বাংলাদেশের সাবেক ১০ম সিইসি (২০০৭-২০১২) ড. এ টি এম শামসুল হুদা বিগত ৫ জুলাই ২০২৫ সালে ৮৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি আমেরিকার সিইরাকিউস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯০ সাল থেকে তাঁকে চিনি প্রথমে পানি উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে, তারপর পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে। অবসর নিয়ে তিনি পরামর্শক হিসেবে বিশ্ব ব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্টানে মাঝে মাঝে কাজ করতেন।
তাঁর অনেক একাডেমিক গুনাবলী ছিল, যেমন, তাঁর লেখা বইয়ের অধ্যায় হিসেবে লন্ডনের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। ওই বইতে যতগুলো প্রবন্ধ ছিল তন্মধ্যে তার প্রবন্ধটি ছিল সবচেয়ে সেরা মানের। একইভাবে অস্ট্রেলিয়ায় এক সম্মেলনে প্রায় ৩০০ গবেষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সেখান থেকে একটি নামকরা জার্নালের সম্পাদক মোট তিনটি প্রবন্ধ প্রকাশের জন্য চেয়ে নেন, তন্মধ্যে একটি ছিল তাঁর। তিনি খুব কমই লিখতেন কিন্তু তাঁর লেখার মান ছিল চমৎকার, ইংরেজির মান ছিল অত্যন্ত উঁচু।
অন্যের সাথে তার আচরণ ছিল অনুকরণীয়। তিনি আমার অনেক সিনিয়র ছিলেন, প্রায় ১২ বছর। তারপরও এই জাদরেল সিএসপি অফিসারকে আমি সব সময় ‘হুদা ভাই’ বলে ডাকতাম। আর তিনি আমাকে ‘খুরশিদ সাহেব’ বলতেন। একসাথে একই প্রকল্পে বেশ কিছু দিন কাজ করেছিলাম। কোনও সমস্যার জন্য আলোচনার দরকার হলে তিনি আমার রুমে নিজে চলে আসতেন। কোনও রিপোর্ট তৈরি করলে তিনি আমাকে মন্তব্যের জন্য দিতেন। আমিও অন্য কাজ বন্ধ রেখে লেখাটা আগে দেখে দিতাম। কিছু শব্দের পরিবর্তন বা দু’য়েকটা বাক্য পরিবর্তন করতে বললে বিনা তর্কে তিনি তা করতেন।
তিনি কোনও প্রশ্ন করলে তার উত্তর যাই হোক তা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। কথার মধ্যে কথা থামিয়ে দিয়ে কোনও কথা বলতেন না। আবার কোনও প্রশ্ন করলে অত্যন্ত গুছিয়ে সে প্রশ্নর উত্তর দিতেন। কখনও অন্যের সমালোচনা বা পরনিন্দা করতে তাকে আমি দেখিনি। সিইসি নিয়োজিত হওয়ার কথা যখন রাত দশটার খবরে দেখলাম তখন সাড়ে দশটায় আমি ওনাকে অভিনন্দন জানানোর জন্য ফোন দিলাম। তিনি ফোন ধরে বললেন, ‘দোয়া করবেন, যেন দায়িত্বটা ঠিক মতো পালন করতে পারি’। সফলভাবে প্রথম টার্ম শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয়বার থাকতে বললে তিনি আর কিছুতেই রাজি হননি কারণ তিনি জানতেন, কোথায় থামতে হয়।
তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো, দেশে এনআইডি চালু করা যা বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলফলক। বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকট থাকা সত্ত্বেও ২০০৮ সালে একটি স্বচ্ছ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল। বহু প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে একটি ডিপিপির মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে পেরেছিলেন। আগে একটি বিভাগের ডিপিপি হলে আরেকটি বিভাগের লোকেরা সেই প্রকল্পে কাজ করতে আগ্রহী হতো না। এখন প্রতি বছর এ ধরনের অনেক প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।
তাঁর জ্ঞান আহরণের প্রক্রিয়াটি ছিল সাধারণের চেয়ে একটু আলাদা। তিনি যে রিপোর্ট তৈরি করতেন তা ছিল অনেকটা ভিন্ন। আমরা ঐতিহাসিক ডাটা ব্যবহার করলে সাধারণত বিখ্যাত কোনও ইতিহাসবিদ-এর বই যেমন ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার, আর সি মজুমদার, ইরফান হাবিব প্রমূখ- এর বই থেকে কিছু তথ্য তুলে দিই। কিন্তু তিনি যখন লিখতেন তখন যেমন ১৮৩০ সালে ব্রিটিশের কোন রিপোর্টে ভারতের রেললাইন তৈরি সম্পর্কে কি তথ্য দিয়েছে, ১৮৭০ সালে কি, ১৯১০ সালে কি, ১৯৩০ সালে কি এভাবে দিতেন। এ তথ্য অন্য কোনও রিপোর্টে বা লেখায় পাওয়া যেত না। একদিন আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম আপনি এসব পান কোথায়? তিনি বললেন, ‘আমি সংগ্রহ করেছি’। ভারতের পানি, কৃষি ও ব্যাংক এ তিনটি বিষয়ে ব্রিটিশ আমল থেকে এ পর্যন্ত যত রিপোর্ট হয়েছে তার সব তিনি সংগ্রহ করেছেন এবং তা তার বাসায় আছে। জানতে চাইলাম, এগুলো কিভাবে সংগ্রহ করলেন? তিনি বললেন, কতগুলো আমি নিজে সংগ্রহ করেছি, আর কতগুলো যারা কোনও প্রজেক্টের তদবির করতে এসেছে তাদের বলেছি ‘আমার কোনো টাকা লাগবে না, কেবল আমাকে এ রিপোর্টটা সংগ্রহ করে দিতে পারেন কিনা দেখেন’। এভাবে তিনি অনেক পুরনো দিনের রিপোর্ট সংগ্রহ করেছেন।
একদিন জিজ্ঞেস করলাম, সারা জীবন আমলাগিরি করলেন, পড়ার সময় পান কখন? তিনি বললেন, ‘আমি অফিসে যেয়ে ঠিক সময় বসতাম, আর তিনটার মধ্যে সব কাজ শেষ করতাম। আমার টেবিলে কোনো ফাইল আর থাকতো না’। বাকি সময় তিনি কোনো রিপোর্ট পড়তেন বা বই পড়তেন। অন্যদিন তিনি বাসায় বসে বই পড়তেন।
একদিন তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, এনআইডি তৈরির আইডিয়া কিভাবে পেলেন? তিনি বললেল, আসলে এর কোনও আইডিয়া তাঁর ছিল না। একদিন ইউরোপীয় ইউনিয়নের লোকেরা আসে তার সাথে দেখা করতে। তারা বললো, নির্বাচনটা যেন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়। তখন তিনি বললেন, তা করতে গেলে এনআইডি লাগবে কারণ একজনের ভোট অন্যজন দিয়ে দিতে পারেন। তিনি তাঁদেরকে আরো বললেন, ‘আমাদের কোনো টাকা নেই তা বানানোর জন্য’। তখন তারা জানতে চাইল, কত টাকা দরকার? তিনি বললেল, অন্তত ৩৫০ কোটি টাকা দরকার। তারা সেটা অনুদান হিসেবে দিতে রাজি হলেন। এভাবে দাতা সংস্থার টাকা নিয়ে কম টাকায় সেনাবাহিনীকে দিয়ে এ কাজটি তিনি করলেন। এখন সারা জাতি এর সুফল ভোগ করছে। তিনি বিদেশিদের সম্মান করতেন। তাঁর লেখাপড়া এবং জ্ঞানের কারণে বিদেশিরা সব সময় তাকে বিশেষ সম্মানের চোখে দেখতেন।
ড. শামসুল হুদা সাধারণত স্টাম্পো বক্তৃতা দিতেন, খুব কমই লিখিত বক্তৃতা দিতেন। তিনি দৃঢ়পায়ে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় ইংরেজিতে বা বাংলায় বক্তৃতা দিতেন। কখনও শ্রোতাদের ইমপ্রেস করার জন্য তিনি বক্তৃতা দিতেন না। অপ্রাসঙ্গিক কোনও কথার অবতারণা করতেন না। উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের চটুল বা হাল্কা কথা বলে হাসানোর চেষ্টা করতেন না। সব সময় সিরিয়াস বিষয়ে সিরিয়াস আলোচনা করতেন। তাঁর কাছে যে তথ্য সংগ্রহে থাকতো তার ওপর ভর করে আলোচনা করতেন। তা সব সময় নির্ভুল হতো এমন নয়। কিন্তু এটির প্রতি তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করলে তিনি তা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং তার ধারণা পরিবর্তন করতে কোনও দ্বিধা করতেন না। দাতাদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকলে তিনি সাধারণত ইংরেজিতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করতেন।
তাঁর সাথে আমার কেবল সিরিয়াস বিষয়ে আলোচনা হতো। তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়গুলো ছিল - অন্য অনেক দেশে বোর্ড কাজ করলেও বাংলাদেশে তেমন কাজ করে না কেন? প্রশ্নটি শুনার আগে এটি নিয়ে আগে আমি ভাবিনি। তারপর দু’জন মিলে কিছু সম্ভাব্য উত্তর চিন্তা করলাম। তবে এ বিষয়ে আমরা কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি। অথিউরিটি তৈরি করলে তা কতটা কাজ করবে? কাদের সদস্য করলে তা বেশি কাজ করবে? কি কি বিষয়ে এতে বাধা হয়ে দেখা দিতে পারে? এটি কি আরো বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে কি-না? জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে সমন্বয় সভা কেন কাজ করে না? অন্য বিভাগগুলো জেলা প্রশাসকের সাথে সমন্বয় করতে আগ্রহী হয় না কেন? এর কি কোনও বিকল্প আছে? জেলা প্রশাসক ছাড়া রোটেশন করে অন্যদেরকে দিয়ে সমন্বয় করা সম্ভব কিনা? বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা কীভাবে বৃদ্ধি করা যায়?
কয়েকটি দপ্তরে কাজ নিয়ে একটি ডিপিপি তৈরি করা হলে সে প্রকল্প কাজ করে না কেন? কোন দপ্তরের অধীনে প্রকল্প তৈরি করলে তা বেশি কাজ করবে? প্রকল্পের ব্যয়ের ব্যাপারে কে গ্যারেন্টি দিবে? কে এর দায়-দায়িত্ব নিবে? সমাধান কি হতে পারে?
তিনি প্রশাসন ক্যাডারের লোক হলেও কখনও তাদের প্রতি পক্ষপাত মূলক কথা বলতেন না। জেলা সমন্বয় সভা কিভাবে কার্যকর করা যায় সে আলোচনায় তিনি অন্য কাউকে দিয়ে করা যায় কিনা তা-ও আমার সাথে আলোচনা করেন। আমরা দু’জন পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা করতাম। আমি যেমন শতভাগ নিরপেক্ষতা নিয়ে আলোচনা করতাম, তেমনি তিনিও শতভাগ নিরপেক্ষতা নিয়ে আলোচনা করতেন। আলোচনা করার জন্য এ ধরনের লোক পাওয়া বাংলাদেশে খুবই কঠিন। তিনি কখনও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আমার সাথে আলোচনা করতেন না, আমিও তার সাথে এ নিয়ে আলোচনা করিনি।
লেখক: সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষক। চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউিট অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট।