গণতান্ত্রিক যাত্রায় বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দেশ যখন নানামুখী সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কার কতটুকু অংশীদারত্ব থাকবে—সেই প্রশ্নটি আর কেবল রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি এখন টেকসই উন্নয়ন, শান্তি ও জাতীয় অগ্রযাত্রার এক অপরিহার্য শর্ত হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি জাতিসংঘের সিডও কমিটি তাদের ‘সাধারণ সুপারিশ নম্বর ৪০’ (জিআর৪০)-এর মাধ্যমে এই বৈশ্বিক তাগিদকে আরও জোরালো করেছে। এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে—জনজীবন, রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রযুক্তিজগৎসহ সব ক্ষেত্রে এতদিনের চেনা ও লোকদেখানো ‘৩০ শতাংশের কোটা’ ভেঙে এবার নারী-পুরুষের সমান অর্থাৎ ‘৫০-৫০’ অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
এই সুপারিশে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে সমান সর্বজনীন-সর্বজনীন প্রতিনিধিত্ব কোনও দয়া বা অনুকম্পা নয়, বরং এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। একইসঙ্গে এটি অর্থনৈতিক বর্জন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং প্রযুক্তির সুশাসনের মতো অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সংকট সমাধানের এক মোক্ষম হাতিয়ার। বাংলাদেশের জন্য এই বৈশ্বিক মানদণ্ডকে নিজস্ব জাতীয় কৌশলের অংশ করে নেওয়া কেবল নৈতিক দায়িত্বই নয়, বরং একটি দূরদর্শী অর্থনৈতিক পদক্ষেপও বটে।
সমাজে সমান অংশীদারত্বের এই দাবিকে অনেকেই ‘বিদেশি বা ধার করা সংস্কৃতি’ বলে ভুল ব্যাখ্যা দিতে চান। কিন্তু সত্য হলো, আমাদের বহুত্ববাদী সমাজের মজ্জায় এবং আধ্যাত্মিক চেতনায় এই সমতার দর্শন গভীরভাবে প্রোথিত। পবিত্র কোরআনে যেমন বলা হয়েছে, ‘মোমিন পুরুষ ও মোমিন নারী একে অপরের বন্ধু, তারা সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজে নিষেধ করে’ (৯:৭১)। অর্থাৎ, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ নিশ্চিত করা নারী-পুরুষ উভয়েরই যৌথ নৈতিক কর্তব্য।
একইভাবে, ঋগ্বেদে ‘প্রকৃতি’ ও ‘পুরুষ’-এর এক অপূর্ব মেলবন্ধনের বন্দনা করা হয়েছে, যেখানে নারীকে বলা হয়েছে ‘সম্রাজ্ঞী’—যিনি পূর্ণ মর্যাদা, প্রজ্ঞা ও সাহসের সঙ্গে সমাজ পরিচালনা করবেন। আবার খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যে সেন্ট পলের পত্রে (গালাতীয় ৩:২৮) পরম সাম্যের বাণী ঘোষণা করে বলা হয়েছে, ‘সেখানে কোনও পুরুষ বা নারী ভেদাভেদ নেই, কারণ খ্রিষ্ট যিশুতে তোমরা সবাই এক’।
আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আইন বা সংবিধানেও এই চেতনারই প্রতিফলন ঘটেছে। সংবিধানের ২৭ ও ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে এবং নারীদের অনগ্রসরতা দূর করতে রাষ্ট্রের বিশেষ বিধান প্রণয়নের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাই জেন্ডার সমতার আন্তর্জাতিক এই নির্দেশনাবলি মেনে চলার অর্থ হলো—আমাদের নিজস্ব সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির প্রতি অনুগত থাকা, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক সনদের মতো বৈশ্বিক অঙ্গীকারগুলো।
আশার কথা হলো, এই রূপান্তর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও নীতিগত কাঠামো আমাদের দেশেই বিদ্যমান। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারেও নারীর ক্ষমতায়নকে ‘জাতীয় উন্নয়নের মূল ভিত্তি’ হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে। এই রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন দেখা যায় রাষ্ট্রের আর্থিক বরাদ্দেও। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য ৫১৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, মোট জাতীয় বাজেটের প্রায় ৩৪.৮ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা হবে নারী-উন্নয়নমূলক খাতে।
নারীপ্রধান পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর পাশাপাশি স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষার মতো বাস্তবমুখী উদ্যোগগুলো মাঠপর্যায়ে চলমান রয়েছে। তবে দেশের অগ্রগণ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যবেক্ষণ বলছে, বড় বড় বাজেট বরাদ্দ এবং মাঠপর্যায়ে প্রকৃত বাস্তবায়নের মধ্যে এখনও একটি বড় ফাঁক রয়ে গেছে। এই ঘাটতি দূর করতে বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা—যা এই আর্থিক বিনিয়োগকে সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক সমতায় রূপান্তর করতে পারবে।
সমতার বিরোধিতাকারীরা প্রায়ই যুক্তি দেখান যে, সংসদে বা প্রশাসনে ৫০-৫০ প্রতিনিধিত্ব কেবল ধনী ও উন্নত দেশগুলোর এক আকাশকুসুম বিলাসিতা। কিন্তু বৈশ্বিক বাস্তবতার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাদের মতোই আর্থসামাজিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাওয়া বেশ কিছু দেশ স্রেফ কথার কথা হিসেবে না রেখে, কড়া আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করে এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে।
যেমন- সেনেগালের কথা বলা যায়। সে দেশের শক্তিশালী নারী আন্দোলনের মুখে সরকার বিশ্বের অন্যতম প্রগতিশীল জেন্ডার সমতা আইন পাস করে। সেখানে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্য নির্বাচনি প্রার্থী তালিকায় পর্যায়ক্রমিকভাবে নারী ও পুরুষের নাম রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়। কোনও দল এই নিয়ম না মানলে তাদের পুরো তালিকা বাতিল করার ক্ষমতা দেওয়া হয় নির্বাচন কমিশনকে। এর ফলে সেনেগালের জাতীয় সংসদে নারীর অংশগ্রহণ রাতারাতি ২২.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশের ওপরে চলে যায়।
আবার রুয়ান্ডার দিকে তাকালে দেখা যায়, এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে তারা তাদের পুরো শাসনব্যবস্থাকেই এমন এক সাংবিধানিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে, যেখানে নারীদের অংশগ্রহণ আজ নিশ্চিত। রুয়ান্ডা ৬০ শতাংশের বেশি নারী সংসদ সদস্য নিয়ে গোটা বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তারা এটি করতে পেরেছে একটি স্বাধীন ‘জেন্ডার মনিটরিং অফিস’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, যা রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে সমতার জবাবদিহি তদারকি করে। এই দেশগুলো সফল হয়েছে, কারণ তারা কেবল শুভেচ্ছার বাণী শুনিয়ে বসে থাকেনি, বর্জনের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে।
গবেষক বার্ট্রান্ড এবং তাঁর সহযোগীদের (২০১৯) এক যুগান্তকারী গবেষণায় দেখা গেছে, নেতৃত্বে নারীর আগমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরনকে আমূল বদলে দেয় এবং অবহেলিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের গবেষকদের মতে, রাজনীতিতে সমান প্রতিনিধিত্ব গণতন্ত্রের কোনও শেষ ফল বা উপজাত নয়, বরং এটিই হলো রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি এবং জনগণের আস্থা অর্জনের মূল চালিকাশক্তি।
জাতিসংঘের এই নির্দেশনাবলিকে দেশের মাটিতে কার্যকর করতে হলে বাংলাদেশকে তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে একটি সুনির্দিষ্ট ও সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে— প্রথম স্তম্ভ (আইনি সংস্কার): আমাদের নীতিপ্রণেতাদের এখন সাময়িক বা দয়া-দাক্ষিণ্যের কোটা ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে স্থায়ী সমতার আইন করতে হবে। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের বর্তমান ব্যবস্থাকে বদলে সেনেগালের মতো সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমিক প্রার্থী তালিকা (অল্টারনেটিং লিস্ট সিস্টেম) চালু করা দরকার। এর ফলে নারীরা কেবল আলংকারিক উপস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, সমান নির্বাহী ক্ষমতা নিয়ে দেশ পরিচালনার সুযোগ পাবেন। একইসঙ্গে স্থানীয় সরকারগুলোতে অর্থায়নের শর্ত হিসেবে জেন্ডার অডিট ও সুনির্দিষ্ট সমতার লক্ষ্যমাত্রা জুড়ে দিতে হবে।
দ্বিতীয় স্তম্ভ (সুরক্ষামূলক জবাবদিহি): রাজনীতিতে নারীর প্রতি সহিংসতা এবং সাইবার জগতের ক্রমবর্ধমান হেনস্তাকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে, যা নারীদের সামনে এগিয়ে আসার পথকে রুদ্ধ করে। বাজেট বক্তৃতায় যে ‘কুইক রেসপন্স টিম’-এর কথা বলা হয়েছে, সেগুলোকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন সংস্থায় রূপ দেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের দলীয় অভ্যন্তরে সব ধরনের হয়রানি বন্ধে স্বাধীন অভিযোগ কেন্দ্র এবং আইনিভাবে বাধ্যতামূলক আচরণবিধি কার্যকর করতে হবে।
তৃতীয় স্তম্ভ (যৌথ বাস্তবায়ন): নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে এখানে নতুনভাবে ভূমিকা রাখতে হবে। নাগরিক সমাজের কাজকে কেবল প্রথাগত ‘নারী অধিকার’-এর গণ্ডিতে না রেখে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, ডিজিটাল পলিসি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহারের মতো উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় সম্পৃক্ত করতে হবে। আর গণমাধ্যমকে পরিহার করতে হবে লিঙ্গবৈষম্যমূলক যেকোনও কন্টেন্ট, যাতে নারী নেতৃত্বের প্রতি সমাজে গভীর আস্থা তৈরি হয়।
পরিশেষে, এই পরিকল্পনায় জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদেরও সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। লোকদেখানো কিছু কর্মশালা আয়োজন করে অর্থ ব্যয় না করে, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের উচিত সরকারের ‘জাতীয় সমতা কর্মপরিকল্পনা’র সঙ্গে তাদের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার মেলবন্ধন ঘটানো। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের সঠিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের টেকসই পুনর্বাসন এবং নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরিতে তাদের কারিগরি দক্ষতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
সিডও কমিটির ‘সাধারণ সুপারিশ ৪০’ বাস্তবায়ন করা কোনও নিছক দাফতরিক বা আমলাতান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আসলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে বদলে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী বিনিয়োগ। এই সমতা নিশ্চিত করবে যে—আমাদের পাস হওয়া আইন, আমাদের বাজেট এবং আমাদের প্রযুক্তি যেন দেশের প্রতিটি মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। আসুন, আমরা অতীতের খণ্ডিত ও সংকীর্ণ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সাহস ও ঐক্যের সঙ্গে এক নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলি; যেখানে সমতা কোনও দূরের রঙিন স্বপ্ন হবে না, বরং হবে আমাদের প্রতিদিনের বাস্তব সত্য।
লেখক: সমাজ ও আইন বিষয়ক গবেষক এবং আইনজীবী



