আধুনিক সময়ের গণবিচ্ছিন্নতা

ক্ষেত্র বিশেষে কখনও-কখনও মনে হতে পারে বিচ্ছিন্নতাই আধুনিকতার নিয়তি। যদিও এই আধুনিক সময়ের কারণেই তথ্য-প্রযুক্তির যুগে মানুষ দূরবর্তী সব যোগাযোগকে হাতের মুঠোয় আনতে পেরেছে। তারপরও হালের এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে কিছুটা বিচ্ছিন্নতার ইঙ্গিত মেলে। প্রাসঙ্গিক উদাহরণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বললে, বিগত দশ-পনেরো বছরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগসহ অনুষদগুলো নিজেরা নিজেদের মাঝে যে পরিমাণ দেয়াল বা সীমানা তুলেছে তা নিরীক্ষার যোগ্য।

এসব লোহা-লক্কড়, সুরকি-বালিতে যে অনর্থক পয়সা খরচ হয়েছে তা না করে গবেষকদের মাঝে সেটা খরচ করলেও কিছুটা এগোতো। যদিও কেউ কেউ বিষয়টিকে নিরাপত্তার খাতিরে সমর্থন করতে পারেন। তবে সেটা নিছক অজুহাত হবে। কারণ, দূরত্ব কমানোর তাগিদে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে প্রায় সর্বপ্রকার যান ও মানুষ চলাচল করেন। হাস্যকর হলো, এর ওপর ভর করে বাইরের দূরত্ব কমলেও এর নিজের ভেতরের দূরত্বটুকুই এখনও কমেনি। উল্টো সময়-অসময়ে, নানা অজুহাতে হলগুলোর ভেতরের ছোট ছোট যোগাযোগ অর্থাৎ পকেট গেটগুলো বন্ধ করা হয়েছে। যা নিজেদের আন্তযোগাযোগ ও সম্পর্কে এক ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একুশে হলের ভেতর দিয়ে শহিদুল্লাহ হলের সঙ্গে ছোট্ট একটা গেট ছিল। কলা অনুষদের বঙ্গবন্ধু, জসীম, মুক্তিযোদ্ধা, বিজয় একাত্তর, সূর্যসেন এই হলগুলো শাহবাগ এলাকায় যাওয়ার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু হল সংলগ্ন গেটটি ব্যবহার করতো। ক’দিন হলো তা ব্যবহৃতও হচ্ছে। এই ছোট্ট সমাধান শিক্ষার্থীদের আচরণগত মনস্তত্ত্ব বদলে দিয়েছে। এর কল্যাণে প্রয়োজনীয় কাজ সারতে এখন আর দুনিয়ার মুল্লুক ঘুরতে হচ্ছে না। রিকশাওয়ালাদের দুর্ব্যবহার না সয়েও সময়ের বিরাট সঞ্চয় হচ্ছে।

বহুপক্ষ অযাচিত ও কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দোহাই দিয়ে এই ছোট ছোট যোগাযোগগুলোকে না রাখার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করতে পারেন। ভিন্নভাবে বললে অতীতের কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাকেও সামনে আনতে পারেন। কিন্তু সময়ের প্রবাহে মানুষের মনস্তত্ত্ব বদলেছে। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে যেকোনও অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়ের সঠিক সমাধানও বের করা সম্ভব হয়েছে। কাজেই দূরত্ব ঘোচানোর জন্য ছোট ছোট আন্তযোগাযোগগুলো অব্যাহত রাখার সুযোগ আছে।

বাঙালির শান্ত সাহস শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচির জন্য সমাদৃত। বছরের প্রথম দিন প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন বই সরবরাহের বিষয়কে উৎসবে পরিণত করেছেন। অথচ ১৫ বছর আগেও ছেঁড়া, ফাটা, জীর্ণ বই ছিল নতুনের সম্বল। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ পড়াশোনার যে প্রেরণা জোগায়, আগ্রহ তৈরি করে, সেটা শেখ হাসিনাই বোঝেন, জানেন। এজন্যই শিক্ষার্থীদের মাঝে যোগাযোগ তৈরির জন্য ইন্টারনেট সার্ভিস, আন্তপ্রতিযোগিতার আয়োজন করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় মানুষের চরিত্র গঠন করে। সিভিল সোসাইটি তৈরি করে। যদিও বিগত কিছু বছর ধরে একটা পক্ষ এসব মৌলিক বিষয়কে পাশ কাটিয়ে র‍্যাংকিং কেন্দ্রিক ভাবনায় মত্ত। যা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এক ধরনের বিব্রত অবস্থার সৃষ্টি করেছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ, এখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর চ্যালেঞ্জ অন্যদের মতো নয়। এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অল্প খরচে শিক্ষা প্রদান ও এর পাশাপাশি জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, নৈরাজ্যের বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হয়। ‘পঁচাত্তরের হাতিয়ার, গর্জে ওঠো আরেকবার’-এর মতো দেশবিরোধী, হত্যায় উৎসাহদানকারী ও উল্টোপথের স্লোগানের বিপক্ষে লড়তে হয়।

বাঙালি সংস্কৃতি মেলবন্ধন, সংযোগ ও ঐক্যের। এর চল ঘটানোর মধ্য দিয়ে আলোচক, সমালোচক এবং উদ্যোগ গ্রহণকারীরাও বুঝতে পারবেন মাথা ব্যথা হলে যেমন মাথা কেটে ফেলার নজির নেই। তেমনি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভয়ে বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব ছোট ছোট যোগাযোগগুলো বিচ্ছিন্ন রাখা অযৌক্তিক। এক্ষেত্রে কেউ যদি নিরাপত্তার অজুহাত সামনে আনতে চায় তা হবে প্রহসনসূচক। কারণ, শুধু ছুটির দিনগুলোয় বহিরাগত মানুষ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দোকানপাট সব মিলিয়ে এখানের যে পরিবেশ সৃষ্টি হয় সেটা নৈরাজ্যমূলক ও চরম অস্বস্তিকর। এই দায় ও দায়বদ্ধতার স্বরূপ অনুধাবন করে এগোতে পারাটাই সময়ের যৌক্তিকতা।

সমাজ, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রে সিভিল সোসাইটির যে সংকট, বাস্তবতা এর থেকে বেরিয়ে আসতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পলিটিক্যাল সোসাইটি ও সিভিল সোসাইটির যে সহাবস্থান, সৌন্দর্য ও প্রশ্ন উত্থাপনের জায়গা সেটার স্বরূপ অনুসন্ধান করতে হবে। পাশাপাশি এও মনে রাখতে হবে, আগামীর প্রজন্ম প্রণোদনায় নয় বিবেচনাবোধকে সামনে নিয়ে এগোবে। কাজেই এই বিষয়গুলো অনুধাবন করে শুধু উৎসব কেন্দ্রিক একাত্মতা নয়; বরং কথায়, গল্পে, চায়ের চুমুকে তারা যেন সার্বক্ষণিক মিলিত হতে পারে, যেন দূরত্ব উবে যায় সেজন্য আন্তযোগাযোগগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এসব করা গেলে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ থাবা থেকে রক্ষায় কাউকে আর পাহারা দিতে হবে না। বরং তারাই হয়ে উঠবে পাহারাদার। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াকু কর্মী।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা
haiderjitu.du@gmail.com