আমরা যেমন শিক্ষা চাই, তেমন শিক্ষক প্রয়োজন

গত বছরের এই দিনে দেশের সর্বস্তরের শিক্ষক ও শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে লিখেছিলাম, এবার শুধু শিক্ষা প্রশাসন নিয়ে লিখতে চাই। যেহেতু শিক্ষার নীতি-নির্ধারণে থাকে শিক্ষা প্রশাসন। তাহলে ‘কেমন শিক্ষক চাই’– তা নির্ভর করে কেমন শিক্ষা প্রশাসন আছে তার ওপর।

একটি দেশের বিভিন্ন সেক্টরের নীতিনির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট সেক্টরের স্পেশালিস্ট তৈরি করতে হয়। আর সে লক্ষে সংশ্লিষ্ট সেক্টরের জন্য যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে তাদেরকে অধিকতর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়। বাংলাদেশেও এই ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্ব হচ্ছে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ওপর। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চাহিদা মোতাবেক পিএসসি দেশের চাহিদা পূরণে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী জনশক্তি নিয়োগ দেয়। যাদেরকে বিসিএস (ক্যাডার) কর্মকর্তা বলা হয়। বিভিন্ন সেক্টরের দেখভাল করা এবং এর উন্নয়ন নিয়ে গবেষণা করার লক্ষে দেশের ২৫টি ভিন্ন সেক্টরের জন্য বর্তমানে মোট ২৫টি ক্যাডার রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে– এই ২৫টি সেক্টরের মধ্যে ২৪টি সেক্টর বর্তমানে একটি ক্যাডারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এমনকি প্রফেশনাল সার্ভিস দেখভালের জন্যও এই নন-প্রফেশনাল ক্যাডার কর্মকর্তারা নিয়োজিত রয়েছেন।

১ জানুয়ারি, ১৯৮১ এর বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত ২৮টি ক্যাডারের মধ্যে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারটি তৈরি হয়েছিলো গোটা শিক্ষা সেক্টরের ১৪টি উইংয়ের দেখভাল করার জন্য। যার মাত্র ৩টি উইং এখন শিক্ষা ক্যাডারের দায়িত্বে রয়েছে।

শুধুমাত্র প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরেই শিক্ষা ক্যাডারের ছিল ৫১২টি পদ। এর মধ্যে হয়তো সর্বোচ্চ ১২টি পদে শিক্ষা ক্যাডারের ব্যক্তিদের পদায়ন করা হয়েছিল। একদিকে শিক্ষা ক্যাডারের পদ দখল করে নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে ‘পদ ফাঁকা নেই’ জানিয়ে তাদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে না।

শিক্ষা ক্যাডারের পদে তাদের পদায়ন না করার অভিযোগে যখন তারা প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন, তখন ওই ৫১২টি পদকে ‘প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের নন-গেজেটেড কর্মকর্তা নিয়োগ বিধিমালা ২০২৩’ এ অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষা ক্যাডারের কাছ থেকে উক্ত পদগুলো স্থায়ীভাবে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করেছে। গত ২ অক্টোবর, ২০২৩ তারিখে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে সারাদেশে সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করা হয়েছে। আগামীতে লাগাতার কর্মবিরতির হুমকি দিয়েছে শিক্ষা ক্যাডারের এই সংগঠনটি।

তার মানে শিক্ষার নীতিনির্ধারণীর জন্য যে শিক্ষা ক্যাডারের জন্ম হয়েছিলো, তা অধরাই রয়ে গেছে। পেশাদার (professional) ক্যাডারের কাজ একটা অ-পেশাদার ক্যাডার হাতিয়ে নিয়েছেন। ফলে স্বাধীনতার ৫০ বছরেও কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌঁছাতে পারেনি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা।
একই ব্যক্তি ২০২০ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে, ২০২১ সালে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে আর ২০২৩ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থা যেমন হওয়ার কথা, তার ধারে কাছেও পৌঁছাতে পারেনি। আন্তর্জাতিক মানে দেশের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও প্রথম এক হাজারের মধ্যেও নেই।

পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো জন্য স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির জনক একজন অধ্যাপককে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে (এবং একজন ডাক্তারকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে) নিয়োগ দিয়েছিলেন। ৭৫ পরবর্তী সময়ে সেটাও ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ধীরে ধীরে শিক্ষা ক্যাডারের পদগুলোতে অ-শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে পুরো ব্যবস্থাকে হ-য-ব-র-ল করে ফেলা হয়েছে। নয়টি শিক্ষা কমিশন গঠন করা হলেও, সবগুলো কমিশনের সুপারিশ মন্ত্রণালয়ের ডিপ ফ্রিজে আটকে রেখে শিক্ষকদের শুধু সান্ত্বনার বাণী দিয়ে পঞ্চাশ বছর পার করেছে শিক্ষার প্রশাসন।

কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল স্তরের শিক্ষককে এদেশের মানুষ প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পান। একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে বাংলাদেশের সকল স্তরের শিক্ষকই তাদের পেশায় অসন্তুষ্ট। কেন তারা তাদের পেশায় সন্তুষ্ট নন– সেটা আরেকটি গবেষণার বিষয়। তবে শিক্ষকদের অসন্তুষ্ট রেখে স্মার্ট বাংলাদেশ গঠন সম্ভব নয়, এটা যে কেউ অনুধাবন করতে পারেন। সম্প্রতি একটি পত্রিকার জরিপে দেখা যায় এদেশের সাধারণ জনগণ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর নাখোশ। সাধ্য থাকলে তারা তাদের সন্তানকে এদেশে পড়াতে চান না। কেন এমন হলো? স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও কেন দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর রয়েছেন? 

বিষয়টি বোঝার জন্য একটি সহজ সরল উদাহরণ দিই।

ধরুন, একজন জ্বিন তত্ত্বের ওপর ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং খুবই যোগ্য একজন গবেষক তিনি। তাকে যদি মাটির বাসন তৈরি করতে দেওয়া হয়– তিনি নিশ্চয়ই কিছুই পারবেন না। মাটির বাসন তৈরি করতে অবশ্যই সেই বিষয়ে অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত লোক লাগবে। তাহলে মানুষ তৈরি করার মতো একটা কঠিন পেশা কীভাবে অ-পেশাদারের হাতে সঠিক হতে পারে! তাই যা হবার তাই হয়েছে।

‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ এর স্লোগানকে সামনে রেখে সরকার ‘রূপকল্প- ২০৪১’ ঘোষণা করেছে। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রথমেই অপরিহার্য স্মার্ট মানুষ। আর স্মার্ট মানুষ পেতে চাইলে প্রয়োজন স্মার্ট শিক্ষা ব্যবস্থা। যার মূল হচ্ছে স্মার্ট শিক্ষক।

অর্থাৎ স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে অবশ্যই স্মার্ট শিক্ষক প্রয়োজন। শিক্ষকের মর্যাদা না দিয়ে, বঞ্চিত করে তাঁর কাছ থেকে প্রত্যাশিত ফলাফল আশা করা যায় না।

জাতির উন্নয়নে শিক্ষকের ভূমিকা অপরিহার্য। আর সেটি পেতে হলে অবশ্যই যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে, তাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে হবে।

রাষ্ট্র তথা সমাজপতিরা এটা বুঝতে যত দেরি করবেন - দেশ তত পিছিয়ে থাকবে।

অতি দ্রুত সকল শিক্ষকের যথাযথ সম্মান, নিরাপত্তা, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হবে এবং শিক্ষকও তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন–  বিশ্ব শিক্ষক দিবসে সেটাই প্রত্যাশা।

লেখক: শিক্ষা বিষয়ক গবেষক