মাঠ পরিচর্যাকারী কে?

তুষার আবদুল্লাহভোটের মাঠ এখনও সমতল হয়নি। ভোট আসতে আসতে  ময়দানের উঁচু-নিচু জায়গাগুলো হয়তো অনেকটা সমতলমুখী হবে। পুরো সমতল হবে এমন ভাবাও হয়তো ঠিক নয়। কারণ ভোটের মাঠের মূল দুই প্রতীক নৌকা এবং ধানের শীষের মধ্যে দশবছরের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। নৌকা ২০০৮ থেকে ক্ষমতায় আছে। ধানের শীষ স্বল্প কিছু আসন নিয়ে ২০০৮ সালে সংসদে এলেও, ২০১৪ থেকে সংসদের বাইরে। ২০১৪’র নির্বাচনের মাঠে ছিল না এই প্রতীকটি। ফলে ময়দানে এমনিতে কোণঠাসা হয়ে আছে ধানের শীষ। স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে তার প্রমাণ মিলেছে। সাংগঠনিক ভাবেও নানা দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়েছে, হচ্ছে এই প্রতীকের দল বিএনপিকে। দুর্যোগ সামলে জাতীয় ঐক্যের ছাতার নিচে এসে,অন্তত ময়দানে নামার শক্তি অর্জন করেছে দলটি। অপরদিকে আওয়ামী লীগ ২০০৮ থেকেই ফুরফুরে মেজাজে আছে। পরপর দুইবার ক্ষমতায়। ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বিএনপি থেকে নিজেদের অনেক উঁচু অবস্থানে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। এছাড়া বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, ২১ আগস্ট বোমা হামলা মামলার বিচার শেষ করায় নৌকা প্রতীকের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। সঙ্গে তারা দৃশ্যমান অনেক উন্নয়ন ভোটারদের সামনে নিয়ে আসতে পেরেছে। ক্ষমতায় থেকে কৌশলে বিরোধীদলকে অস্থিরতার মধ্যে রাখতেও তারা সফল হয়েছে। এই বাস্তবতায় ভোটের আগে সমতল ভূমি কতটা দৃশ্যমান হবে বলা মুশকিল। তবে তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনি প্রচারণা, মাঠের প্রশাসনের আচরণে যদি সাম্যতা আনা যায় তবে সমতল ময়দানের অনুভূতিটুকু হয়তো অনুভব করতে পারবে জাতীয় ঐক্যজোটসহ ভোটে অংশ নেওয়া সব রাজনৈতিক দল। ভোটাররাও পাবেন সেই অনুভূতির স্বাদ।

এই অনুভূতির সৌরভ দেওয়ার দায়িত্ব শুধু নির্বাচন কমিশনের কাঁধে রেখে দেওয়া যাবে না। আমরা প্রত্যাশা করি, প্রকাশ্যে বলি, রাজনৈতিক দর কষাকষিতে দাবি করি– নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী ভূমিকা নিলে ভোট নিরপেক্ষ হবে। বাস্তবতা তা নয়। বাস্তবতা হলো ভোটের মাঠের খেলোয়াড়রা খেলার পরিবেশ কেমন রাখতে চান? তারা যদি ভোটারদের ওপর আস্থাশীল হন, দলের সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে নিশ্চিত থাকেন, নিজেদের আমলনামার স্বচ্ছতার বিষয়ে মন পরিচ্ছন্ন থাকে তাহলে ভোটের মাঠে ‘ফেয়ার প্লে’ প্রদর্শনে বুক কাঁপার কথা নয়। এখানে নৌকা দশ বছরে জনমনস্ক  রাজনীতি করে থাকলে, নিজস্ব ভোটার তহবিলের পাশাপাশি মুনাফা হিসেবে নতুন ভোটার সঞ্চয়ী হিসেবে যোগ করার কথা। অন্যদিকে বিএনপি রাজনীতির মাঠে তাদের লড়াই এবং দলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া দুর্যোগে নিজ ভোটারদের সহানুভূতির পাশাপাশি নতুন ভোটারদের সমবেদনাও কুড়োতে পারে। দুই দল ভোটে পারফর্ম করার উপযোগী অবস্থায় আছে। দ্বাদশ খেলোয়াড় বা জোটভুক্ত দলেরও কমতি নেই। বিশেষ করে বিএনপি অভিজ্ঞ রাজনীতিবীদদের দলে টেনেছে। আওয়ামী লীগ এবার মাঠে তরুণদের ওপর ভরসা রাখার কথা বলছে। এই বাস্তবতায় এই দুই দল যদি মনে করে ভোট উপভোগ্য হবে, তবে দেশে ভোট উৎসব হবেই। শনিবারও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেছেন সমতল মাঠ তৈরি করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন কমিশনও বলেছে– ইসি প্রশ্নবদ্ধ নির্বাচন চায় না। কিন্তু নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ না করার দায়িত্ব নিতে হবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি উভয় দলকেই। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন হিসেবে আওয়ামী লীগে কাঁধে দায়িত্ব একটু বেশি। তাদের নেতৃত্বে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যদি সম্পন্ন করা যায়, তাহলে সেটি হবে বাংলাদেশের রাজনীতির বড় অর্জন। আমাদের নির্বাচন কী পদ্ধতিতে হবে এনিয়ে সব বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। পরবর্তীতে কোনও রাজনৈতিক দলই নির্দলীয় বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবদার তুলতে পারবে না। জাতীয় ঐক্যও একেবারে নির্ভার থাকছে না। তারা যে উদ্দেশ্য নিয়ে রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা ও নিরসনে ঐক্য গড়েছেন, তার সমাধান হিসেবে ভোটারদের একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে হবে। সেই উপহারের মালা নৌকা একা গাঁথতে পারবে না। প্রয়োজন জাতীয় ঐক্যের সহযোগিতা।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি