সকাল হলেই ঘরে ঘরে একই দৃশ্য। মা রান্নাঘরে ব্যস্ত, বাবা অফিসের জন্য তাড়াহুড়ো করছেন, আর তিন বছরের শিশুটি একা বসে ট্যাবলেট বা স্মার্টফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে—চোখে মুগ্ধতা, মুখে নীরবতা। এই দৃশ্য এখন বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের পরিচিত বাস্তবতা। প্রযুক্তির এই ছোট্ট যন্ত্রটি আজ শিশুর সবচেয়ে কাছের সঙ্গী হয়ে উঠেছে—কখনও ঘুম পাড়ানোর উপায়, কখনও খাওয়ানোর কৌশল, কখনও বা কান্না থামানোর শেষ অস্ত্র।
অভিভাবকরা জানেন এটি ভালো নয়, তবু দেন—কারণ এর চেয়ে সহজ বিকল্প আর নেই বলে মনে হয়। কিন্তু এই সহজ সমাধানটি ঠিক কতটা ব্যয়বহুল, সেই হিসাব আমরা কি কখনও কষে দেখেছি? প্রশ্ন হলো—এই সঙ্গ কি শিশুর জন্য কল্যাণকর, নাকি এটি তার ভবিষ্যৎকে ধীরে ধীরে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে? স্মার্টফোনের পক্ষে যুক্তির অভাব নেই। এটি এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, একটি সম্পূর্ণ শিক্ষার জগৎ। ইউটিউবে হাজারও শিক্ষামূলক ভিডিও, অ্যাপ স্টোরে শিশুদের জন্য তৈরি অসংখ্য ইন্টারেক্টিভ গেম, বাংলায় বর্ণ চেনানো থেকে শুরু করে ইংরেজিতে গণনা শেখানো পর্যন্ত সব কিছু হাতের মুঠোয়।
প্রত্যন্ত গ্রামের একটি শিশু যেখানে মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই, যেখানে দক্ষ শিক্ষকের অভাব প্রকট, সেখানে স্মার্টফোন তার কাছে বিশ্বের দরজা খুলে দিতে পারে। করোনা মহামারির সময় যখন স্কুল বন্ধ, তখন লাখ লাখ শিশুর পড়াশোনা চালু রেখেছিল এই একটি যন্ত্র। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বে শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষায় প্রযুক্তির এই ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই।
এছাড়া সৃজনশীলতার বিকাশেও স্মার্টফোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ছবি আঁকার অ্যাপ, গল্প তৈরির প্ল্যাটফর্ম, সংগীত শেখার টুল —এগুলো শিশুর মেধা বিকাশে সহায়ক হতে পারে, যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়। ভাষা শেখার ক্ষেত্রেও এটি চমৎকার কার্যকর—একটি শিশু যদি প্রতিদিন ১৫ মিনিট ভালো কোনও ভাষাশিক্ষার অ্যাপে সময় দেয়, তাহলে মাসের মধ্যে সে নতুন ভাষার মৌলিক ধারণা অর্জন করতে পারে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ক্ষেত্রে তো প্রযুক্তি এক আশার আলো—অটিজম আক্রান্ত শিশুরা নানা অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ দক্ষতা অর্জন করতে পারছে, যা আগে কল্পনাও করা যেত না। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য টেক্সট-টু-স্পিচ প্রযুক্তি পাঠ্যবইয়ের বিকল্প হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তির এই মানবিক ব্যবহারগুলো আমাদের আশাবাদী করে।
কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠটি কেমন? এখানেই আসল উদ্বেগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স উভয়ই কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছে—দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের স্ক্রিন টাইম একেবারে শূন্য হওয়া উচিত। দুই থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের জন্য প্রতিদিন সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা। অথচ বাস্তবে বাংলাদেশের অনেক শহুরে পরিবারে চার-পাঁচ বছরের শিশু প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত স্ক্রিনের সামনে কাটাচ্ছে। এটি শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় স্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত। এই অতিরিক্ত সময়ের মাশুল দিতে হচ্ছে শিশুকে, নানাভাবে এবং নানা মাত্রায়।
প্রথমত, শারীরিক ক্ষতির কথা বলতে হয়। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়, মাথাব্যথা ও ঘাড়ব্যথা দেখা দেয়। চক্ষু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গত এক দশকে শিশুদের মধ্যে মায়োপিয়া বা ক্ষীণদৃষ্টির হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ঘুমের সমস্যা তৈরি হয় কারণ স্ক্রিনের নীল আলো মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়, ফলে শিশুর স্বাভাবিক ঘুমের চক্র ব্যাহত হয়। ঘুম কম হলে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ, স্মৃতিশক্তি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সব কিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিশুর যে বয়সে দৌড়াদৌড়ি করা, মাটিতে গড়াগড়ি দেওয়া, হাত দিয়ে কাদা মাখা উচিত, সেই বয়সে সে বসে থাকছে এক জায়গায়। এই শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা থেকে শিশু স্থূলতার শিকার হচ্ছে, হাড় ও পেশির সঠিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, মানসিক ও আচরণগত প্রভাব আরও উদ্বেগজনক। গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুর মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং ধৈর্যশক্তি ধ্বংস করে। শিশুর মস্তিষ্ক এখনও বিকাশের পর্যায়ে—এই সময়ে যদি সে ক্রমাগত দ্রুত পরিবর্তনশীল দৃশ্য ও উজ্জ্বল রঙের অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে ক্লাসরুমের ধীরগতির পাঠ তার কাছে অসহ্য মনে হয়।
অনেক শিশু স্মার্টফোন কেড়ে নিলে রাগ, কান্না ও আগ্রাসী আচরণ দেখায়—এটি আসলে মাদকাসক্তির মতোই এক আসক্তির সুস্পষ্ট লক্ষণ। ডোপামিনের অতিরিক্ত নিঃসরণের কারণে শিশুর মস্তিষ্ক সাধারণ আনন্দ থেকে আর তৃপ্তি পায় না—ফুলের রঙ, পাখির গান, বৃষ্টির শব্দ তার কাছে নিরস হয়ে যায়। জীবনের স্বাভাবিক সৌন্দর্য উপলব্ধির ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা একটি শিশুর জন্য এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর কী হতে পারে?
তৃতীয়ত, সামাজিক বিকাশের ক্ষতি অপূরণীয় হতে পারে। শিশুরা অন্য শিশুদের সাথে খেলাধুলা ও মেলামেশার মাধ্যমে সহমর্মিতা, ভাগ করে নেওয়া, সহযোগিতা এবং সংঘাত মোকাবিলার মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দক্ষতা অর্জন করে। এই দক্ষতাগুলো কোনও অ্যাপ শেখাতে পারে না। কিন্তু যে শিশু ফোনের পর্দায় আটকে আছে, সে এই শিক্ষা পাচ্ছে না। বাস্তব বন্ধুর বদলে ভার্চুয়াল চরিত্রের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে। বড় হয়ে এই শিশুরা চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না, দলগত কাজে অস্বস্তি বোধ করে এবং প্রত্যাখ্যানের সামান্য আঘাতেও ভেঙে পড়ে। একাকিত্ব ও বিষণ্নতার হার তরুণ প্রজন্মে যে হারে বাড়ছে, তার সঙ্গে এই ডিজিটাল একাকিত্বের সংযোগ অনুসন্ধান করার সময় এসেছে।
চতুর্থত, বিপজ্জনক কন্টেন্টের শিকার হওয়ার ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। ইন্টারনেটের দুনিয়া শিশুর জন্য নিরাপদ নয়। অ্যালগরিদম বুঝতে পারে না শিশু নাকি প্রাপ্তবয়স্ক দেখছে। ভুলবশত ক্লিক করে বা অটোপ্লেতে শিশু হিংস্র, অশ্লীল বা মনোবিকারক কন্টেন্টের সামনে পড়ে যেতে পারে।
বিশ্বজুড়ে আলোচিত 'ব্লু হোয়েল' চ্যালেঞ্জের মতো বিপজ্জনক অনলাইন গেম শিশু ও কিশোরদের আত্মক্ষতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশেও এমন ঘটনা ঘটেছে—যেখানে শিশু অনলাইনে দেখা সহিংস কার্টুন অনুকরণ করে নিজের বা অন্যের ক্ষতি করেছে। অনলাইন শিকারিদের হাত থেকে শিশুকে রক্ষা করার দায়িত্বও অভিভাবকদেরই নিতে হবে।
পঞ্চমত, ভাষা বিকাশে বিলম্বের বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না। শিশু ভাষা শেখে মানুষের সাথে কথা বলে, মুখের ভাব দেখে, প্রশ্ন করে উত্তর পেয়ে। কিন্তু স্ক্রিন একমুখী—সে কথা বলে, শিশু শুধু শোনে। এই একমুখী সম্পর্ক শিশুর স্বাভাবিক ভাষা অর্জনের প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে যে পরিমাণ শিশু বিলম্বিত ভাষা বিকাশ নিয়ে ক্লিনিকে আসছে, তার একটি বড় অংশের পেছনে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
তাহলে সমাধান কী? স্মার্টফোন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা কি উত্তর? না, তা বাস্তবসম্মত নয় এবং সম্ভবত কার্যকরও নয়। প্রযুক্তি এখন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ—তাকে অস্বীকার করে নয়, বরং তাকে বুদ্ধিমত্তার সাথে নিয়ন্ত্রণ করেই এগোতে হবে।
সমাধান আছে সচেতন ও সক্রিয় অভিভাবকত্বে। বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ করুন এবং সেটি মেনে চলুন—কেবল শিশুর জন্য নয়, নিজেদের জন্যও, কারণ শিশু যা দেখে তাই শেখে। শিশু কী দেখছে তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন। শিশুর পাশে বসে একসাথে দেখুন এবং কথা বলুন—প্যাসিভ দর্শক নয়, সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হন। ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব স্ক্রিন বন্ধ রাখার অভ্যাস তৈরি করুন। বাইরে খেলার সুযোগ তৈরি করুন, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন, গল্প বলার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনুন। পরিবারের সবাই মিলে টেবিলে খাওয়ার সময় ফোন দূরে রাখুন—এই একটি ছোট্ট অভ্যাসই পারিবারিক বন্ধনকে অনেক মজবুত করতে পারে।
রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর নীতি প্রণয়ন করতে হবে। স্কুলে ডিজিটাল সাক্ষরতার পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তার শিক্ষা দিতে হবে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে শিশু-সুরক্ষামূলক বৈশিষ্ট্য বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করতে হবে এবং শিশুদের লক্ষ্য করে আসক্তি তৈরিকারী অ্যালগরিদম ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এটি কেবল প্রযুক্তিগত প্রশ্ন নয়, এটি একটি নৈতিক ও সামাজিক প্রশ্ন।
একটি কথা মনে রাখা দরকার— শিশু স্মার্টফোনে আসক্ত হয় মূলত সে একা ও উপেক্ষিত অনুভব করে। যে পরিবারে বাবা-মা সময় দেন, গল্প বলেন, একসাথে খেলেন, প্রশ্নের উত্তর দেন—সেই পরিবারের শিশু স্বেচ্ছায় স্ক্রিন ছেড়ে উঠে আসে। তাই আসল প্রতিষেধক কোনও অ্যাপ নয়, কোনও পেরেন্টাল কন্ট্রোল সফটওয়্যার নয়—আসল প্রতিষেধক হলো মানবিক উপস্থিতি, মনোযোগ ও উষ্ণ সংযোগ।
স্মার্টফোন নিজে না আশীর্বাদ, না অভিশাপ—এটি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। ছুরি দিয়ে যেমন রান্না করা যায়, তেমনই আঘাতও করা যায়। শিশুর হাতে কতটুকু, কখন এবং কীভাবে এই হাতিয়ার তুলে দেওয়া হচ্ছে, সেটাই নির্ধারণ করবে এটি তার জীবনে কী হয়ে উঠবে। এই সিদ্ধান্তের ভার অভিভাবকের কাঁধে, শিক্ষকের কাঁধে, সমাজের ও রাষ্ট্রের কাঁধে। আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তাহলে একটি গোটা প্রজন্ম স্ক্রিনের নীল আলোয় বেড়ে উঠবে—কিন্তু সূর্যের আলো, মাটির গন্ধ আর মানুষের উষ্ণতা থেকে বঞ্চিত হবে চিরকালের জন্য।
লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক-প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর




