বড় একটি ঘূর্ণিঝড় মোখা চলে গেলো, কিন্তু ঢাকায় বৃষ্টি হলো না। তাপমাত্রা কয়দিন আগে ৪১-এ গিয়ে ঠেকেছিল এবং অনুভূত হচ্ছিল ৪৬ ডিগ্রি। বছরের এই সময়টায় বৃষ্টির পরিমাণে ব্যাপক ঘাটতি, অন্যান্য বছরের তুলনায় কিছুই না হওয়া– এসবই বিপদসংকেত। শহরটিকে কংক্রিটে ঢেকে ফেলায় দাবদাহ বাড়ছে। বৃক্ষনিধনের পাশাপাশি উন্নয়নের নামে জলাধার ভরাট, উন্মুক্ত স্থান দখল হওয়ায় সবুজায়ন কমেছে। আর এর পরিণামে গরম বাড়ছে। অসুস্থতাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে মানুষ, যা এখন নীরব ঘাতক বলে বিবেচিত হচ্ছে। যে পরিমাণ গাছ মুছে যাচ্ছে এ শহর তথা এ দেশ থেকে, তাতে আসলে পরিবেশ বলে আর কিছু একদিন থাকবে বলে মনে হয় না।
এরমধ্যেই আমাদের নাগরিক মনকে নাড়িয়ে দিলো ঢাকা উত্তর আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) উত্তপ্ত ঢাকার তাপমাত্রা হ্রাসের জন্য যখন ‘চিফ হিট অফিসার’ নিয়োগ দেয়, তখন দক্ষিণ গাছ কেটে ‘সৌন্দর্যবর্ধন’ করে। পরিবেশবাদী ও সচেতন নাগরিকদের বিরোধিতা সত্ত্বেও রাজধানীর ধানমন্ডি সাত মসজিদ সড়কের গাছ কেটে চলেছে করপোরেশন। সৌন্দর্য বাড়াতে গাছ বিনাশ করা হচ্ছে, কিন্তু নগরীতে গাছের চেয়ে সুন্দর আর কী হতে পারে, সে কথা অবশ্য বলতে পারেননি মেয়র কিংবা তার কর্মকর্তারা।
আমাদের প্রশাসক গোষ্ঠী, বিশেষ করে যারা নানা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত, তারা বলেন উন্নয়নের জন্য গাছ কাটতে হয়। কিন্তু উন্নয়ন জিনিসটা যে কী সেটাই মানুষের কাছে আজও পরিষ্কার হলো না। প্রকৃতিকে সঙ্গে করে মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়। সুস্থ প্রকৃতি আর সুন্দর প্রকৃতিই যে আসল উন্নয়ন সেটা প্রকল্প আসক্ত দুর্নীতি আচ্ছন্ন সমাজ বুঝবে না কখনও।
সারা দেশেই এই বৃক্ষনিধন উৎসব চলে। যেদিকে চাইবো সেদিকেই সবুজ ধ্বংসের নিদারুণ চিত্র। উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের অন্তরালে নির্বিচারে অরণ্য ও বৃক্ষনিধন শুধু এরকম একটি বা দুটি কুকীর্তি নয়, দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা দুষ্কৃতি। প্রাকৃতিক কারণেও অনেক গাছ নষ্ট হয়। কিন্তু মানুষের প্রসারিত হাতই এ শহরকে, এ দেশকে সবুজহীন করছে। ঢাকা মহানগরে ২০ ভাগ সবুজ এলাকা থাকা প্রয়োজন, সেখানে আছে সাড়ে আট ভাগের কম। শুধু উন্নয়ন নয়, সবুজ বা উন্মুক্ত জায়গায় বাণিজ্যিক কার্যক্রমও একটি বড় বাধা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সড়ক বড় করছে, তথাকথিত সুন্দর করছে, কিন্তু ছায়াহীন এই সৌন্দর্য তো আসলে মায়াহীন। গাছের প্রতি যে প্রশাসকের মায়া নেই, তার কাছ থেকে মানুষ কী মায়া পাবে আসলে? আমাদের মনে রাখা দরকার ছিল, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে গেলে বাংলাদেশকে বনভূমির পরিমাণ ২২ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে। জাতিসংঘের কাছে এই অঙ্গীকার করেছে সরকার। যেখানে দেশের অন্তত এক-চতুর্থাংশ প্রাকৃতিক সবুজের আচ্ছাদনে ঢাকবার কথা ছিল সেখানে এখন আমরা বৃক্ষকে উজাড় করছি।
একটা বিষয় লক্ষণীয়, দেশের সব শহরের সড়ক প্রসারণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করতে গাছ কাটাই একমাত্র কারিগরি জ্ঞান আমাদের কর্তাব্যক্তিদের। গাছ বাঁচিয়ে, জলাশয় বাঁচিয়ে কী করে উন্নয়ন করা যায়, সেটা আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা কখনও ভাবতে পারেন না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন যে এ কাজটা করছে, তারা কি বন বিভাগের ছাড়পত্র নিয়েছে? যদি নিয়েও থাকে তাহলে বলতে হবে এটি প্রকৃত অর্থে উন্নয়নবিরোধী কাজ হচ্ছে। গাছ পরিবেশের অত্যাবশ্যকীয় অংশ। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা বা অন্য কোথাও নতুন গাছ রোপণ ছাড়াই গাছ কেটে ফেললে আমাদের সবার ওপর প্রভাব পড়ে। কিন্তু কর্মকর্তারা যখন নিজেরাই গাছ কাটেন বা কাটান তখন জনগণ বুঝতে পারে উন্নয়নের জন্য নয়, গাছ কাটা হচ্ছে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য।
উন্নয়নের জন্য গাছ নিধন কোনও প্রতিষ্ঠিত চর্চা হতে পারে না। সরকারকে বন ও বনভূমিতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গাছ কাটা থেকে বিরত থাকার আদেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। বনের বাইরেও এ নিয়ম থাকা উচিত। বিষয়টি দুঃখজনক যে নগর ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সেবা সংস্থা হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন গাছগুলো রক্ষার ব্যাপারে ন্যূনতম সংবেদনশীলতা দেখায়নি।
গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স-২০২০ অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর প্রভাবের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ম এবং দেশের জিডিপিতে ক্ষতির মাত্রা বছরে ০.৪১ শতাংশ। আমাদের মনে রাখা দরকার, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির কথা, যেখানে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিলাম আমরা। স্রেফ ভাবমূর্তি বজায় বা শপথ রক্ষায় নয়, আত্মরক্ষার্থেই বাংলাদেশকে স্বদেশের সবুজ ধ্বংস বন্ধ করতে হবে এবং সেটা এখন থেকেই। শহরে যত লেকপাড়, পার্ক ও মাঠ, রাস্তা ও উন্মুক্ত স্থান রয়েছে শুরু হোক সেখানে বনায়ন কর্মসূচি। এর একটি সামাজিক গণজাগরণ প্রয়োজন। রাজউকের উচিত ভবন নির্মাণে গাছ লাগানোর নির্দেশনা বাধ্যতামূলক করে দেওয়া। মনে রাখা দরকার, পরিবেশ রক্ষা করতে হলে সিটি করপোরেশনসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোকে গণহারে গাছ লাগাতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক
এরমধ্যেই আমাদের নাগরিক মনকে নাড়িয়ে দিলো ঢাকা উত্তর আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) উত্তপ্ত ঢাকার তাপমাত্রা হ্রাসের জন্য যখন ‘চিফ হিট অফিসার’ নিয়োগ দেয়, তখন দক্ষিণ গাছ কেটে ‘সৌন্দর্যবর্ধন’ করে। পরিবেশবাদী ও সচেতন নাগরিকদের বিরোধিতা সত্ত্বেও রাজধানীর ধানমন্ডি সাত মসজিদ সড়কের গাছ কেটে চলেছে করপোরেশন। সৌন্দর্য বাড়াতে গাছ বিনাশ করা হচ্ছে, কিন্তু নগরীতে গাছের চেয়ে সুন্দর আর কী হতে পারে, সে কথা অবশ্য বলতে পারেননি মেয়র কিংবা তার কর্মকর্তারা।
আমাদের প্রশাসক গোষ্ঠী, বিশেষ করে যারা নানা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত, তারা বলেন উন্নয়নের জন্য গাছ কাটতে হয়। কিন্তু উন্নয়ন জিনিসটা যে কী সেটাই মানুষের কাছে আজও পরিষ্কার হলো না। প্রকৃতিকে সঙ্গে করে মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়। সুস্থ প্রকৃতি আর সুন্দর প্রকৃতিই যে আসল উন্নয়ন সেটা প্রকল্প আসক্ত দুর্নীতি আচ্ছন্ন সমাজ বুঝবে না কখনও।
সারা দেশেই এই বৃক্ষনিধন উৎসব চলে। যেদিকে চাইবো সেদিকেই সবুজ ধ্বংসের নিদারুণ চিত্র। উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের অন্তরালে নির্বিচারে অরণ্য ও বৃক্ষনিধন শুধু এরকম একটি বা দুটি কুকীর্তি নয়, দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা দুষ্কৃতি। প্রাকৃতিক কারণেও অনেক গাছ নষ্ট হয়। কিন্তু মানুষের প্রসারিত হাতই এ শহরকে, এ দেশকে সবুজহীন করছে। ঢাকা মহানগরে ২০ ভাগ সবুজ এলাকা থাকা প্রয়োজন, সেখানে আছে সাড়ে আট ভাগের কম। শুধু উন্নয়ন নয়, সবুজ বা উন্মুক্ত জায়গায় বাণিজ্যিক কার্যক্রমও একটি বড় বাধা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সড়ক বড় করছে, তথাকথিত সুন্দর করছে, কিন্তু ছায়াহীন এই সৌন্দর্য তো আসলে মায়াহীন। গাছের প্রতি যে প্রশাসকের মায়া নেই, তার কাছ থেকে মানুষ কী মায়া পাবে আসলে? আমাদের মনে রাখা দরকার ছিল, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে গেলে বাংলাদেশকে বনভূমির পরিমাণ ২২ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে। জাতিসংঘের কাছে এই অঙ্গীকার করেছে সরকার। যেখানে দেশের অন্তত এক-চতুর্থাংশ প্রাকৃতিক সবুজের আচ্ছাদনে ঢাকবার কথা ছিল সেখানে এখন আমরা বৃক্ষকে উজাড় করছি।
একটা বিষয় লক্ষণীয়, দেশের সব শহরের সড়ক প্রসারণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করতে গাছ কাটাই একমাত্র কারিগরি জ্ঞান আমাদের কর্তাব্যক্তিদের। গাছ বাঁচিয়ে, জলাশয় বাঁচিয়ে কী করে উন্নয়ন করা যায়, সেটা আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা কখনও ভাবতে পারেন না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন যে এ কাজটা করছে, তারা কি বন বিভাগের ছাড়পত্র নিয়েছে? যদি নিয়েও থাকে তাহলে বলতে হবে এটি প্রকৃত অর্থে উন্নয়নবিরোধী কাজ হচ্ছে। গাছ পরিবেশের অত্যাবশ্যকীয় অংশ। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা বা অন্য কোথাও নতুন গাছ রোপণ ছাড়াই গাছ কেটে ফেললে আমাদের সবার ওপর প্রভাব পড়ে। কিন্তু কর্মকর্তারা যখন নিজেরাই গাছ কাটেন বা কাটান তখন জনগণ বুঝতে পারে উন্নয়নের জন্য নয়, গাছ কাটা হচ্ছে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য।
উন্নয়নের জন্য গাছ নিধন কোনও প্রতিষ্ঠিত চর্চা হতে পারে না। সরকারকে বন ও বনভূমিতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গাছ কাটা থেকে বিরত থাকার আদেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। বনের বাইরেও এ নিয়ম থাকা উচিত। বিষয়টি দুঃখজনক যে নগর ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সেবা সংস্থা হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন গাছগুলো রক্ষার ব্যাপারে ন্যূনতম সংবেদনশীলতা দেখায়নি।
গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স-২০২০ অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর প্রভাবের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ম এবং দেশের জিডিপিতে ক্ষতির মাত্রা বছরে ০.৪১ শতাংশ। আমাদের মনে রাখা দরকার, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির কথা, যেখানে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিলাম আমরা। স্রেফ ভাবমূর্তি বজায় বা শপথ রক্ষায় নয়, আত্মরক্ষার্থেই বাংলাদেশকে স্বদেশের সবুজ ধ্বংস বন্ধ করতে হবে এবং সেটা এখন থেকেই। শহরে যত লেকপাড়, পার্ক ও মাঠ, রাস্তা ও উন্মুক্ত স্থান রয়েছে শুরু হোক সেখানে বনায়ন কর্মসূচি। এর একটি সামাজিক গণজাগরণ প্রয়োজন। রাজউকের উচিত ভবন নির্মাণে গাছ লাগানোর নির্দেশনা বাধ্যতামূলক করে দেওয়া। মনে রাখা দরকার, পরিবেশ রক্ষা করতে হলে সিটি করপোরেশনসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোকে গণহারে গাছ লাগাতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক