হরমুজ প্রণালি: যে জলে পুড়ছে পৃথিবী!

ড. প্রণব কুমার পাণ্ডে
২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০

পৃথিবীর মানচিত্রে এমন কিছু জায়গা আছে—যেগুলো তাদের ভৌগোলিক আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও কৌশলগত গুরুত্বে বিশালতম। হরমুজ প্রণালি তার মধ্যে সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত মাত্র ৩৩ কিলোমিটার প্রশস্ত এই জলপথটি যুদ্ধের আগ পর্যন্ত বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের ২৫ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশ বহন করতো। কিন্তু ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে হত্যা করার পর সেই জলপথ আজ কার্যত অবরুদ্ধ। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে এই একটি সরু জলরেখা।

এই যুদ্ধ হঠাৎ ঘটেনি। বছরের পর বছর ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা চলছিল। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি জেসিপিওএ থেকে ২০১৮ সালে আমেরিকার একতরফাভাবে সরে যাওয়া, এরপর ইসরায়েলের সঙ্গে ২০২৫ সালে ১২ দিনের বিমান সংঘাত এবং জেনেভায় পারমাণবিক আলোচনার বারবার ব্যর্থতা—সব কিছু মিলিয়ে ২০২৬ সালের শুরু থেকেই বারুদের গন্ধ ছিল বাতাসে। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির আওতায় ইরানের তেল রফতানি প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছিল। অবশেষে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার পর পরিস্থিতি পুরোপুরি বিস্ফোরণের দিকে মোড় নেয়।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করে এবং সেখান দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর হামলা শুরু করে। নিশ্চিতভাবে ২১টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার তথ্য পাওয়া গেছে। সমুদ্রপথে বিমা প্রিমিয়াম ৬ বছরের সর্বোচ্চে পৌঁছায় এবং বড় বড় শিপিং কোম্পানি প্রণালিতে কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। মার্চের শুরুতেই ট্যাংকার চলাচল ৭০ শতাংশ কমে যায় এবং পরে কার্যত শূন্যে নেমে আসে।

হরমুজ প্রণালি শুধু একটি জলপথ নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির শ্বাসনালি। পারস্য উপসাগরের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো—ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার—এই একটি পথ দিয়ে তাদের তেল ও গ্যাস রফতানি করে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সীমিত বিকল্প পথ থাকলেও কাতারের কোনও বিকল্প নেই। তাই যখন ইরান এই প্রণালি অবরুদ্ধ করে দিলো, ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেলো—চার বছরে প্রথমবারের মতো। বাস্তব বাজারে তেলের দাম উঠেছে ব্যারেলপ্রতি ১৩২ ডলারে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরোল এটিকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্ন’ বলে বর্ণনা করেছেন এবং মন্তব্য করেছেন, ‘‘এটি এখন সত্যিকারের ভয়াবহ এক পরিস্থিতি।’’ কাতারের কোম্পানি কাতার এনার্জি ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা করায় বিশ্বের এলএনজি সরবরাহের ২০ শতাংশ একলাফে বাজার থেকে সরে গেছে। প্রণালিটি শুধু তেলের জন্য নয়, বৈশ্বিক সারের বাজারেও ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলছে—বিশ্বের ৩০ শতাংশেরও বেশি ইউরিয়া এই পথ দিয়ে রফতানি হয়, যা বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও সংকট তৈরি করছে।

ইরান এই সংকটকে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। দেশটি চীন, রাশিয়া, ভারত, ইরাক ও পাকিস্তানের জাহাজকে আলাদাভাবে প্রণালি পার হওয়ার সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু মার্কিন ও ইসরায়েলি মিত্র দেশগুলোর জাহাজের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এই বিভাজন কৌশল বিশ্বকে মেরুকরণের দিকে ঠেলছে। চীন এই পরিস্থিতিকে নিজের কৌশলগত সুবিধায় ব্যবহার করছে—চীনা পতাকাবাহী জাহাজ অবাধে প্রণালি পার হচ্ছে, আর চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নেতৃত্বের অবস্থান পাকা করছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলো অবরোধ করে পাল্টা চাপ দিচ্ছে। ৮ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলেও হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনও যুদ্ধপূর্ব মাত্রার ধারেকাছেও ফেরেনি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩.১ শতাংশে নামিয়েছে এবং তেলের দাম প্রায় ১০০ ডলারে থাকার আশঙ্কা করছে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আমদানি-নির্ভর জ্বালানি অর্থনীতিতে চলছে। অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এখনও অপ্রতুল, আর এলএনজি আমদানির কাঠামো দুর্বল। এই কাঠামোগত দুর্বলতাই হরমুজ সংকটে বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ফেলেছে। সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক ইউনিপেক এবং মালয়েশিয়ার পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহে ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা দিয়েছে। মার্চের শুরু থেকেই সারা দেশে ডিজেল সংকট দেখা দিতে শুরু করে এবং সিন্ডিকেটের মজুতদারি পরিস্থিতি আরও ঘোলা করে তোলে।

চট্টগ্রাম বন্দরের চিত্র ভয়াবহ। হালকা পণ্য পরিবহনকারী জাহাজের দৈনিক জ্বালানির চাহিদা ছিল আড়াই লাখ লিটার, কিন্তু সরবরাহ নেমে আসে মাত্র ৬০-৭০ হাজার লিটারে—প্রয়োজনের মাত্র পঁচিশ শতাংশ। ৩০ মার্চ বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করে দেয় যে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য হ্যান্ডলিং পুরোপুরি থেমে যেতে পারে—যা হলে বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য এক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

বৈশ্বিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণে ক্ষতির মাত্রার বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের পঞ্চম সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আইইএ প্রধান ফাতিহ বিরোল সরাসরি বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করে বলেছেন যে দেশটি এই সংকটের সম্মুখভাগে রয়েছে। শুধু জ্বালানি নয়, বাংলাদেশের রেমিট্যান্সও হুমকিতে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত পঞ্চাশ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তায় পড়েছে, যাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের জিডিপির পাঁচ থেকে নয় শতাংশ। পোশাকশিল্পেও আঁচ পড়ছে—শিপিং বিলম্ব ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধিতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং রফতানি প্রতিযোগিতা কঠিন হচ্ছে। সার সংকটের কারণে কৃষি খাতও বিপাকে পড়তে পারে।

স্বল্পমেয়াদে সরকার ভারত থেকে পাইপলাইনে ডিজেল আমদানি এবং কাজাখস্তান থেকে এক লাখ টন ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। জ্বালানি রেশনিং ব্যবস্থাও চালু হয়েছে। কিন্তু এই পদক্ষেপগুলো সাময়িক প্রলেপ মাত্র। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর—নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগ, জ্বালানি মজুত ক্ষমতা বাড়ানো, আমদানি উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধানে সক্রিয় হওয়া। হরমুজ বন্ধ থাকুক বা খুলুক—এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদেরই দিতে হবে।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক-প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যায় ছাড় নয়, প্রয়োজনে লংমার্চ: আখতার হোসেন
পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যায় ছাড় নয়, প্রয়োজনে লংমার্চ: আখতার হোসেন
নিউ গিনি প্রোপার্টিজে ভাঙচুর-হামলা: গ্রেফতার ১৪
নিউ গিনি প্রোপার্টিজে ভাঙচুর-হামলা: গ্রেফতার ১৪
সেতু ভব‌নে কক‌টেল বি‌স্ফোরণ
সেতু ভব‌নে কক‌টেল বি‌স্ফোরণ
মূল্যস্ফীতির চাপে কেনাকাটায় কাটছাঁট, চাপে খুচরা ব্যবসা
মূল্যস্ফীতির চাপে কেনাকাটায় কাটছাঁট, চাপে খুচরা ব্যবসা
সর্বশেষ সর্বাধিক