ছোট সময় থেকে শুনে আসছি ‘পচা শামুকে পা কাটা’র প্রবাদ। ধারালো কিছুতে পায়ে ক্ষত হলেও যত না ক্ষতি, অনেক ছোট আর পচা শামুকের খোলসে পা কাটা গেলে তা বিপজ্জনক হয়। মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। নিরাময় অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে। দুরারোগ্য পচনে পা কেটে ফেলতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ এই পচা শামুকের মতো গুরুত্বহীন অনেক ব্যাপারেও অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হয়। ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার এবং নির্বাচন কমিশন সেই পচা শামুকে পা কাটার পরিস্থিতিতে পড়েছে।
সামান্য অসতর্কতার কারণে এখন এই মাশুল দিতে হচ্ছে তাদের। এর শেষ পরিণতি কোথায় গড়ায় তা এখনি বলা মুশকিল।
দূর দেশে বসেও লাইভ দেখছিলাম পুরো বিষয়টি। প্রার্থী হিরো আলমের ওপর হামলার শুরু থেকে প্রায় শেষ পর্যন্ত দেখা গেলো। পুলিশের ভূমিকা, সাংবাদিকদের ভূমিকা, রিকশা চালকের ভূমিকা, হিরো আলমের সঙ্গে মানুষগুলোর ভূমিকা সবই পর্যবেক্ষণ করা গেছে সহজভাবে। দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে মন খারাপ হয়েছে। ক্ষুব্ধ হয়েছি। আশ্চর্য হয়েছি। বিস্মিত হয়েছি। যারা রাজনীতি করেন তারা হয়তো পুরো বিষয়টিকে তাদের মতো করে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করবেন এটাই স্বাভাবিক।
দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী পত্রিকার অনলাইন লাইভে দেখছিলাম। একদম শুরুতে হিরো আলমকে দেখা যায় কিছুক্ষণ কিছু ছেলেপেলের দিকে তেড়ে যেতে। ছেলেগুলোও তাকে উত্তেজিত করছিল। একপর্যায়ে ছেলেগুলো হিরো আলমকে কিল ঘুসি মারতে শুরু করে। অনেক পুলিশের উপস্থিতি দেখা গেছে। পুলিশ তার কাছে আসে। তাকে আগলে ধরে গেটের বাইরে নিয়ে যায় একজন কর্মকর্তা। পুলিশ যখন হিরো আলমকে ধরে রেখেছিল তখনও ছেলেগুলো ফাঁকফোকর দিয়ে ঠিকই কিল ঘুসি মেরে যাচ্ছিল। বাইরে ছেড়ে দিয়ে আসার পরে ছেলেগুলো তাকে উপর্যুপরি লাথি ঘুসি মারতে থাকে দলবেঁধে। হিরো আলম রাস্তায় পড়ে গেলেও চলে মারধর। উঠে সামনে দৌড়াতে থাকেন। একপর্যায়ে একটি রিকশায় উঠে আবার নেমে যান। চলতে থাকে ধাওয়া। তিনি দৌড়াতে থাকেন। তখন তার আশপাশে ছিল না কোনও পুলিশ সদস্য কিংবা তার সঙ্গে যারা ছিলেন তাদেরও দেখা যায়নি।
লাইভে দেখা যায় একজন সংবাদকর্মী ঘটনার শুরুর দিকে কেন্দ্রের মাঠে থাকা অবস্থায় বারবার পুলিশ ডাকছে হিরোকে রক্ষার জন্য। এমনকি ওই সংবাদকর্মী দৌড়ে একজন কর্মকর্তা পর্যায়ের পুলিশ সদস্যের কাছে যান। ওই পুলিশ সদস্যকে বলতে শোনা যায় তার ডিউটি ভেতরে, বাইরে অন্য গ্রুপ। তিনি বাইরে যেতে পারবেন না।
আশ্চর্য আর বিস্ময়ের বিষয়ে হচ্ছে ভোটকেন্দ্রের বাইরে অবশ্যই পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিত থাকার কথা। কিন্তু তারা কেউ এগিয়ে গেলেন না কেন? এমনকি লাইভ চলাকালে পরিষ্কার দেখা গেছে যে পুলিশ সদস্য হিরো আলমকে আগলে বাইরে বের করে দিচ্ছিলেন তিনি বা অন্য কোনও সদস্য হামলাকারীদের কোনোভাবেই নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেননি। তদন্তে অবশ্যই এই বিষয়টি উঠে আসা দরকার।
আবার হামলাকারীদের বেশিরভাগের বয়সই খুব কম বলে মনে হয়েছে। বেশিরভাগই ছিল কিশোর। নৌকার ব্যাজ ছিল। তারা ভোটার কিনা সেটা নিয়েও আমার কিছুটা সন্দেহ আছে। যদি তাই হয় তবে তারা কেন্দ্রের ভিতর ঢুকলো কীভাবে? সেখানে কি আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের সিনিয়র নেতারা ছিলেন না? তারাও কি ঘটনার পরিণতি বুঝতে পারেননি? নাকি তারাও এমনটা চেয়েছেন বা তাদের নির্দেশে এমনটা হয়েছে?
জবাব যাই হোক, দৃশ্যত এটা পরিষ্কার যে উপস্থিত কোনও নেতা কিংবা প্রশাসনের কেউ কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ তাৎক্ষণিক হামলাকারীদের বাধা না দিয়ে পরোক্ষভাবে প্রশ্রয় দিয়েছেন।
ভোট চলাকালে কেন্দ্রের মধ্যে কিংবা বাইরে ২০০ গজের মধ্যে অবশ্যই ভোটকেন্দ্রের দায়িত্ব পালনকারীদের আওতায় থাকে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কেন তৎপর হলেন না তাৎক্ষণিক নিবৃত্ত করতে। একজন প্রার্থী ছাড়াও কেন্দ্রের মধ্যে বা কেন্দ্রের বাইরে সাধারণ ভোটারের সঙ্গে এমন বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখলেও পুলিশের ভূমিকা রাখার কথা, কিন্তু সেটাও হয়নি।
অন্যদিকে সকাল থেকেই হিরো আলমকে বলতে শোনা যাচ্ছিল, বিভিন্ন পর্যায়ে খবরে আসছিল যে তিনি তার এবং তার কর্মীদের ওপর নির্যাতনের বিষয়গুলো দেখানোর জন্যই শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকবেন, নির্বাচন বয়কট করবেন না। এমনকি দুপুরের দিকেও কোনও কোনও গণমাধ্যমের কাছে তিনি বলেছেন তার ওপরে নির্যাতন হতে পারে সেটা তিনি দেখাতে চান। এসব দেখে-শুনেও নির্বাচন কর্মকর্তারা কিংবা পুলিশ প্রশাসন তার প্রতি কেন আরও গুরুত্ব দিলেন না কিংবা চোখ-কান খোলা রাখলেন না! তাকে পুলিশ প্রটেকশন দিলেও বা কী ক্ষতি হতো! ধরে নিই তিনি চাননি, কিন্তু তার মতিগতি বুঝেও তাকে কি প্রটেকশন দেওয়া যেতো না! কেন্দ্রের মধ্যে তার ওপরে হামলার সময় তাকে ওভাবে একা বাইরে বের করে দিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা কীভাবে নিশ্চিন্ত রইলেন। তখনও তো তাকে প্রটেকশনে নিয়ে আসা যেতো। এর আগে অনেক নির্বাচনে প্রার্থীরা চাইলে বা না চাইলেও প্রোটেকশন দেওয়ার ঘটনা দেখেছি। ঘটনার সময় পুলিশের তো উচিত ছিল তাকে উদ্ধার করে কমপক্ষে তার গাড়িতে বা নিরাপদ অবস্থান পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার।
এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হলো এর দায় কি সহজে সংশ্লিষ্টরা এড়াতে পারবেন!
ধরে নিই ঘটনা যদি হিরো আলম বা তৃতীয় কোনও পক্ষের সাজানো হয়, সেটাও কেন আমাদের দক্ষ কর্মকর্তারা আগে টের পেলেন না। ব্যক্তি হিরো আলমকে পাত্তা না দিলেও প্রার্থী হিরো আলমকে কেন গুরুত্ব দেওয়া হলো না? বিশেষ করে দেশে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রশাসনকে কি আরও সতর্ক থাকা উচিত ছিল না? অবশ্যই ছিল।
বিশেষ করে মাত্র কয়েক দিন আগে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটের দিন ঠিক এমনই ঘটেছিল। সেদিনও একেবারে শেষ পর্যায়ে ইসলামি আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থীর ওপর আকস্মিক হামলার ঘটনার ঘটে। রক্তাক্ত হয় তার দাঁত ও মুখ। এবারের ঘটনাও ভোটের শেষভাগে ঘটে এবং অনেকটা একই কায়দায়। মনে হয় বরিশালের পুনরাবৃত্তি ঘটলো।
অবশ্য ইউটিউবার হিরো আলমের জন্য একেবারেই মোক্ষম একটি প্রেক্ষাপটে তৈরি হলো ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচন ঘিরে। ঢাকার বনানী বিদ্যানিকেতনের সামনের রাস্তায় দৌড়াতে দৌড়াতে একজন প্রার্থী ইউটিউবার মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে গেছেন দেশ-বিদেশে।
যদিও একটি প্রশ্ন জাগে– তিনি নাকি দামি গাড়িতে ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করছিলেন, কিন্তু ঘটনার সময় তিনি নিজের গাড়ির দিকে না গিয়ে অন্যদিকে দৌড়াচ্ছিলেন কেন? তিনি যখন দৌড়াচ্ছিলেন তার সঙ্গীরা কি করছিল? তারা কি শুধুই শুটিং করছিলেন? তবে যা-ই হোক, তিনি সার্থক এবং সফল। মনে করি একজন ইউটিউবার হিসেবে তিনি এত বছর ধরে যে সাধনা করে আসছিলেন ভাইরাল আর ভিউ পাওয়ার শিখরে পৌঁছার, তিনি তা পেয়ে গেলেন কয়েক মুহূর্তে। সেটা হয়তো তার স্বপ্নের চেয়েও বেশি পেয়েছেন। তিনি এখন পৌঁছে গেলেন যুক্তরাষ্ট্র সরকার আর জাতিসংঘের দরবারে। হয়তো পৌঁছে যাবেন আরও কোথাও। বলা যায়, হেরেও বড় ব্যবধানে জিতে গেছেন হিরো আলম। এখন কেবল বেরিয়ে আসুক তার এমন জয়ের পেছনে ভূমিকা রেখেছেন কোন কীর্তিমানরা! যার ফলে জিতেও চরম হারের খেসারত দিতে হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলটিকে।
লেখক: সাংবাদিক