মশাবাহিত ব্যয়

শান্তনু চৌধুরী

যারাই সম্প্রতি কলকাতা গিয়েছেন সবার কাছেই চাহিদা ছিল আসার সময় যাতে মশা তাড়ানোর ওষুধ ওডোমস নিয়ে আসেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য কলকাতাতেও ওডোমসের সংকট। একই সঙ্গে সংকট অন্য মশা তাড়ানোর ওষুধেও। কারণ একটাই, বাংলাদেশে ভয়ঙ্কর রূপ নেওয়া এডিস মশা থেকে বাঁচতে এখন প্রতিটি ঘরে ঘরে ব্যবহার হচ্ছে মশা তাড়ানোর ওষুধ, মশা থেকে বাঁচার ওষুধ বা মশা মারার ওধুষ। আর ভারত থেকে আসা ওডোমস ছিল সবচেয়ে পরিচিত ও সহজলভ্য। কিন্তু আমাদের দেশে যা হয়, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ওডোমস থেকে শুরু করে প্রতিটি ওষুধের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সেখান থেকে ব্যবসায়ীরা নিয়ে আসছেন কার্টন কার্টন। যে ওডোমস-এর গায়ের দাম ৫০ রুপি, সেটি বিক্রি হচ্ছে প্রায় দশগুণ দামে। সাড়ে তিনশ থেকে শুরু করে পাঁচশ’ সাড়ে পাঁচশ’ টাকা। তাও প্রথম দিকে যা পাওয়া যেতো এখন কৃত্রিম সংকট। এই না পাওয়ার কারণ, ফার্মেসিগুলো যখন অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছিল তখন ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর সেখানে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করে। এতে  ফার্মেসিওয়ালারা পরিচিতজন ছাড়া কারও কাছে মশা তাড়ানোর ওষুধ বিক্রি করছে না। শুধু এই ওষুধটি নয়, ডেঙ্গু জ্বরের আতঙ্কের কারণে মশাবাহিত বা মশা তাড়াতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠেছে জনজীবনে, খরচ বেড়েছে, কমাতে হয়েছে মাসিক সঞ্চয়। সতর্ক থাকা বা আতঙ্ক ভর করেছে মানুষের ওপর। সে কারণে বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়ও। কিন্তু কাঁহাতক আর! কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এখন মনে হচ্ছে প্রকৃতির ওপর ভরসা করা ছাড়া কিছু করার নেই। 

এডিস মশা বা ডেঙ্গুর ভয়াবহতা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। হয়েছে নির্মূল নিয়েও। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মন্ত্ররীরা বলছেন, মেয়র বলছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরকে দায়ী করার মতো হাস্যকর বাক্যব্যয়ও হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মশার কয়েল বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির যে মশা মারা বা তাড়ানোর ওষুধ কিনতে কিনতে পকেট ফাঁকা সেদিকে কারও নজর নেই। অসাধু ব্যবসায়ীরা এসব সামগ্রী বিক্রি করছে দ্বিগুণ, তিনগুণ দামে। দেখার কেউ নেই। নিত্যপণ্যের বাজারের ফর্দে যোগ হচ্ছে কয়েল, অ্যারোসল বা ধুপধুনো। যারা একটু সচ্ছল বা বিদেশের সঙ্গে খানিকটা যোগাযোগ রয়েছে, কোনও স্বজন দেশে আসবে জানলেই বলছেন যেন মশা মারার ওষুধ নিয়ে আসেন। ‘একটা মশাও বিপজ্জনক’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে ঘরে যেন একটাও মশা না ঢোকে, তাই অনেকে পুরো বাসা নেট দিয়ে ঘিরে ফেলেছেন। যেন স্বেচ্ছায় কারাজীবন। অনেক বেসরকারি সেবা সংস্থা এই নিয়ে বিজ্ঞাপনও দিয়েছেন সুলভে কাজটা করে দেওয়ার জন্য। আর এসব জোগাড় করতে পকেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে বাড়তি টাকা। মশা প্রতিরোধে আগে যে জিনিস পরিবারে ব্যবহার হতো অল্প-স্বল্প, সেটি এখন হিসাব ছাড়া। কেউ বাসায় কর্পূর রাখছেন, ধুপ জ্বালাচ্ছেন, হাতে পায়ে নারিকেল তেল মাখছেন। মশা তাড়াতে যে যেটা বলছেন সেটাই প্রয়োগ করছেন। যারা এতদিন শ্বাসকষ্টের ভয়ে মশার কয়েল জ্বালাননি তারা একটার পর একটা অনায়াসে কয়েল পুড়ছেন। মশার ব্যাট কিনছেন দ্বিগুণ, তিনগুণ দামে। যারা মোটামুটি সচেতন তারা প্রায় প্রতিদিন বাড়ির আশপাশে ব্লিচিং পাউডার ছিটাচ্ছেন। এছাড়া প্রতি সপ্তাহে লোক দিয়ে আশপাশের ময়লা পরিষ্কার করাচ্ছেন। এতে বেড়েছে খরচ। কেউ কেউ সত্যিকারভাবে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ছুটছেন চিকিৎসকের কাছে, হাসপাতালে। কেউ কেউ ছোটখাটো জ্বর-অসুস্থতাতেই যাচ্ছেন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে। এটার অবশ্য কারণও রয়েছে। কারণ, এবারের ডেঙ্গুর লক্ষণ আলাদা। তাছাড়া একেক হাসপাতালে একেক ধরনের রিপোর্ট আসছে। কোনও কোনও হাসপাতাল তো পরীক্ষা না করেই রিপোর্ট দিচ্ছে। কয়েকটি ক্লিনিককে জরিমানাও করা হয়েছে এ কারণে। বারবার পরীক্ষা করাতে গিয়ে খরচ হচ্ছে। কেউ কেউ ডেঙ্গু থেকে বাঁচার চিন্তাতেই পার করছেন দিনের অনেকটা সময়। টেনশনে যোগ হচ্ছে নতুন রোগ। এর মধ্যে ভুয়া, অসাধু বা সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীর তো অভাব নেই। বিশেষ করে অন্তর্জালের সহজলভ্যতার এই যুগে নানা নামে মশা মারার যন্ত্র, ওষুধ বা স্টিকার বিক্রি হচ্ছে। আতঙ্কিত মানুষ যা দেখছে, শুনছে তা-ই বিশ্বাস করছেন। কিনছেন নিজেকে বাঁচাতে। কতটা সুফল পাচ্ছেন সেটা নিয়ে ভাবছেন না। আমাদের দেশে বড় বড় শপিংমলগুলোতে নামিদামি ব্র্যান্ডের সব জিনিস পাওয়া যায়। যার মধ্যে ঢুকে পড়ে বিদেশি মোড়কে রাজধানীর চকবাজারে তৈরি নকল সামগ্রী। এই সুযোগে মশা মারার ওষুধও ঢুকে পড়েছে। যাদের বাসায় শিশু রয়েছে তাদের কাছে এই সময়টা অতিমাত্রায় আতঙ্কের। তার চিন্তায় বাবা-মা অস্থির।

ঈদের সময়ে টেলিভিশনে দেখলাম এক শিশু বায়না ধরেছে সে হাসপাতালে থাকবে না। বাড়িতে যাবে, নতুন জামা কাপড় পরে কোরবানির মাংস খাবে। তার হাতে স্যালাইনের সুঁচ লাগানো। শিশু হাসপাতালে নানা শিশুর নানা আবদার। যে রিপোর্টার এই রিপোর্ট করেছেন তার সঙ্গে কথা বললাম, বাবা মায়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনিও কান্না ধরে রাখতে পারেননি। প্রচলিত কথায় যে আমরা বলে থাকি, ঈদের আনন্দ। সন্তান সুস্থ না থাকলে কি কোনও বাবা-মা শান্তিতে স্বস্তিতে থাকতে পারেন? যত টাকাই লাগুক চেষ্টা তো করতেই হবে।

এই যে জনগণের এত এত অপচয়, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া, এর জন্য দায়ী কে? হাইকোর্ট বলেছেন, স্রেফ কয়েকজন মানুষের গাফিলতি। এই মানুষগুলো এখনও বক্তৃতাবাজি করে যাচ্ছেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই’-এর মতো আশ্বাস দিচ্ছেন আর একের পর এক মানুষের মৃত্যুর তামাশা দেখছেন। এই তামাশা কবে বন্ধ হবে কেউ জানে না। আমরা বরং ভানুর কৌতুকটা শুনে হাসি বা দুঃখে চোখের জল মুছি।

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে নিতাই এসেছেন খুনের মামলার আসামি খোকনকে বাঁচানোর পরামর্শ নিতে। ভানু উকিল ঠিক করে দিয়েছেন। জজ কোর্টে খোকনের ফাঁসির রায় হয়েছে। ভানু হাইকোর্টের দায়িত্ব নিলেন। বললেন, ‘কিচ্ছু হবে না, আমি আছি তো। সেই  কৌতুকের সবশেষ হাইকোর্টে খোকনের ফাঁসির হুকুম হলো। নিতাই কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, ‘হাইকোর্টেও তো খোকনের ফাঁসির হুকুম হইয়া গেল! কিছুই  তো করন গেল না...।’ ভানু জবাব দিলেন, ‘না, তগ দেখছি আমার উপর কুনু আস্থাই নাই! এতকাল ত আমারে বিশ্বাস কইরা আইছস, ঠকছস কুনুদিন? আমি তো মইরা যাই নাই...। বাঁইচা তো আছি...। খোকনরে গিয়া ঝুইলা পড়তে ক...। আমি তো আছি-ই...।’

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক