তিনি ছিলেন রহমতের নবী

আজ ১২ রবিউল আউয়াল। হিজরি বর্ষপঞ্জি হিসেবে আজ থেকে ১৪৯৭ বছর আগে বিশ্ব মানবতার মুক্তির দিশারী আখেরি নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই পৃথিবীতে মা আমেনার কোল আলোকিত করে আগমন করেন। ৬৩ বছর বয়সে ১২ রবিউল আউয়াল এই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করেন তিনি।

তিনি ছিলেন রহমাতুল্লিল আলামিন, সবার জন্য রহমত ও  দয়ার নবী। আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনুল কারিমে বলেন, ‘আমি আপনাকে জগৎবাসীর জন্য রহমত ও  করুণা বানিয়ে প্রেরণ করেছি’। (সুরা আম্বিয়া, আয়াত নং-১০৭)।

যেসব মানুষ অভাবের কারণে নিজের সংসারের বোঝা বহন করতে পারছে না, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সেই বোঝা বহন করতেন। যেসব মানুষ অসহায়, যাদের কিছু নেই, রাসুল সাল্লাল্লাহু ইসলাম তাদের জন্য উপার্জন করে দিতেন, নিজের উপার্জন থেকে তাদের দান করতেন। সত্যের ওপর চলতে গিয়ে যত রকম বিপদ-আপদ আসতে পারে মানুষের সামনে, এরকম বিপদ এলে রাসুল তার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন। (বোখারি শরিফ, হাদিস নং-৩)।

দুনিয়ার কষ্ট-ক্লেশে সাহায্য করা, দুনিয়ার সাময়িক এই কষ্ট-ক্লেশ থেকে উদ্ধার করা যদি করুণা বা দয়া হয়ে থাকে তাহলে জাহান্নামের অনন্তকালের আজাব থেকে উদ্ধার করা তো অনেক বড় দয়া ও রহমতের কথা হবে।

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমি তোমাদের কোমর ধরে ধরে জাহান্নাম থেকে বাঁচাই’। (বোখারি শরিফ, হাদিস নং-৩৪২৬)।

আল্লাহ পাক কোরআন শরিফে বলেন, ‘তোমরা তো জাহান্নামের গর্তের কিনারে গিয়ে উপনীত হয়েছিলে। এ অবস্থা থেকে তিনি তোমাদের রক্ষা করেছেন’। (সুরা আল ইমরান, আয়াত নং-১০৩)।

উম্মতের জন্য এটাই হচ্ছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচেয়ে বড় কল্যাণকামিতা‌। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জীবনের যত চাওয়া-পাওয়া হতে পারে, সব চাওয়া-পাওয়াকে উম্মতের জন্য বিসর্জন দিয়েছেন‌। নিজের জন্য যা চাইতে পারতেন, তা না চেয়ে উম্মতের জন্য চেয়েছেন।

নারীর জন্য রহমত:

প্রিয় নবী (সা.)-এর রহমত দ্বারা নারীরাও উপকৃত হয়েছে। নবীর আগমনের পূর্বে মানুষ মেয়েসন্তান হওয়াটাকে লজ্জার বিষয় মনে করতো। লাঞ্ছনার বিষয় মনে করতো। তারা তাদের জীবন্ত মাটিচাপা দিতো। কোনও পিতা তার মেয়েসন্তানকে ভালোবাসতো না। ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখতো না। কিন্তু নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে ঘোষণা করলেন, ‘যার ঘরে দুটি মেয়ে সন্তান হবে আর সে তাদের লালন-পালন করে সুপাত্রে পাত্রস্থ করবে, জান্নাতে সে ব্যক্তি আমার সঙ্গে এমনভাবে থাকবে যেমন দুটি আঙুল একসঙ্গে থাকে’।

এই হাদিস পড়ার পর কোনও মুমিন বান্দা কি তার মেয়েসন্তানকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখতে পারে? অবশ্যই না।
বরং বাস্তবতা হলো, একজন প্রকৃত মুমিন বান্দা তার মেয়েকে জান্নাতের দরজা মনে করে। যার ঘরে মেয়েসন্তান হলো সে মনে করবে আজ আমার জন্য জান্নাতের দরজা খুলে গেলো।

বৃদ্ধের জন্য রহমত:

নবী করিম (সা.)-এর আগমনের মাধ্যমে বৃদ্ধরাও সম্মান লাভ করেছেন। ওই যুগে বৃদ্ধদের কেউ সম্মান করতো না।
নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি বড় ও বৃদ্ধদের সম্মান করলো না, সে আমার উম্মত ও দলের অন্তর্ভুক্ত নয়’। (তিরমিজি শরিফ, হাদিস নং-১৯১৯)।

শ্রমিকের জন্য রহমত:

এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে মুসাফাহা করলেন। রাসুল (সা.) দেখলেন তার হাত শক্ত। তিনি তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। ওই সাহাবি বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ আমি পাহাড়ের ওপর থাকি। সেখানে পাথর ভেঙে জীবনযাপন করি। এ কথা শুনে রাসুল (সা.) তার দিকে তাকালেন এবং বললেন, ‘যে ব্যক্তি নিজ হাতে উপার্জন করে সে আল্লাহর বন্ধু’। রাসুলের আগমনে শ্রমিক মজদুররাও সম্মান লাভ করেছেন।

শিশুর জন্য রহমত:

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি ছোটদের স্নেহ করলো না, সে ব্যক্তি আমার দলভুক্ত নয়। সে আমার উম্মত নয়। (তিরমিজি শরিফ, হাদিস নং-১৯১৯)। এর অর্থ ছোটরাও রাসুল (সা.)-এর দয়া ও রহমত লাভ করেছে।

ফেরেশতাদের জন্য রহমত:

নবী করিম (সা.) একবার হজরত জিব্রাইল আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞেস করলেন, জিব্রাইল, আপনি কি আমার রহমতের হিস্যা পেয়েছেন? হজরত জিব্রাইল আলাইহিস সালাম উত্তর দিলেন, হ্যাঁ আপনার রহমতের‌ হিস্যা আমিও পেয়েছি। আপনার আগমনের আগে আমার নিজের পরিণতির ব্যাপারে শঙ্কিত ছিলাম। কিন্তু আপনার আগমনের পর আয়াত নাজিল হলো। ‘নিশ্চয়ই কোরআন সম্মানিত রাসুলের আনীত বাণী।  যা শক্তিশালী আরশের মালিকের নিকট মর্যাদাসম্পন্ন। মান্যবর, সেখানে সে বিশ্বস্ত’। (সুরা তাকবির, আয়াত নং-১৯ ও ২০)।

দুশমনের জন্য রহমত:

মক্কা বিজয়ের পর নবী (সা.) মক্কার কুরাইশদের থেকে তাদের দুর্ব্যবহার ও নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার ভাই হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম তার ভাইদের সঙ্গে যে আচরণ করেছে আমিও এদের সঙ্গে সে আচরণ করবো। আমার ভাই ইউসুফ তার ভাইদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আজ তোমাদের ওপর কোনও প্রতিশোধ নেই’। (সুরা ইউসুফ আয়াত নং-৯২)

মোটকথা, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দুশমনদের জন্য রহমত প্রমাণিত হন।

লেখক: খতিব, পীর ইয়ামেনী জামে মসজিদ, গুলিস্তান, ঢাকা।

প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম ও প্রধান মুফতি, মারকাজুশ শাইখ আরশাদ আল মাদানী মাদ্রাসা, ঢাকা।