পাইলট প্রকল্পের আওতায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি নিচ্ছে মিয়ানমার। সেখানকার পরিবেশ ও পরিস্থিতি যাচাই করতে গত ৫ মে বাংলাদেশের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে ২০ সদস্যের রোহিঙ্গা প্রতিনিধি দল রাখাইনে পরিদর্শন করেছে। রোহিঙ্গা প্রতিনিধি দলের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ একাধিক সংস্থার আরও ৭ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। দিনব্যাপী পরিদর্শনকালে তারা মংডু শহরের আশপাশের অন্তত ১৫টি গ্রাম ঘুরে দেখেন। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরুর ক্ষেত্রে এটি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় একটি পদক্ষেপ।
পরিদর্শনের সময় মংডু ট্রানজিট কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত রোহিঙ্গা প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে মংডু জেলা প্রশাসক বলেন, বাংলাদেশ থেকে ফিরে আসা রোহিঙ্গাদের মংডু ট্রানজিট কেন্দ্রে তিন দিন রাখা হবে। তারপর সরাসরি মডেল ভিলেজে স্থানান্তর করা হবে। তখন মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতিস্বরূপ রোহিঙ্গাদের এনভিসি (ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন সার্টিফিকেট) দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান করা হবে। তবে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে প্রতিনিধিরা প্রত্যাবাসনের আগেই নাগরিকত্ব নিশ্চিত ও সরাসরি তাদের নিজস্ব আবাসস্থলে ফেরত নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। পাইলট প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে মিয়ানমার ১১৭৬ জনকে ফিরিয়ে নেবে।
বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১২ লাখ। এরমধ্যে ৮ লাখ এসেছে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর কয়েক মাসে রাখাইন রাজ্য থেকে। এরপর ২০১৮ ও ২০১৯ সালে পরপর দুবার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি না হওয়ায় রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। মিয়ানমারের অনাগ্রহে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়, ফলে প্রায় ৬ বছর অতিবাহিত হলেও একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। তবে প্রথম দুটি উদ্যোগ রোহিঙ্গাদের অনীহার ফলে বাস্তবায়িত না হলেও দীর্ঘদিন ক্যাম্পের আবদ্ধ পরিবেশে অবস্থানের ফলে তাদের সেই মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে।
২০২২ সালে প্রত্যাবাসনের দাবিতে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে ‘বাড়ি চলো’ আন্দোলনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের দাবি তোলা থেকেই তা স্পষ্ট হয়। এ সময় রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করতে তারা মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানায়। সেই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের পক্ষে ক্যাম্পের অভ্যন্তরেও জনমত গঠন করে।
চীনের তৎপরতা:
মিয়ানমারের প্রতিবেশী দুই বৃহৎ শক্তি ভারত ও চীন রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কোনও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বিপরীতে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে মিয়ানমারের সরকার চীন ও রাশিয়া থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা পেয়ে আসছে। ফলে প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বরাবরই মিয়ানমারের অনাগ্রহ পরিলক্ষিত হয়েছে। ইতিপূর্বে চীন কয়েকবার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগে মধ্যস্থতার কথা বললেও বাস্তবে সেগুলো কার্যকর হয়নি। তবে এবারের উদ্যোগটি সম্পূর্ণ ভিন্ন, যা রাখাইন পরিদর্শন থেকে ফিরে আসা প্রতিনিধিদলের ভাষ্য থেকেই বোঝা যায়। এছাড়াও, গত বছর থেকেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে চীনের তৎপরতা বেড়েছে।
চীনের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় বাংলাদেশ থেকে পাঠানো ৮ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা থেকে ১১৪০ জনকে প্রাথমিকভাবে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা জানায় মিয়ানমার সরকার। দুই ধাপে যাদের পরিচয় যাচাই সম্পন্ন হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে মিয়ানমারের নেপিডো সফর করে প্রত্যাবাসন বিষয়ে জান্তা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেন চীনের বিশেষ দূত দেং সি জুন। গত এপ্রিলে ঢাকায় এসে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করেন। ঢাকা ও নেপিডো আলোচনার ধারাবাহিকতায় গত ১৮ এপ্রিল কুনমিংয়ে চীনের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। এর আগে মার্চে বাংলাদেশসহ আট দেশের কূটনীতিকেরা রাখাইন সফর করেন।
৬ মে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এক সিম্পোজিয়ামে বলেন, চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল দেশ হিসেবে রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ‘অবিচলভাবে মধ্যস্থতা’র কাজ করছে। প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নে সাম্প্রতিক তৎপরতার পেছনে চীনের বিশ্ব নেতৃত্বে পদার্পণের বাসনা যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে তা স্বীকার করতেই হবে। ভূ-রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারে চীনের সাম্প্রতিক তৎপরতার অংশ হিসেবেই এটিকে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এ লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেই রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে চীন। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন এর সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ। একইভাবে জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করলেও রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনে সোচ্চার চীন। ফলে তাদের এই অব্যাহত প্রচেষ্টা থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে চীনের মধ্যস্থতায় এবারের প্রত্যাবাসন উদ্যোগটি বাস্তবতার মুখ দেখবে।
জাতিসংঘ ও পশ্চিমাদের সম্পৃক্ততা:
সম্প্রতি চীনের মধ্যস্থতায় যে প্রত্যাবাসন উদ্যোগ, তাতে ইউএনএইচসিআরকে পাশে চায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার চুক্তি অনুযায়ী, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কাজটি সম্পাদন করার কথা ইউএনএইচসিআর-এর। কিন্তু একদিকে সামরিক জান্তার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, অন্যদিকে চীনের মধ্যস্থতার কারণে পশ্চিমা দাতাদের অনাগ্রহে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে যুক্ত হতে চায় না সংস্থাটি। গত মার্চে সংস্থাটি রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের টেকসই প্রত্যাবর্তনের জন্য অনুকূল নয় বলে মন্তব্য করে। সেই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের আলোচনায় তারা জড়িত নয় বলে সাফ জানিয়ে দেয়।
পশ্চিমা দেশগুলো রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই সরব। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বৃহৎ কোনও ব্যবস্থা নিতে না পারলেও জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ফোরামে তারা সবসময়ই মিয়ানমারকে চাপে রেখেছে। প্রায় ৬ বছর যাবৎ বিশ্বের সর্ববৃহৎ শরণার্থী শিবির পরিচালনার অর্থসংস্থানেও তাদের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। বিশেষভাবে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচিসিআর রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল সংগ্রহসহ শরণার্থীদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই তহবিলের অধিকাংশই পশ্চিমা দাতাদের থেকে প্রাপ্ত। তহবিলের প্রধান দাতা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই সমস্যার টেকসই সমাধানের কোনও পথ দেখাতে পারেনি। পাইলট প্রকল্পেও তাদের অনাগ্রহ এবং জাতিসংঘের অসম্পৃক্ততা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে তাদের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। সুতরাং টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিতের জন্য ইউএনএইচসিআর-এর উচিত হবে পাইলট প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রত্যাবাসনের সঠিক পরিবেশ ও নিরাপত্তার বিষয়ে মিয়ানমারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে রোহিঙ্গাদের সদিচ্ছা:
রাখাইন থেকে ফিরে এসে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সেখানকার পরিবেশ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের সম্পূর্ণ অনুকূলে রয়েছে বলে গণমাধ্যমে জানিয়েছেন তারা। সেখানে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য মডেল ভিলেজ তৈরি করা হয়েছে এবং প্রত্যেক পরিবারের কৃষিকাজের জন্য ১ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি গ্রামেই একটি হাসপাতাল, ধর্মপালনের জন্য মসজিদ ও খেলাধুলার জন্য মাঠ তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও সেখানকার স্কুলে শিশুদের পড়াশোনার সুযোগের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য থাকছে চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুযোগ।
তবে পরিদর্শন পরবর্তীতে রোহিঙ্গাদের দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়েছে। রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ বলছে, সেখানে প্রত্যাবাসনের যথাযথ পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি। সেখানে তাদের গ্রামগুলো ধ্বংস করে সেনা ও পুলিশ ব্যারাক ও চৌকি বসানো হয়েছে। ফলে তাদের নিজেদের পুরাতন আবাস্থলে ফেরা এখনও অনিশ্চিত। তারা জানিয়েছে, রোহিঙ্গারা এনভিসির মাধ্যমে অতিথি হয়ে ফিরতে রাজি নয়, বরং নাগরিকত্ব দিয়ে প্রত্যাবাসন শুরু করতে হবে।
বিপরীতে রোহিঙ্গাদেরই একটি গ্রুপ বলছে, রাখাইন পরিস্থিতি বুঝতে হলে প্রত্যাবাসনে কিছু রোহিঙ্গার সাড়া দেওয়া উচিত। এতে সরেজমিন রাখাইনের প্রকৃত অবস্থা জানা যাবে এবং মিয়ানমার সরকারের মনোভাব বোঝা যাবে। না গেলে জানা হবে না এবং তাতে সংকটের নিরসন ঘটবে না।
প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা প্রদান সবসময়ই রোহিঙ্গাদের প্রধান উদ্বেগ ছিল। তা সত্ত্বেও বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার সরকারের এই পদক্ষেপে সাড়া দেওয়া উচিত। ইতোপূর্বে যেহেতু মিয়ানমারের পক্ষ থেকে এ ধরনের বৃহৎ কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি এবং সেগুলোর কোনও স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করা হয়নি, তাই প্রথম দুটি পদক্ষেপে রোহিঙ্গাদের উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ ছিল। কিন্তু এবারের উদ্যোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে মিয়ানমারের আন্তরিকতার ব্যাপারটিও বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের ভাষ্যে উঠে এসেছে। ফলে অন্তত দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভাঙতে মিয়ানমারের এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগে সাড়া দিয়ে প্রত্যাবাসনের প্রথম ধাপ শুরু করা উচিত।
লেখক: যুক্তরাজ্যের বস্টন ইউনিভার্সিটিতে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ে পিএইচডি গবেষক
পরিদর্শনের সময় মংডু ট্রানজিট কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত রোহিঙ্গা প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে মংডু জেলা প্রশাসক বলেন, বাংলাদেশ থেকে ফিরে আসা রোহিঙ্গাদের মংডু ট্রানজিট কেন্দ্রে তিন দিন রাখা হবে। তারপর সরাসরি মডেল ভিলেজে স্থানান্তর করা হবে। তখন মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতিস্বরূপ রোহিঙ্গাদের এনভিসি (ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন সার্টিফিকেট) দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান করা হবে। তবে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে প্রতিনিধিরা প্রত্যাবাসনের আগেই নাগরিকত্ব নিশ্চিত ও সরাসরি তাদের নিজস্ব আবাসস্থলে ফেরত নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। পাইলট প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে মিয়ানমার ১১৭৬ জনকে ফিরিয়ে নেবে।
বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১২ লাখ। এরমধ্যে ৮ লাখ এসেছে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর কয়েক মাসে রাখাইন রাজ্য থেকে। এরপর ২০১৮ ও ২০১৯ সালে পরপর দুবার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি না হওয়ায় রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। মিয়ানমারের অনাগ্রহে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়, ফলে প্রায় ৬ বছর অতিবাহিত হলেও একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। তবে প্রথম দুটি উদ্যোগ রোহিঙ্গাদের অনীহার ফলে বাস্তবায়িত না হলেও দীর্ঘদিন ক্যাম্পের আবদ্ধ পরিবেশে অবস্থানের ফলে তাদের সেই মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে।
২০২২ সালে প্রত্যাবাসনের দাবিতে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে ‘বাড়ি চলো’ আন্দোলনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের দাবি তোলা থেকেই তা স্পষ্ট হয়। এ সময় রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করতে তারা মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানায়। সেই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের পক্ষে ক্যাম্পের অভ্যন্তরেও জনমত গঠন করে।
চীনের তৎপরতা:
মিয়ানমারের প্রতিবেশী দুই বৃহৎ শক্তি ভারত ও চীন রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কোনও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বিপরীতে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে মিয়ানমারের সরকার চীন ও রাশিয়া থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা পেয়ে আসছে। ফলে প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বরাবরই মিয়ানমারের অনাগ্রহ পরিলক্ষিত হয়েছে। ইতিপূর্বে চীন কয়েকবার প্রত্যাবাসনের উদ্যোগে মধ্যস্থতার কথা বললেও বাস্তবে সেগুলো কার্যকর হয়নি। তবে এবারের উদ্যোগটি সম্পূর্ণ ভিন্ন, যা রাখাইন পরিদর্শন থেকে ফিরে আসা প্রতিনিধিদলের ভাষ্য থেকেই বোঝা যায়। এছাড়াও, গত বছর থেকেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে চীনের তৎপরতা বেড়েছে।
চীনের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় বাংলাদেশ থেকে পাঠানো ৮ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা থেকে ১১৪০ জনকে প্রাথমিকভাবে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা জানায় মিয়ানমার সরকার। দুই ধাপে যাদের পরিচয় যাচাই সম্পন্ন হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে মিয়ানমারের নেপিডো সফর করে প্রত্যাবাসন বিষয়ে জান্তা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেন চীনের বিশেষ দূত দেং সি জুন। গত এপ্রিলে ঢাকায় এসে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করেন। ঢাকা ও নেপিডো আলোচনার ধারাবাহিকতায় গত ১৮ এপ্রিল কুনমিংয়ে চীনের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। এর আগে মার্চে বাংলাদেশসহ আট দেশের কূটনীতিকেরা রাখাইন সফর করেন।
৬ মে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এক সিম্পোজিয়ামে বলেন, চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল দেশ হিসেবে রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ‘অবিচলভাবে মধ্যস্থতা’র কাজ করছে। প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নে সাম্প্রতিক তৎপরতার পেছনে চীনের বিশ্ব নেতৃত্বে পদার্পণের বাসনা যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে তা স্বীকার করতেই হবে। ভূ-রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারে চীনের সাম্প্রতিক তৎপরতার অংশ হিসেবেই এটিকে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এ লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেই রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে চীন। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন এর সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ। একইভাবে জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করলেও রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনে সোচ্চার চীন। ফলে তাদের এই অব্যাহত প্রচেষ্টা থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে চীনের মধ্যস্থতায় এবারের প্রত্যাবাসন উদ্যোগটি বাস্তবতার মুখ দেখবে।
জাতিসংঘ ও পশ্চিমাদের সম্পৃক্ততা:
সম্প্রতি চীনের মধ্যস্থতায় যে প্রত্যাবাসন উদ্যোগ, তাতে ইউএনএইচসিআরকে পাশে চায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার চুক্তি অনুযায়ী, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কাজটি সম্পাদন করার কথা ইউএনএইচসিআর-এর। কিন্তু একদিকে সামরিক জান্তার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, অন্যদিকে চীনের মধ্যস্থতার কারণে পশ্চিমা দাতাদের অনাগ্রহে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে যুক্ত হতে চায় না সংস্থাটি। গত মার্চে সংস্থাটি রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের টেকসই প্রত্যাবর্তনের জন্য অনুকূল নয় বলে মন্তব্য করে। সেই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের আলোচনায় তারা জড়িত নয় বলে সাফ জানিয়ে দেয়।
পশ্চিমা দেশগুলো রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই সরব। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বৃহৎ কোনও ব্যবস্থা নিতে না পারলেও জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ফোরামে তারা সবসময়ই মিয়ানমারকে চাপে রেখেছে। প্রায় ৬ বছর যাবৎ বিশ্বের সর্ববৃহৎ শরণার্থী শিবির পরিচালনার অর্থসংস্থানেও তাদের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। বিশেষভাবে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচিসিআর রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল সংগ্রহসহ শরণার্থীদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই তহবিলের অধিকাংশই পশ্চিমা দাতাদের থেকে প্রাপ্ত। তহবিলের প্রধান দাতা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই সমস্যার টেকসই সমাধানের কোনও পথ দেখাতে পারেনি। পাইলট প্রকল্পেও তাদের অনাগ্রহ এবং জাতিসংঘের অসম্পৃক্ততা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে তাদের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। সুতরাং টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিতের জন্য ইউএনএইচসিআর-এর উচিত হবে পাইলট প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রত্যাবাসনের সঠিক পরিবেশ ও নিরাপত্তার বিষয়ে মিয়ানমারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে রোহিঙ্গাদের সদিচ্ছা:
রাখাইন থেকে ফিরে এসে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সেখানকার পরিবেশ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের সম্পূর্ণ অনুকূলে রয়েছে বলে গণমাধ্যমে জানিয়েছেন তারা। সেখানে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য মডেল ভিলেজ তৈরি করা হয়েছে এবং প্রত্যেক পরিবারের কৃষিকাজের জন্য ১ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি গ্রামেই একটি হাসপাতাল, ধর্মপালনের জন্য মসজিদ ও খেলাধুলার জন্য মাঠ তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও সেখানকার স্কুলে শিশুদের পড়াশোনার সুযোগের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য থাকছে চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুযোগ।
তবে পরিদর্শন পরবর্তীতে রোহিঙ্গাদের দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়েছে। রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ বলছে, সেখানে প্রত্যাবাসনের যথাযথ পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি। সেখানে তাদের গ্রামগুলো ধ্বংস করে সেনা ও পুলিশ ব্যারাক ও চৌকি বসানো হয়েছে। ফলে তাদের নিজেদের পুরাতন আবাস্থলে ফেরা এখনও অনিশ্চিত। তারা জানিয়েছে, রোহিঙ্গারা এনভিসির মাধ্যমে অতিথি হয়ে ফিরতে রাজি নয়, বরং নাগরিকত্ব দিয়ে প্রত্যাবাসন শুরু করতে হবে।
বিপরীতে রোহিঙ্গাদেরই একটি গ্রুপ বলছে, রাখাইন পরিস্থিতি বুঝতে হলে প্রত্যাবাসনে কিছু রোহিঙ্গার সাড়া দেওয়া উচিত। এতে সরেজমিন রাখাইনের প্রকৃত অবস্থা জানা যাবে এবং মিয়ানমার সরকারের মনোভাব বোঝা যাবে। না গেলে জানা হবে না এবং তাতে সংকটের নিরসন ঘটবে না।
প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা প্রদান সবসময়ই রোহিঙ্গাদের প্রধান উদ্বেগ ছিল। তা সত্ত্বেও বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার সরকারের এই পদক্ষেপে সাড়া দেওয়া উচিত। ইতোপূর্বে যেহেতু মিয়ানমারের পক্ষ থেকে এ ধরনের বৃহৎ কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি এবং সেগুলোর কোনও স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করা হয়নি, তাই প্রথম দুটি পদক্ষেপে রোহিঙ্গাদের উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ ছিল। কিন্তু এবারের উদ্যোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে মিয়ানমারের আন্তরিকতার ব্যাপারটিও বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের ভাষ্যে উঠে এসেছে। ফলে অন্তত দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভাঙতে মিয়ানমারের এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগে সাড়া দিয়ে প্রত্যাবাসনের প্রথম ধাপ শুরু করা উচিত।
লেখক: যুক্তরাজ্যের বস্টন ইউনিভার্সিটিতে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ে পিএইচডি গবেষক