বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে চলতি বছরের জানুয়ারির ১ তারিখ এক অনন্য দিন হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ‘সুয়োমোটো রুল নং ০৯/২০২০’-এর রায়ে, ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, এক যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই রায় প্রকাশিত হয়েছে ১ জানুয়ারি।
বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল এবং বিচারপতি কাজী ওয়ালিউল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ স্পষ্ট করে বলেছেন—নিরাপদ পানি পাওয়া কোনও করুণা বা দয়া নয়, এটি সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মানুষের ‘বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার’। এই রায় কেবল একটি আইনি দলিল নয়, এটি বাংলাদেশের প্রতিটি তৃষ্ণার্ত নাগরিকের জন্য একটি মুক্তির সনদ।
একজন সরকারি কর্মকর্তা বা নীতিনির্ধারকের কাছে ‘মৌলিক অধিকার’ শব্দটির গুরুত্ব অপরিসীম। সাধারণ আইন এবং মৌলিক অধিকারের মধ্যে পার্থক্য হলো—মৌলিক অধিকার রাষ্ট্র পরিবর্তন বা কেড়ে নিতে পারে না। এটি সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত। যখন আদালত পানিকে মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করেন, তখন রাষ্ট্র আর বলতে পারে না যে ‘বাজেট নেই’ বা ‘প্রযুক্তি নেই’ বলে পানি দেওয়া সম্ভব নয়। বরং রাষ্ট্রকে তার সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে এই অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
মৌলিক অধিকারের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গ্রিক দার্শনিক থেলিসের সূত্র ধরে আদালত বলেছেন, পানি থেকেই সবকিছুর উৎপত্তি। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে, মানুষ খাবার ছাড়া কয়েক সপ্তাহ বাঁচতে পারলেও পানি ছাড়া কয়েক দিনের বেশি বাঁচতে পারে না। সুতরাং নিরাপদ পানি নিশ্চিত না করা মানে হলো নাগরিকের বেঁচে থাকার পথ রুদ্ধ করে দেওয়া। এটি সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন। সরকারি কর্মকর্তাদের বুঝতে হবে, পানি সরবরাহ এখন আর কেবল একটি ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ নয়, এটি একটি ‘সাংবিধানিক আদেশ’। এই আদেশ অমান্য করা মানে সংবিধানকে অবজ্ঞা করা।
বাংলাদেশ এই রায়ের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। ২০১০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ৬৪/২৯২ প্রস্তাবের মাধ্যমে পানি ও স্যানিটেশনকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। দক্ষিণ আফ্রিকার ১৯৯৬ সালের সংবিধানে পানিকে মৌলিক অধিকার করা হয়েছে। স্লোভানিয়া ২০১৬ সালে তাদের সংবিধান সংশোধন করে পানিকে একটি ‘পাবলিক গুড’ বা জনগণের সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করেছে, যা কোনও বাণিজ্যিক পণ্য নয়। বলিভিয়া ও কোস্টারিকাও তাদের সংবিধানে পানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে।
আমাদের পাশের দেশ ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ‘নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন’ মামলায় রায় দিয়েছিলেন যে পানি জীবনের অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের হাইকোর্ট এই বৈশ্বিক আইনি প্রেক্ষাপটকে আমাদের দেশীয় বাস্তবতায় অত্যন্ত নিপুণভাবে প্রয়োগ করেছেন। এটি আমাদের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বার্তা যে বিশ্ব যখন পানিকে মানবাধিকার হিসেবে দেখছে, তখন আমাদের আমলাতন্ত্রকে আরও বেশি সংবেদনশীল ও দ্রুতগতিতে কাজ করতে হবে।
নীতিনির্ধারকদের এখনই নজর দেওয়া উচিত উপকূলীয় এলাকার দিকে। সাতক্ষীরা, খুলনা বা বাগেরহাটের লবণাক্ততা কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি মানবিক বিপর্যয়। অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পানের ফলে নারীদের জরায়ু সংক্রান্ত রোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং গর্ভপাত হওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। যখন একজন মা তার সন্তানের জন্য নিরাপদ পানি জোগাড় করতে দিনে ৫-৬ ঘণ্টা ব্যয় করেন, তখন রাষ্ট্র তার উৎপাদনশীলতা হারিয়ে ফেলে। একই ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে বাংলাদেশের সকল দুর্গম অঞ্চলগুলোয়।
আদালতের এই রায় অনুসারে, নিরাপদ পানি সরবরাহ না করতে পারা মানে হলো নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিকে অবজ্ঞা করা। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে, তখন রাষ্ট্রকে আরও উদ্ভাবনী হতে হবে। কেবল নলকূপ বসানোই সমাধান নয়; রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং, বড় আকারের ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট এবং জলাধার সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
হাইকোর্ট এই রায়ে সরকারকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক প্লেস—যেমন রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, সরকারি হাসপাতাল এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ে সবার জন্য বিনামূল্যে বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করতে হবে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং ওয়াসাকে যথাশিগগিরই এই কাজ শেষ করতে হবে।
আগামী ১০ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি নাগরিকের ঘরে নিরাপদ পানি পৌঁছে দিতে হবে। সরকারি স্থানে এই পানি হবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং আবাসিক ক্ষেত্রে এটি হবে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে অর্থের অভাবে যেন কেউ তৃষ্ণার্ত না থাকে।
আদালত স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন যে পানি যেন কোনও বাণিজ্যিক কোম্পানির মুনাফা অর্জনের মাধ্যম না হয়। পানির ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো অবশ্যই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। যুক্তরাজ্যের মতো দেশে পানি বেসরকারীকরণ করার ফলে সেবার মান কমেছে এবং খরচ বেড়েছে। বাংলাদেশ সেই পথে হাঁটতে পারে না।
নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে হলে আগে পানির উৎস রক্ষা করতে হবে। তুরাগ নদীর মামলায় আদালত নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করেছিলেন। এবারের রায়েও জলাভূমি রক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে নিশ্চিত করতে হবে যে কোনও প্রভাবশালী যেন নদী বা খাল দখল করতে না পারে। শিল্পবর্জ্য দিয়ে নদী দূষণ করা মানে হলো কোটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেওয়া।
সরকারকে ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি আদালতে অগ্রগতির প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। নিশ্চয়ই সেই প্রতিবেদনে কেবল ‘প্রক্রিয়াধীন আছে’ বা ‘বাজেট চেয়ে পাঠানো হয়েছে’ এমন আমলাতান্ত্রিক ভাষা থাকুক। আমরা চাই বাস্তব কাজের প্রমাণ। আমরা চাই দেশের প্রতিটি পর্যায়ে, এবং স্থানে মানুষের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা।
একটি দেশের উন্নয়ন কেবল জিডিপি দিয়ে মাপা যায় না। উন্নয়ন মাপা হয় সেই দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদা কতটুকু পূরণ হচ্ছে তা দিয়ে। হাইকোর্টের এই রায় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে পানির অভাব মানে কেবল পিপাসা নয়, পানির অভাব মানে জীবনের অপমান।
এই দেশের যেকোনও নাগরিক যেদিন যেকোনও পাবলিক পয়েন্ট থেকে এক গ্লাস নিরাপদ পানি পান করবেন এবং তাঁর দীর্ঘ তৃষ্ণা মিটবে, সেদিনই কেবল এই ঐতিহাসিক রায় সার্থকতা পাবে। আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে পানি নিয়ে কোনও হাহাকার থাকবে না, যেখানে তৃষ্ণার্তের মুখে এক গ্লাস নিরাপদ পানি তুলে দেওয়া হবে রাষ্ট্রের পবিত্রতম কাজ।
লেখক: আইন গবেষক এবং উন্নয়নকর্মী