শহুরে সমাজ দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে আরও আগে। সমাজের নানা শ্রেণিতে এখন এর বিস্তার ঘটছে। সমাজ বলছি যে, এটা বলাও মনে হয় ভুল হচ্ছে। কারণ গ্রামে যতটুকু সমাজ অবশিষ্ট আছে, শহরে সেটুকুও নেই। কংক্রিটের বাক্সে বাক্সে এখানে বিচ্ছিন্ন মানুষ। সমাজের ইংরেজি রূপের আধিক্য ঘটেছে নগরে—‘সোসাইটি’ হয়ে। এর সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও মনের অনুশীলনের যোগাযোগ নেই। কতিপয় দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর স্বার্থ জড়িত কেবল। পানি, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় না ভুগতে হয় এই সোসাইটিকে। সোসাইটির মানুষেরা একই দ্রুতযানে ওপরে ওঠে যান বা নেমে আসেন, কিন্তু কেউই কারও মনজগতে প্রবেশ করতে পারেন না, বছরের পর বছর পাশাপাশি কংক্রিট বাক্সে থাকার পরেও। ফলে পাশের বাড়ির গৃহকর্তা-গৃহবধূকে কেউ এসে হত্যা করে গেলে, নির্বাক প্রতিবেশী। যা খুশি তাই করছি বলে কেউ এসে আপত্তি করলে, তাকে হত্যা করতেও তৈরি নগরের মানুষ। সমাজ ছিল যেই কালে মহল্লাতে, পাড়াতে। তখন শুধু বিপদের খবরই নয়, একে অন্যের পাতের খবরের কথাও জানা থাকতো।
সমাজ হারিয়ে গেছে নাকি রূপান্তরিত হয়েছে—এই বিতর্ক চলতেই পারে। যদি নতুন রূপ ধারণ করে থাকে সমাজ, তবে সেই রূপকে মানুষ এখনও হজম করে উঠতে পারেনি। তার হজমে সমস্যা হচ্ছে বলেই তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। এই অস্থিরতা অবনমিত হয়েছে মানবিক মূল্যবোধ। নৈতিকতা নিখোঁজ। ভালোবাসা, প্রেম, শ্রদ্ধা, স্নেহ যেন দূরকালের কোনও অভ্যাস। প্রেমিকাকে ভালোবাসতে ভুলে গেছে প্রেমিক। প্রেমিককে ক্ষণিকের জন্য দখল করতে না পেরে হত্যার নকশা আঁকছে প্রেমিকা। ব্যবহারিক সমাজ যেহেতু বিলুপ্ত, তখন বিচ্ছিন্ন মানুষ, পরিবার যন্ত্রকে শিক্ষক মেনে বসে আছে। এই যন্ত্র তাকে ভোগাতুর করে তুলতে পারছে ঠিকই, কিন্তু মানবিক গুণগুলো কী করে বুনে দেবে মানুষের মনজমিনে? প্রযুক্তি যেমন অস্থিরভাবে বদলে যাচ্ছে, তেমনি মানুষও। নিত্য তার রূপের বদল ঘটছে। বিচ্ছিন্ন মানুষের পক্ষে দ্রুত তার রূপ বদলে ফেলা সহজ। সমাজবদ্ধ মানুষের পক্ষে তা সহজ নয়। কারণ তখন তাকে সমবেতভাবে বদলে যেতে হয়। তাই ব্যক্তির কোনও রূপই টেকসই নয়। কিন্তু সামাজিক মানুষের রূপের স্থিরতা আছে। সমবেত যেকোনও অবস্থান যেমন টেকসই, তেমনি গুণগত মানও থাকে অটুট। ফলে সমাজবদ্ধ মানুষের যেকোনও ঘূর্ণির পাঁকে পড়ার শঙ্কা থাকে না। ভয় থাকে না উড়ে যাওয়ারও। তাই অস্থিরতার রোগ থেকে রেহাই পেতে সমাজের স্বাস্থ্যের যত্ন নিতেই হবে। সমাজ এখন রুগ্ণ। তাকে সারিয়ে তোলা ছাড়া, রাষ্ট্রের কোনও কল্যাণই আয়ু পাবে না।
লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি