বঙ্গবাজারের আগুন ও ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন

একের পর এক দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটছেই। রাজধানীর বঙ্গবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তার একটি। এর আগে ঢাকা শহরের বুকে অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি মার্কেটে দুর্ঘটনা ঘটেছিল। সেগুলো সম্ভবত ছিল গ্যাস লিকেজ থেকে সৃষ্ট দুর্ঘটনা। তাতে অনেকে মারা যায়।

বঙ্গবাজারের আগুনে অবশ্য কেউ মারা যায়নি। আগের দুটি দুর্ঘটনা পুরনো হতে না হতেই বঙ্গবাজারে আগুন লেগে হাজার হাজার ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হলো। ঈদের আগে তারা যখন ধারকর্জ করে ও বাকিতে মালামাল নিয়ে ব্যবসা করে লাভবান হতে চেয়েছিলেন, তখনই একদিন ভোরের দিকে আগুন লেগে সব শেষ হয়ে গেলো। পুড়ে শেষ হলো হাজার হাজার মানুষের স্বপ্ন। এদের অনেকেই ছোট ব্যবসায়ী। তাদের হয়তো এটুকুই ছিল। বড় সহায়তা না পেলে তাদের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব। বঙ্গবাজারে দোকান কর্মচারীও কম ছিলেন না। ঈদের আগে তারাও একটি বিপর্যয়কর অবস্থায় পড়লেন। বঙ্গবাজারের আগুনে আশপাশের কয়েকটি পাকা মার্কেটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থাপনা ছিল সেখানে। সর্বগ্রাসী আগুন থেকে সেগুলো রক্ষা করা গেছে। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসসহ কোনও প্রতিষ্ঠান চেষ্টার ত্রুটি করেনি। তাদের আন্তরিকতায় ঘাটতি ছিল না। তারপরও বঙ্গবাজারকে রক্ষা করা যায়নি।

এর আগেও একবার মার্কেটটি আগুনে পুড়ে মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। তারপর আবার একইভাবে সেখানে মার্কেট গড়ে তোলে সিটি করপোরেশন। যেসব উপকরণ দিয়ে বঙ্গবাজার গড়ে তোলা হয় এবং সেখানে যেভাবে গাদাগাদি করে ব্যবসা চালানো হতো, তাতে এমন আগুন লাগা অবশ্য স্বাভাবিক। তবে দুর্ঘটনা কারো কাঙ্ক্ষিত নয়। সেজন্য উচিত ছিল অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা যাতে না ঘটে কিংবা ঘটলেও সেটা ছড়িয়ে না পড়ে, তার ব্যবস্থা রাখা। বঙ্গবাজারে ব্যবসায়ীদের তরফ থেকে তেমন কিছু করা হয়েছিল বলে মনে হয় না। তবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর বারবারই বলছিল, মার্কেটটি ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের কথায়ও বঙ্গবাজার ব্যবসায়ী সমিতি কর্ণপাত করেনি। তবে সিটি করপোরেশন চেষ্টা করেছিল বঙ্গবাজারের জমিতে একটি বহুতল শপিং কমপ্লেক্স গড়ে তুলতে। বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ী নেতারাই সেটা হতে দেননি। তারা হাইকোর্টে রিট করে স্থগিতাদেশ নিয়ে এসেছিলেন। তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উচিত ছিল সেই স্থগিতাদেশ নিষ্পত্তিতে দ্রুত উদ্যোগী হওয়া। সরকার চাইলে কী না সম্ভব! আদালতের সম্মতি নিয়ে ওখানে এ কয়েক বছরের মধ্যে একটি বহুতল মার্কেট গড়ে তুলে সেখানে নির্বিঘ্নে ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়া গেলে এ দুঃখজনক ঘটনা হয়তো এড়ানো যেত। সেটা যেহেতু যায়নি; তাই এ মুহূর্তে পরস্পরের ওপর দোষ না চাপিয়ে বঙ্গবাজারের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

ইতোমধ্যে সে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বৈকি। বঙ্গবাজারের পোড়া জমিতে দোকানপাটের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে সেখানে চৌকি পেতে ব্যবসায়ীদের পণ্য বিক্রির সুযোগ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঈদের আগে এভাবে যেটুকু ক্ষতিপূরণ তারা করতে পারেন, সেটুকুই লাভ। অগ্নিদগ্ধ বঙ্গবাজার থেকে কিছু মালামাল সরিয়ে নিতে পেরেছিলেন ব্যবসায়ীরা। সেগুলোই তারা এখন খোলা আকাশের নিচে বিক্রির চেষ্টা করবেন। সচ্ছল ক্রেতাদের উচিত হবে বেশি দামাদামি না করে, বরং কিছুটা বেশি দাম দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের মালামাল কিনে তাদের ক্ষতিপূরণে এগিয়ে আসা। একটি ব্যাংক একাউন্ট খোলা হয়েছে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করার জন্য। সেখানে দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে অনেক আর্থিক সহায়তা আসবে বলে আশা করি। বিদেশে যারা আছেন, তারা ঈদের আগে নিজ নিজ স্বজনদের কাছে টাকাপয়সা পাঠাচ্ছেন। বঙ্গবাজারের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদেরও স্বজন মনে করে তারা পারেন এদের কল্যাণে এগিয়ে আসতে। এ ধরনের উদ্যোগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখাও প্রয়োজন, যাতে সাহায্যের অর্থ বিলিবণ্টন নিয়ে কোনও প্রশ্ন না ওঠে এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা তার প্রাপ্য পান।

বঙ্গবাজারে যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, প্রাথমিক হিসাবে সেটাকে এক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি বলে বর্ণনা করেছেন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি। এ ব্যবসায়ীদের অনেকে নাকি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। সেগুলো পরিশোধের এখন কী হবে?

অনেক ক্ষেত্রে আমরা দেখি, ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীকে নতুন করে ঋণ দিয়ে থাকে– পুরনো ঋণ যাতে ফেরত দিতে পারেন। বঙ্গবাজারের অসহায় ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে সেটা করা হবে আশা করি। এ ব্যবসায়ীরা অনেকে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকেও কর্জ করেছিলেন। করোনার সময় ব্যবসা করতে না পেরে তারা যে লোকসানে পড়েন, সেটা কাটানোর প্রয়াস নিয়েছিলেন এই ঈদে। আগুন সেটা সফল হতে দিলো না। এখন তারা ধার পরিশোধের দুশ্চিন্তায় আছেন। বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীরা দিনের শেষে টাকাপয়সা দোকানের ক্যাশবাক্সে রাখতেন। সেসব টাকাও পুড়ে ছাই হয়েছে। এ দৃশ্য দেখে শিউরে উঠতে হয়।

বঙ্গবাজারের এ ব্যবসায়ীদের জন্য প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের উপযুক্ত সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ব্যাংক মালিকরা অর্থ প্রদান করতে পারেন। এক হাজার কোটির অর্ধেকও যদি বঙ্গবাজারের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জোগানো যায়– তারা পরিশ্রম দিয়ে এখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন বলে আশা করি। তারা যাদের কাছ থেকে বাকিতে মালামাল নিয়ে দোকান সাজিয়েছিলেন– বঙ্গবাজার পুড়ে যাওয়ায় ওইসব ব্যবসায়ীও এখন ক্ষতিগ্রস্ত। বঙ্গবাজারে যারা পাইকারি ব্যবসা করেন, তারা আবার সারা দেশে বাকিতে মালামাল দিয়ে থাকেন– যা বিক্রি করে পরে দাম পরিশোধের কথা। বাকিতে মালপত্র দেওয়ার সেসব খাতাপত্রও পুড়ে গেছে। কিন্তু যারা বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মালামাল নিয়েছেন, তারা তো জানেন কতটা কীভাবে নিয়েছেন। তাদের এখন উচিত হবে ইমানদারির সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের বকেয়া পরিশোধ করে দেওয়া। সততার প্রমাণ দিতে হবে তাদের।

সব দায়িত্ব সরকারের কাঁধে ন্যস্ত করে বসে থাকার প্রবণতা অবশ্য আমাদের রয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়। যে কোনও পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা যেন নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে কার্পণ্য না করি। তাতে জাতি হিসেবে আমাদের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হবে। বঙ্গবাজারে আগুন নেভানোর সময় যারা এ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন– উল্টো তাদের ওপর হামলার ঘটনা কিন্তু ঘটেছে। পুলিশের ওপরও হামলা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস হেড কোয়ার্টার বঙ্গবাজারের খুব কাছে অবস্থিত। সেখানে হামলা করেছে একদল লোক এবং তারা ফায়ার সার্ভিসের বেশ কয়েকটি দামি গাড়ি বিনষ্ট করেছে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পথে স্বভাবতই এগিয়েছে সরকার। বিপদে মাথা ঠাণ্ডা রাখা সবারই উচিত।

ঢালাওভাবে কোনও পক্ষকে অভিযুক্ত করাও ঠিক নয়। ফায়ার সার্ভিস তো ২০১৯ সালেই জানিয়ে দিয়েছিল, এ মার্কেটে ব্যবসা করা ঝুঁকিপূর্ণ। এমন অনেক মার্কেট রাজধানীসহ সারা দেশেই রয়েছে, যেগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা বলে কিছু নেই। এসব মার্কেটে যারা ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন, তাদেরই প্রথমত উচিত এ দিকটা খেয়াল করা। সিটি করপোরেশন আর পৌর কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব রয়েছে ব্যবসা করার জায়গাগুলো নিরাপদ রাখা। আগুন লাগলে দোকানদার বা ব্যবসায়ী নিজেরাই যেন অল্প সময়ের মধ্যে তা নিভিয়ে ফেলতে পারেন, সে ব্যবস্থা থাকা দরকার। ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে আসতে আসতেও অনেক সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তাদের সামর্থ্যের ঘাটতিও আছে। একের পর এক অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনা যেভাবে হচ্ছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের উচিত হবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে ঢেলে সাজানো এবং তাদের শক্তিশালী করা। রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে একটি মার্কেটের আগুন নেভাতে দীর্ঘ সময় তাদের লড়াই করতে হয়েছে। এ দৃশ্য বড় বেদনাদায়ক।

সব মার্কেটে ফায়ার সার্ভিস যাতে সহজে কাজ করতে পারে, সেভাবেই তা গড়ে তুলতে হবে। যারা সেখানে কেনাকাটা করতে যায়, তাদেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা চাই। অনেক সময় দেখা যায় ঘটনার সঙ্গে কোনও রকম সম্পৃক্ততা নেই, এমন মানুষও দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পড়ে। এটা রোধ করতে হবে। মানুষের পাশাপাশি সম্পদের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে। বঙ্গবাজারে বিদ্যমান পরিকল্পনা অনুযায়ী বহুতল শপিং কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হবে বলে আশা করা যায়।

এসব মর্মান্তিক ঘটনার পর আর কোনও পক্ষেরই উচিত হবে না এ ব্যাপারে বাধা প্রদান করা। বঙ্গবাজারে আধুনিক মার্কেট নির্মাণে বাধা দেওয়া কিছু ক্ষমতাবান লোকের কথা মিডিয়ায় এসেছে। দেখা যাচ্ছে, এখানে সব রাজনৈতিক দলের লোকই মিলেমিশে রয়েছে। এসব পেছনে ফেলে আমরা আশা করবো, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের নামধাম ও ক্ষতির পরিমাণ যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করে তাদের যথেষ্ট সহায়তা জোগানো হবে এবং নতুন ভবনে এসব ব্যবসায়ীকে স্থান দেওয়া হবে। তাহলেই হয়তো বঙ্গবাজারের ভয়াবহ আগুনের স্মৃতি একদিন মন থেকে মুছবে।

লেখক: রাজনীতিক; মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ (বিএফডিআর)