জি) মাত্র ১০ ভাগ, তা দিয়ে গোটা দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা অসম্ভব। শীত আসছে, বিপদ আরও। বেশি বিটলেমি করলে ‘খবর আছে’। জার্মানিকে হুশিয়ারি দিয়েছে রাশিয়া। অন্যান্য বাণিজ্যের ব্যাপারও যুক্ত। রাশিয়ার ‘মুক্তবাজারে’ চিন, জাপান, ভারত পাকাপোক্ত ঠাঁই নিচ্ছে, জার্মানির মাথা খামচানি নিত্যদিন, এই নিয়ে ফিনান্সিয়াল টাইমস-এ প্রতিবেদন প্রকাশিত। আমেরিকার কুবুদ্ধিতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ হালে পানি পাচ্ছে না, হাড়েমজ্জায় উপলদ্ধি জার্মানির।

বৈদেশিক-নীতিতে, আমেরিকার সঙ্গে বড় ঝামেলায় পড়েছে জার্মানি। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই। দুই দেশের সম্পর্কে ছেদ পড়েনি, তলানিতেও পৌঁছয়নি ঠিকই, কিন্তু একঘরে দুই সতীন।

গতমাসেই ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, জার্মান গাড়ির ওপর (আমেরিকায় বিক্রিত) ১০০ ভাগ ট্যাক্স ধার্য করবেন। গাড়িই নয় শুধু যন্ত্রপাতির ওপরেও। আমেরিকায় বিক্রিত জার্মান গাড়ি (মার্সিডিজ বেন্‌জ। বিএমডাব্লিউ। পোরসে। আউডি। ফোলস্ ভাগেন) আমেরিকায় তৈরি। লাক্সারি গাড়ি। আমেরিকার গাড়ির চেয়ে বিক্রি বেশি। দুর্মুখ এবং ‘পুংটা পোলাপানে’র মতো রসিক ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমেরিকানরা আমাদের তৈরি গাড়ি না কিনে বেশি দাম দিয়ে জার্মান গাড়ি কিনে ‘লাক্সারি শো-’ দেখায়। বন্ধ করতে হবে’। তার মানে, গাড়ির দাম ১০০ ডলার হলে ট্যাক্সও ১০০ ডলার।

উল্লেখ্য, ট্রাম্পের পরিবারে যে ছয়টি লাক্সারি গাড়ি, ছয়টিই জার্মানির (খবর, নিউ ইয়র্ক টাইমস’র)।

এই ‘পুংটা-পোলা’র রসিকতায় এসপিডি (সামাজিক গণতান্ত্রিক দল)’র এক সাংসদ জানতে চেয়েছেন, ‘জার্মান গাড়িতে ১০০ ভাগ ট্যাক্স, কিন্তু ড্রোন, ট্যাঙ্ক, যুদ্ধজাহাজ, কামান, গোলা বারুদ সবই জার্মান কারিগরী-প্রযুক্তি এবং আমাদের কারখানায় তৈরি (থিয়েরসে, ক্রপস্ কোম্পানি) আমেরিকায়, তার বেলায়?’

আমেরিকায় জার্মান গাড়ির (তৈরি) কথা জানা ছিল, অজানা ড্রোন ট্যাঙ্ক, যুদ্ধজাহাজ, কামান ইত্যাদির ঘটনা।

জানাজানিতে কোনও ইস্যু হয়নি নির্বাচনে। বাম দল (লিংকে পার্টাই) জনসভায়, বক্তৃতায় বারকয়েক বলেছে ঠিকই, বলায় জোর ছিল না।আসল ইস্যু বিদেশি উদ্বাস্তু, সন্ত্রাস, মৌলবাদের বাড়ন্ত। বিদেশি উদ্বাস্তু বলতে মুসলমান। এএফডি (অলটারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড) মুসলিমকেই পয়লা ইস্যু করেছে। জনসভায়, বক্তৃতায়, স্লোগানে, পোস্টার-প্ল্যাকার্ডে। বিদেশি এবং মুসলিম বিদ্বেষী জার্মানরা লুফে নিয়েছে। এএফডি মূলত নিউ নাৎসি দল, মুখোশ গণতান্ত্রিক। জনমত ভোটে বলা হচ্ছে এএফডি ৮ থেকে ১০ পার্সেন্ট ভোট পাবে, সংসদে ঠাঁই নেবে।

জার্মানিতে তুর্কি দলও আছে (মূলত জার্মান নাগরিক)। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রতি-নির্বাচনেই অংশ নেয়, জাতীয় পর্যায়ে এক ভাগ ভোটও পায় না (গোটা জার্মানিতে ৩ মিলিয়ন তুর্কির বাস), না-পেলেও, এবারের নির্বাচনে (পোস্টার-প্ল্যাকার্ডে) স্লোগান, ‘এরদোয়ানকে (তুরস্কের প্রেসিডেন্ট) হটানোর জন্যে আমাদের ভোট দিন’।

ছোটবড়ো ৬৫ দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী। একটি দলের নাম ‘পিরাটেন’ (জলদস্যু। এই দলের গোড়া পত্তন সুইডেনে)। পিরাটেন-এর স্লোগান (পোস্টার-প্ল্যাকার্ড-এ): ‘নদীনালা-খালবিল-সমুদ্রে নৌকো-লঞ্চ-জাহাজ নিষিদ্ধ হোক’। বার্লিনে, পিরাটেনের ভাইস প্রেসিডেন্ট বিল্লা সিং। শিখ। নির্বাচনি প্রচারণায়, বক্তৃতায় পাগড়ি, দাড়িগোঁফহীন। কেন? বললেন, ‘লোকে ভাববে মুসলমান। ভোট দেবে না। ভোটের পরে পাগড়ি দাঁড়ি আবার দেখবেন’।

সবুজ দল (গ্রিন পার্টি) প্রকৃতি-পরিবেশ নিয়ে আগের মতো সোচ্চার নয়, উদ্বাস্তুর ‘মানবিক’ সমস্যা সমাধানে বলছে, ‘আমরা সঙ্গে আছি’।

সিডিইউ (ক্রিস্টিয়ান ইউনিয়ন ডেমোক্র্যাটিক)-এর চ্যান্সেলর প্রার্থী অ্যাঙ্গেলা মেরকেল জনসভায় (বক্তৃতায়), যা বলেছেন পোস্টার-প্ল্যাকার্ডে উল্লেখিত- ‘জার্মানি বাঁচলে ইউরোপ বাঁচবে। জার্মানি ডুবলে ইউরোপ রসাতলে যাবে’। অর্থাৎ জার্মানি ও ইউরোপকে এক সঙ্গে রাখতে চাও, সিডিইউ-কে ভোট দাও।

অপিনিয়ন পোল (জনমত যাচাই ভোট) বলছে, অ্যাঙ্গেলা মেরকেল ৪০ ভাগ ভোট পাবেন। জার্মানির ইতিহাসে তিনিই চতুর্থবার চ্যান্সেলর নির্বাচিত হবেন। অ্যাঙ্গেলার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এসপিডি (সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি)’র মার্টিন শুলসজ, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, এসপিডি’র ভরাডুবি (এসপিডি’দ ক্যারেসম্যাটিক নেতা নেই কোনও) সামাল দেবেন, আশা ছিল। মার্টিন শুলসজ প্রার্থীতা (চ্যান্সেলর পদে) ঘোষণার পরে অভিনব কাণ্ড। তরতর করে বেড়ে যায় জনপ্রিয়তা। অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের প্রায় কাছাকাছি।

৩৬ থেকে ৩৮ উত্তীর্ণ। গত দেড়মাসে পারদ দ্রুত কমতির দিকে। জনমত-ভোট এখন চব্বিশের নিচে। আসল ঘটনা, ৩ সেপ্টেম্বরে মেরকেল-শুলসজ-এর টিভি ডুয়েল-বিতর্ক। বৈদেশিক নীতি, উদ্বাস্তু সমস্যা, উদ্বাস্তু-শ্রমিক, ট্রাম্প এবং আমেরিকা নিয়ে সঠিক নির্দেশনা দেননি। তর্কে হেরে যান।

হেরে যাওয়ায় অ্যাঙ্গেলা মেরকেলকেই পছন্দ। তিনিই আবার ভোটে, নির্বাচনে চ্যান্সেলর, বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

শীতের গাছের পাতা লাল নীল হলুদ, নানা দলের হরেক রঙের ছোটবড়ো পোস্টার-প্ল্যাকার্ড রাস্তাঘাটে পার্কে গাছের গায়ে, লাইট পোস্টে সয়লাব। চোখ ধাঁধাচ্ছে। গোটা দেশ বিচিত্র রঙে রঙিন।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক