সড়কের নিরাপত্তা কতটুকু বাড়বে বিশ্বব্যাংকের ঋণে?

রাজন ভট্টাচার্যবাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলোর মধ্যে নিরাপদ সড়ক অন্যতম। গত ২০ বছরে সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছেই। প্রকৃত অর্থে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। অপরিকল্পিতভাবে যানবাহনের নিবন্ধন দেওয়া হচ্ছে। বাড়ছে অবৈধ চালকের সংখ্যা। দুর্ঘটনা রোধে  সচেতনতা বৃদ্ধি করা হয় না যথাযথভাবে। প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর তালিকা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একইসঙ্গে বেড়ে চলেছে পঙ্গুর সংখ্যা। কর্মক্ষম জনশক্তির মৃত্যুতে অগোচরেই ক্ষতি হচ্ছে দেশের।

এমন পরিস্থিতিতে সড়কের নিরাপত্তায় এগিয়ে এসেছে বিশ্বব্যাংক। গত ২৮ মার্চ ৩ হাজার ৭৮ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী এই প্রতিষ্ঠান। রোড সেফটি প্রকল্পের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে অবস্থিত সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দীর্ঘদিন পরে হলেও দৃশ্যমান কিছু কাজের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সত্যিই আশার কথা। যদিও শেষ পর্যন্ত কতটুকু বাস্তবায়ন হবে সেটাই দেখার বিষয়।

১৯৮৩ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটি ১১২টি সুপারিশ জমা দিয়েছিল সরকারের কাছে। ২০১১ সালে সৈয়দ আবুল হোসেন যোগাযোগমন্ত্রী থাকাকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়। এর সদস্যরা ৮৬টি সুপারিশ জমা দিয়েছিল। সবশেষ সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের ২৬তম সভায় সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানকে আহ্বায়ক করে ১৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তারা পুরনো সুপারিশের আলোকে সাতটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে একমাসের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চূড়ান্তভাবে ১১১টি সুপারিশ জমা দেয়। এত সুপারিশের কোনোটিই আজ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি!

১৯৮৩ সাল থেকে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারি পর্যায়ে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়। এরপর প্রায় ৪০ বছর কেটে গেলেও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনও ব্যবস্থা নেওয়া গেলো না। হলো না সুপারিশের বাস্তবায়ন। যদি শুরু থেকেই সেসব সুপারিশ আলোর মুখ দেখতো তাহলে হয়তো আজ সড়ক দুর্ঘটনার দিক থেকে গোটা বিশ্বে বাংলাদেশের নাম প্রথম সারিতে নাও থাকতে পারতো। হয়তো এত মানুষের মৃত্যু হতো না।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পে কী থাকছে? প্রকল্পটির মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা পরিমাপ, উন্নত নকশা, প্রকৌশল সুবিধা, গতি প্রয়োগ, জরুরি সেবাসহ সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হবে বলে জানা গেছে। প্রকল্পের আওতায় যানজটের হৃৎপিণ্ড হিসেবে পরিচিত জয়দেবপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার ও নাটোর থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার সড়কে প্রাথমিকভাবে বসানো হবে নম্বর প্লেট শনাক্তকরণ ডিভাইস। ফলে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে কোনও চালক পার পাবে না। পদক্ষেপটির মাধ্যমে দুই মহাসড়কে ৩০ শতাংশের বেশি সড়ক দুর্ঘটনা কমতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য সড়ক নিরাপত্তা উন্নত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার। এটা খুবই স্বাভাবিক। প্রকল্পের আওতায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নে পাঁচ হাজার কিলোমিটার মহাসড়ক নিরাপদ করা হবে। অগ্রাধিকার বিবেচনায় বিভিন্ন ইন্টার সেকশনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মাত্রার পূর্ত কাজের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা বাড়ানো হবে।

ট্রাফিক পুলিশসহ অন্য সংস্থার ব্যবহারের জন্য স্থাপন করা হবে জাতীয় ডাটা সিস্টেম। জয়দেবপুর থেকে এলেঙ্গা এবং নাটোর থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত ১৪০ কিলোমিটার মহাসড়কে বসানো হবে সিসিটিভি। স্থাপন করা হবে ইন্টিগ্রেটেড ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনসিডেন্ট ডিটেকশন সিস্টেম। কেউ যদি বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালায় ও কোনও দুর্ঘটনা ঘটায় তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটি ধরা পড়বে। যদিও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা এই কাজ সম্পন্ন করতে বছরের পর বছর পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন।

দেশে মোট সড়ক রয়েছে ২১ হাজার ৫৯৫ দশমিক ৪৯ কিলোমিটার। এরমধ্যে জাতীয় মহাসড়ক ৩ হাজার ৯০৬ কি.মি. এবং আঞ্চলিক মহাসড়ক ৪ হাজার ৪৮২ দশমিক ৫৪ কি.মি.। জেলা সড়কের দৈর্ঘ্য ১৩ হাজার ২০৬ দশমিক ৯২৩ কিলোমিটার। এরমধ্যে ১ হাজার ৬৭২ কিলোমিটার সড়ক ‘মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব সড়কে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বসানো হবে প্রযুক্তি। এতে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ থাকবে না চালকদের।

বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ থেকে ৩ শতাংশ। সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে তাই ‘বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প’ হাতে নিচ্ছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতর, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), হাইওয়ে পুলিশ ও স্বাস্থ্য অধিদফতর (ডিজিএইচএস)। সমন্বিত নিরাপদ সড়ক প্রণয়নে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে সরকার। চলতি সময় থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প প্রস্তাবটি ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

বেসরকারি পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর সারা দেশে ৫ হাজার ৩৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নারী, শিশুসহ মোট ৬ হাজার ২৯৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৪৮৭ জন। নিহতের মধ্যে একটা বড় অংশ অর্থাৎ ১ হাজার ৫২৩ জন পথচারী। মোট নিহতের মধ্যে ১৮-৬৫ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা ৫ হাজার ১৯৩ জন, যাদের ৯৫ ভাগই কর্মক্ষম জনশক্তি। গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় যে পরিমাণ মানবসম্পদের ক্ষতি হয়েছে তার আর্থিক মূল্য ৯ হাজার ৬৩ কোটি টাকা, যা জিডিপির শূন্য দশমিক তিন ভাগ। এদিকে ২০২১ সালে সারা দেশে দুই হাজার ৭৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ২১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৭৫ ভাগের বয়স ১৫-৪৪ বছরের মধ্যে।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৫ হাজার ছোট-বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ’র হিসাব বলছে, প্রতিদিন দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান প্রায় ৩০ জন। সেই হিসাবেও বছরে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজার ৮০০ জন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বছরে ১২ হাজার এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রেকর্ড অনুযায়ী ২০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়।

অন্যদিকে বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্স ইনস্টিটিউট (এআরআই) এবং নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর ১২ হাজার মানুষ নিহত হন। বিভিন্ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানে নিহতের সংখ্যার কিছু তারতম্য থাকলেও বছরে ১০-১২ হাজার মানুষ শুধু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার ঘটনাকে স্বাভাবিকভাবে দেখার সুযোগ নেই। এত মানুষের মৃত্যু হলেও কারও কোনও দায়বদ্ধতা থাকবে না তা তো হয় না।

পরিসংখ্যান বলছে, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। ৪০ বছর আগে চালু করা নিরাপদ সড়কের জন্য সুপারিশ আজও বাস্তবায়ন হয়নি। সবশেষ দুটি সুপারিশও আলোর মুখ দেখলো না। তাই বিশ্বব্যাংকের ঋণে নিরাপদ সড়কের জন্য নেওয়া উদ্যোগ যেন কোনও অবস্থাতেই মুখ থুবড়ে না পড়ে। প্রয়োজনে প্রকল্পটির আরও বেশি সম্প্রসারণ করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, দুর্ঘটনা এখন বাংলাদেশের জন্য সড়ক দুর্যোগ হয়ে সামনে এসেছে। যেকোনও মূল্যে আমাদের এই দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা ছাড়া বিকল্প নেই। সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত যেন কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ না থাকে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক
rajan0192@gmail.com