দেশে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অংশগ্রহণ না করায় নির্বাচন নিয়ে অনেকেই বিভিন্ন ধরনের আলোচনা করছেন। বর্তমান সরকারের পদত্যাগ এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনরত বিএনপির নির্বাচন থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত প্রত্যাশিত ছিল। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিএনপির দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়েছে যে সাংবিধানিক বিধান মেনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্তমান সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে।
একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য বর্তমান সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির বিএনপির প্রচেষ্টা ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। কারণ, সরকার কোনও চাপের কাছে মাথা নত করেনি। ফলে, তারা যেকোনও মূল্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান বাধাগ্রস্ত করবে মর্মে ঘোষণা দিয়ে গত ২৯ অক্টোবর থেকে হরতাল-অবরোধের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করেছে। তবে, নির্বাচন কমিশন (ইসি) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করায় দলটি এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পতিত হয়েছে। হরতাল এবং অবরোধের মতো কর্মসূচি পালনের জন্য দলের কর্মীরা যানবাহনে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে একটা ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করেছে। তবে, দলের যথেষ্ট সাংগঠনিক শক্তির অভাবে তারা সরকারের ওপর কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি। ফলে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি এক ধরনের রাজনৈতিক অচলাবস্থার মুখোমুখি হয়েছে। তবে, তাদের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া যথারীতি এগোবে বলে নাগরিকদের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে, ইসি কি কার্যকরভাবে দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারবে? নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে নির্বাচনি যাত্রা শুরুর পর থেকে ইসির কর্মকাণ্ড বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন পরিচালনায় দৃঢ় অঙ্গীকারের পরিচয় দিয়েছে। প্রশাসনিক বিষয়ে নেওয়া বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত দেশের সাধারণ জনগণ ব্যাপকভাবে সমর্থন করেছে, যার মাধ্যমে যে বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে তা হলো ইসি একটি ভালো নির্বাচনের ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে বেশিরভাগ উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের এবং বেশিরভাগ থানায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বদলি করার ইসির সিদ্ধান্ত দেশের সর্বস্তরের মানুষের ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে, যার মাধ্যমে প্রতিফলিত হয় যে তারা নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রভাব মুক্ত করার ব্যাপারে প্রত্যয়ী।
এছাড়াও নির্বাচনি বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে বর্তমান মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ সব প্রার্থীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইসি। এই উদ্যোগগুলো দৃঢ়ভাবে ইঙ্গিত করে যে ইসি দেশে একটি সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে চায়।
যেহেতু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের নির্বাচনকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া ইসির কাছে কোনও বিকল্প নেই। ফলে, ইসি সব বিতর্ক এড়িয়ে একটি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন পরিচালনার মাধ্যমে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের আস্থা অর্জন করতে চাইবে এটিই স্বাভাবিক।
এখানে বলে রাখা ভালো যে নির্বাচনকে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অংশগ্রহণমূলক করার জন্য ইসি বিভিন্ন সময় বিএনপির সঙ্গে সংলাপের জন্য দলটিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এমনকি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরেও বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায় নির্বাচনের তফসিল পরিবর্তন করার ব্যাপারেও তারা প্রস্তুত ছিল। তবে, পরিতাপের বিষয় হলো বিএনপি বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠনের পর থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের বিরোধিতা করে আসছে এবং তাদের আমন্ত্রণে কোনও ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। ফলে, বিএনপির তরফ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া না দেখানোর কারণে তাদের নির্বাচনে আনা সম্ভব হয়নি। এর দায় ইসির ওপর পড়ে না।
ইসির সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন সংক্রান্ত অন্য একটি বিষয়ও বিভিন্ন স্থানে আলোচিত হচ্ছে। এই বিষয়টি হলো এই নির্বাচনে সরকারের অবস্থান কেমন হবে? তারা কি নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে, নাকি তারা সত্যিকার অর্থে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের প্রত্যাশা করছে?
আমি বিশ্বাস করি যে বিএনপির অনুপস্থিতিতেও সরকার একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবে। একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলকে শক্ত বৈধতা দেবে। কারণ, তারা নির্বাচনে জিতে একটি নতুন সরকার গঠন করতে চায়। গত ১৫ বছরে ক্ষমতাসীন দল দেশে পরিবর্তনমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তাদের অর্জন সত্ত্বেও, ২০১৮ সালের নির্বাচন কেন্দ্রিক এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী অসন্তোষ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে তাদের অস্বস্তিতে ফেলেছে। ফলে, সরকার এমন পদক্ষেপ নেবে না যা জনসাধারণ এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে তাদের দুর্বল করে দিতে পারে।
দেশে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে উৎসাহিত করার জন্য ক্ষমতাসীন দল একটি রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছে, যাতে বিদ্রোহী প্রার্থীরা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। এই কৌশল স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বিভেদ বাড়াতে পারে। তবে, ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনে ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এই ঝুঁকি গ্রহণ করেছে। এই সিদ্ধান্ত ক্ষমতাসীন দলকে তাদের নির্বাচনি জোটের দলগুলো থেকেও যথেষ্ট চাপের মুখে ফেলেছে, যার মধ্যে ১৪টি দল এবং জাতীয় পার্টি রয়েছে। জোটের শরিকরা নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রতিকূল ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রত্যাহারের পক্ষে কথা বলেছে। তবে ক্ষমতাসীন দল তাদের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে। সুতরাং, এটা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায় যে ক্ষমতাসীন দলও দেশে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে বদ্ধপরিকর।
পরিশেষে, এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে বাংলাদেশের নাগরিকরা তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের জন্য ৭ জানুয়ারি, ২০২৪ ব্যাপক পারে ভোট কেন্দ্রে যাবে এবং তাদর ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে এমন একটি সরকার বেছে নেবে, যারা আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশকে শাসন করবে। বিভিন্ন মহল থেকে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে আগামী নির্বাচন হবে বিশ্বাসযোগ্য এবং অংশগ্রহণমূলক। বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে ইসি ইতোমধ্যে প্রশংসনীয় অগ্রগতি দেখিয়েছে। সরকারকে ইসিকে সমর্থন অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ, উভয় সংস্থাই বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন পরিচালনার অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
লেখক: অধ্যাপক, লোক-প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।