স্ক্রলিং জেনারেশন: বাংলাদেশের তরুণদের মস্তিষ্কে কী ঘটছে?

দিন কয়েক আগে আমার কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে আড্ডা হচ্ছিল। বিভিন্ন সেমিস্টার ও বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল তারা। আড্ডার ফাঁকে খুবই সাধারণ একটি প্রশ্ন করেছিলাম আমি। শেষ কবে কোনও লেখা তারা পুরোটা পড়েছে? পরীক্ষার নোট নয়, কম্পিউটারে কিংবা মোবাইলে স্ক্রল করে দেখা পোস্ট নয়। একটানা মনোযোগ দিয়ে পড়া। আমার এই বোকা বোকা প্রশ্নে তাদের সবাইকে একটু অপ্রস্তুত মনে হলো।

তাদের মাঝে একজন একটু হেসে বলল, “স্যার, মনে হয় আমাদের ব্রেইনটা আর ওইভাবে কাজ করে না।” মানে বই পড়ার জন্য মনোযোগ ধরে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না তাদের পক্ষে। আমার শিক্ষার্থীদের কেউই জীবনে হতাশ ছিল না। অলসও নয়। তবে জীবনের ও দিনের বড় একটা সময় কাটায় অনলাইনে। কিংবা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে।

এই বাস্তবতাটি কেবল আমার শিক্ষার্থীদের নয়। ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুল পড়ুয়া। গাজীপুরের গার্মেন্টস কারখানা থেকে শুরু করে সিলেটের চা-দোকান পর্যন্ত, লাখ লাখ তরুণ-তরুণী একই সম্মোহনী চক্রে আটকা। ফলে দেশজুড়ে শ্রেণিকক্ষ থেকে সরকারি অফিস, চায়ের দোকান থেকে হাসপাতালের করিডোর সবখানেই নীরবে ভেঙে পড়ছে মনোযোগ।

দেশের তরুণ প্রজন্ম আজ জীবনের বড় একটা সময় ছোট ছোট ভিডিও স্ক্রল করছে। একটু গভীরভাবে খেয়াল করলে বোঝা যায়, টিকটক, ফেসবুক রিল, ইনস্টাগ্রাম রিল ও ইউটিউব শর্টস-এর মূল বিষয়বস্তুগুলো আবেগ, বিনোদন ও তাৎক্ষণিক আকর্ষণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে আছে হাস্যরস ও বিনোদনমূলক কনটেন্ট। যেমন- কমেডি স্কিট, অতিনাটকীয় অভিনয়, রিঅ্যাকশন ভিডিও, স্থানীয় মিম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নাচ, গান; বলিউড-ঢালিউড গানের নাচ, ভাইরাল অডিওতে ঠোঁট মেলানো, ফোক গান ও নাটকীয় সংলাপ এই প্ল্যাটফর্মগুলোর দৈনন্দিন দৃশ্য।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো প্রেম, সম্পর্ক ও আবেগকেন্দ্রিক কনটেন্ট। একতরফা প্রেম, ব্রেকআপ, দাম্পত্য কলহ, বিশ্বাসঘাতকতা, মন খারাপ ও আবেগপূর্ণ কবিতা-সংলাপ অত্যন্ত জনপ্রিয়। এর পাশাপাশি সামাজিক ও নৈতিক উপদেশমূলক ভিডিও ছড়ানো- মা-বাবার সম্মান, ভালো মানুষ হওয়া, দারিদ্র্য বনাম ধনী সমাজ, নারী চরিত্র ও নৈতিকতা নিয়ে বক্তব্য এসবের মূল বিষয়।

ধর্মীয় কনটেন্টও উল্লেখযোগ্য জায়গা দখল করে আছে। সংক্ষিপ্ত ওয়াজ, হাদিস বা দোয়ার ক্লিপ, ধর্মীয় মোটিভেশন, কিয়ামত ও আখিরাতকেন্দ্রিক ভয় বা আশার বার্তা নিয়মিত দেখা যায়। একই সঙ্গে রয়েছে লাইফ হ্যাকস ও টিপসধর্মী কনটেন্ট- পড়াশোনায় ভালো করার শর্ট ট্রিক, প্রেমে সফল হওয়ার উপায়, স্মার্টফোন ও ঘরোয়া কাজের সহজ কৌশল; যার বড় অংশই অতি সরলীকৃত বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন।

দৈনন্দিন জীবনভিত্তিক ব্লগও জনপ্রিয়: গ্রাম্যজীবন, কৃষিকাজ, স্ট্রিট ফুড, রিকশাচালক বা শ্রমজীবী মানুষের জীবনচিত্র, ট্রেন-লঞ্চ ভ্রমণের ক্ষণিক দৃশ্য। এর সঙ্গে আকাঙ্ক্ষাভিত্তিক কনটেন্ট যুক্ত হয়- বিদেশে প্রবাস জীবন, দামি গাড়ি-বাড়ি, লাইফস্টাইল ও কখনও কখনও কৃত্রিম বিলাসী জীবন প্রদর্শন।

এছাড়া রাজনৈতিক অসন্তোষ, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, চাকরি না পাওয়া, সরকারপক্ষ বা বিরোধিতামূলক বক্তব্য ও আন্দোলনের ক্ষুদ্র ক্লিপ দেখা যায়, যা অনেক সময় আবেগ উসকে দেয়। ভাইরাল ট্রেন্ড ও চ্যালেঞ্জ, ফিল্টার ও একই অডিও বারবার ব্যবহার করে ডুয়েট-স্টিচ ভিডিও এসব প্ল্যাটফর্মের ভাষা নির্ধারণ করে। পাশাপাশি বিভ্রান্তিকর ও ক্লিকবেইট কনটেন্টও বিস্তৃত-ভুয়া স্বাস্থ্য পরামর্শ, গুজব, অতিরঞ্জিত দাবি ও আউট-অব-কনটেক্সট ভিডিও।

তবে শিক্ষা ও ক্যারিয়ারভিত্তিক কনটেন্ট তুলনামূলকভাবে কম হলেও ধীরে ধীরে বাড়ছে। এসবের মধ্যে রয়েছে চাকরি বা বিসিএস প্রস্তুতি, ইংরেজি শেখা, ফ্রিল্যান্সিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত মোটিভেশনাল কথা। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের শর্ট-ফর্ম ভিডিও কনটেন্ট আবেগনির্ভর, দ্রুত ভোগ্য ও মনোযোগবিক্ষেপকেন্দ্রিক; গভীর বিশ্লেষণ, সমালোচনামূলক চিন্তা ও দীর্ঘ মনোযোগ দাবি করে এমন বিষয় এখনও প্রান্তিক অবস্থাতেই রয়েছে।

এভাবে স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকার পর একজন শিক্ষার্থী যখন পরীক্ষার জন্য একটি পাঠ্যবই খোলে,  দুই পৃষ্ঠা পড়ার পরই মন অন্যদিকে চলে যায়। প্রায় অজান্তেই সে আবার ফোনের দিকে হাত বাড়ায়।

যোগাযোগ, স্নায়ুবিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার সুবাদে আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করা হয়, ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার কি সত্যিই মস্তিষ্কের ক্ষতি করছে? সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো ‘হ্যাঁ’। কিন্তু মানুষ যেভাবে কল্পনা করে, ঠিক সেভাবে নয়। মস্তিষ্ক গলে যাচ্ছে না। বুদ্ধি হারিয়ে যাচ্ছে না। যা ঘটছে, তা আরও সূক্ষ্ম। আরও বিপজ্জনক। আমাদের চিন্তাপ্রক্রিয়া এমনভাবে রূপান্তরিত হচ্ছে, যেখানে গভীরতার চেয়ে গতি, ভাবনার চেয়ে প্রতিক্রিয়া, অর্থের চেয়ে উদ্দীপনাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য সংকটটি নীরবে ঘটছে। আর তা ঘটছে আমাদের তরুণদের মস্তিষ্কের ভেতর। তাদের মনোযোগের সময়সীমা ভেঙে পড়ছে। আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল হচ্ছে। সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি কমে যাচ্ছে। এটি কোনও আতঙ্ক ছড়ানো রূপক নয়।

এ ঘটনার একটা নাম আছে: ‘ব্রেইন রট’। ২০২৪ সালে অক্সফোর্ডের বছরের সেরা শব্দ। এটার মানে হলো নিম্নমানের ডিজিটাল কনটেন্টের অতিরিক্ত ব্যবহারে মস্তিষ্কের ক্ষয়। যদিও এটা ইন্টারনেট ভাষা থেকে এসেছে, স্নায়ুবিজ্ঞান  বলছে যে এটা আসলেই সত্যি। অ্যালগরিদম দিয়ে তৈরি ছোট ছোট ভিডিও প্যাসিভলি স্ক্রল করলে মনোযোগ ভেঙে যায়, স্মৃতিশক্তি কমে যায় এবং জটিল সমস্যা সমাধান, টেকসই মনোযোগ আর সৃজনশীল চিন্তার জন্য যে মানসিক শক্তি দরকার সেটা দুর্বল হয়ে যায়। কারণ অ্যালগরিদম-চালিত সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় ব্যয় করলে মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে কার্যকলাপ কমে যায়।

মস্তিষ্ক এই গতির জন্য তৈরি হয়নি
মানুষের মস্তিষ্ক নতুনত্ব খোঁজে। এটা আমাদের জৈবিক বৈশিষ্ট্য। একসময় তা আমাদের শেখাতে সাহায্য করেছে। এখন সেই দুর্বলতাকেই কাজে লাগানো হচ্ছে। ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব শর্টস সব প্ল্যাটফর্মই কাজ করে অল্প সময়ে অনিশ্চিত পুরস্কারের নীতিতে। একবার হাসি, একবার রাগ, একবার ভয় প্রতিটি স্ক্রলে মস্তিষ্কে ডোপামিনের ক্ষুদ্র ঢেউ ওঠে। মস্তিষ্ক শেখে আরও স্ক্রল করো।

ডোপামিন নামের এক নিউরোট্রান্সমিটার যাকে অনেক সময় ভুল করে কেবল “আনন্দের রাসায়নিক” বলা হয়। এটি আসলে শেখার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। কী আমাদের মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য, ডোপামিন সেই সংকেত দেয়। যখন পুরস্কার অনিশ্চিত হয় তখন ডোপামিনের প্রভাব আরও তীব্র হয়। ঠিক এই নীতিতেই কাজ করে জুয়ার মেশিন। আধুনিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই ব্যবস্থাকে নিখুঁতভাবে কাজে লাগিয়েছে। অন্তহীন স্ক্রলিং, স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও, অ্যালগরিদমিক ব্যক্তিকরণ সব মিলিয়ে মস্তিষ্ক শিখে যায়, প্রতিটি মুহূর্তেই নতুন কিছু আসবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক মানিয়ে নেয়।

ফলে কী হয়? সিদ্ধান্ত নেওয়া, মনোযোগ ধরে রাখা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা দায়িত্বে থাকা প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তখন ধীর চিন্তা বিরক্তিকর লাগে। বই পড়া কষ্টকর লাগে। নীরবতা সহ্য হয় না। এটা অলসতা নয়। এটা আত্মনিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা নয়। এটা নিউরোপ্লাস্টিসিটি। মানে পরিবেশ অনুযায়ী মস্তিষ্কের বদলে যাওয়া।

বাংলাদেশে ইন্টারনেট এসেছে প্রস্তুতি ছাড়াই

গত এক দশকে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারে বিস্ময়কর বিস্তার ঘটেছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১৩১.৪৯ মিলিয়ন (প্রায় ১৩ কোটি ১৪ লাখ ৯০ হাজার); মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী: ১১৬.৮৭ মিলিয়ন (প্রায় ১১ কোটি ৬৮ লাখ ৭০ হাজার) এবং ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারী: ১৪.৬২ মিলিয়ন (প্রায় ১ কোটি ৪৬ লাখ ২০ হাজার)।

বাংলাদেশের ডিজিটাল সাফল্য বাস্তব। সাশ্রয়ী স্মার্টফোন আর কম দামের ডেটা লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনলাইনে এনেছে। অনেকের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জীবনযাত্রার অংশ নয়, জীবনটাই সেখানে। খবর, বিনোদন, বন্ধুত্ব, রাজনীতি, এমনকি ব্যবসা সব কয়েকটি অ্যাপের ভেতর দিয়েই প্রবাহিত হয়।

কিন্তু এই প্রবেশের সঙ্গে প্রস্তুতি ছিল না। স্কুলে মিডিয়া সাক্ষরতা খুব কমই শেখানো হয়। বাবা-মা প্রায়ই বুঝতে পারেন না তাদের সন্তানরা কোন প্ল্যাটফর্মে কীভাবে সময় কাটাচ্ছে। সিলিকন ভ্যালিতে তৈরি অ্যালগরিদম গ্রাম ও মহানগর সব জায়গার মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করছে, স্থানীয় সংস্কৃতি বা মানসিক স্বাস্থ্যের তোয়াক্কা না করেই।

কিন্তু এই ডিজিটাল বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে আমরা কী দিয়েছি? স্কুলে ডিজিটাল বা মিডিয়া সাক্ষরতা নেই; অ্যালগরিদম কীভাবে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে তা শেখানো হয় না;  অভিভাবকেরা নিজেরাই পথ হারান এবং শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের কোনও জাতীয় গাইডলাইন নেই।

ফলে তৈরি হচ্ছে আবেগে ঠাসা কনটেন্টের এক অবিরাম স্রোত গুজব, ক্ষোভ, ভয়, রসিকতা। উদ্দেশ্য তথ্য দেওয়া নয়; ধরে রাখা। দীর্ঘ লেখা পড়তে ক্লান্তিকর মনে হয়। সূক্ষ্ম যুক্তি সন্দেহজনক ঠেকে। সব কিছুই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করে। অনেকেই এই অনুভূতি বোঝেন। কিন্তু প্রকাশের ভাষা খুঁজে পান না।

কেন এর প্রভাব এখানে আরও তীব্র

এই সমস্যা শুধু বাংলাদেশের নয়। কিন্তু এখানে এটি বেশি গভীর হয় কয়েকটি কারণে। ঢাকা বিশ্বের অন্যতম জনবহুল ও কোলাহলপূর্ণ শহর। দীর্ঘ যানজট, শব্দদূষণ, কম ঘুম এসব মনোযোগ এমনিতেই নষ্ট করে। এর সঙ্গে যোগ হয় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। ফোনে স্ক্রল করা তখন আর বিনোদন নয়। এটি বাঁচার উপায় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু স্ক্রল মানে বিশ্রাম নয়। বিশ্রাম না পেলে মস্তিষ্ক রিসেট হয় না। বাংলা কনটেন্টের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। সংক্ষিপ্ত, আবেগময়, উত্তেজনাপূর্ণ কনটেন্ট বেশি চলে। গভীর লেখা পড়ে কম মানুষ। ফলাফল হলো জটিল বিষয় সহ্য করার ক্ষমতা কমে যায়।

যে ক্ষতিগুলো আমরা হিসাবেই আনছি না

শ্রেণিকক্ষে ফোন না দেখে শিক্ষার্থীরা মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। অফিসে বৈঠক হয়, আলোচনার মাঝখানে স্ক্রিন জ্বলে ওঠে। কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। পরিবারে একসঙ্গে খাওয়া হয়। কিন্তু কথা হয় না, প্রত্যেকে নিজের ব্যক্তিগত ফিডে ডুবে।

এই দৃশ্যগুলো তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু এগুলো তুচ্ছ নয়। মনোযোগ হলো শেখা, সহমর্মিতা ও বিচারবোধের ভিত্তি। যখন এটি ভেঙে পড়ে, সবকিছু দুর্বল হয়ে পড়ে। একসময় যে গভীর পাঠ শিক্ষা ও জনজীবনের কেন্দ্র ছিল, তার জায়গা নেয় দ্রুত স্ক্যান করা। কথোপকথন ছোট হয়। মতভেদ কঠোর হয়। ভুল তথ্য ছড়ায় মানুষ বোকা বলেই নয়, বরং ক্লান্ত মস্তিষ্ক সহজ উত্তর খোঁজে বলে।

সবচেয়ে ভয়ংকর পরিবর্তন হচ্ছে জনপরিসরে। ভুল তথ্য দ্রুত ছড়ায়। রাগ দ্রুত জ্বলে ওঠে। জটিল সমস্যার জায়গায় আসে সহজ স্লোগান। সামাজিক স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে, মানুষ একা ভাবে না। মানুষ বরং একসঙ্গে ভাবে। একে বলে কালেক্টিভ কগনিশন। মনোযোগ ভেঙে গেলে, সেই সমষ্টিগত চিন্তাও ভেঙে যায়। তখন সমাজ প্রতিক্রিয়াশীল হয়, চিন্তাশীল নয়।

সামাজিক স্নায়ুবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ঝুঁকিটা বড়। মানুষের চিন্তা সামাজিকভাবে গড়ে ওঠে। গণতন্ত্র, আস্থা ও নৈতিক সিদ্ধান্ত নির্ভর করে আমাদের অন্যকে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা, অনিশ্চয়তা সহ্য করা, এবং তাৎক্ষণিক আবেগের ঊর্ধ্বে ওঠার ওপর। মনোযোগ ক্ষয় হলে জনজীবন চিন্তাশীল না হয়ে অভিনয়প্রবণ হয়ে ওঠে। এটা আমরা ইতিমধ্যে দেখছি। অনলাইনের ক্ষোভ বাস্তবে অবিশ্বাসে রূপ নিচ্ছে। জটিল বিষয় স্লোগানে নামিয়ে আনা হচ্ছে। ক্লান্তি দেখা দিচ্ছে উদাসীনতার ছদ্মবেশে।

এটা আত্মনিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা নয়

অনেকে বলেন “ফোন কম ব্যবহার করো।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন ডিজিটাল পরিবেশে আত্মনিয়ন্ত্রণ কজনের পক্ষে সম্ভব? মস্তিষ্ক পরিবেশ দ্বারা গঠিত হয়। যখন প্ল্যাটফর্মগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার জন্য ডিজাইন করা, তখন শুধু ব্যক্তিগত সদিচ্ছা দিয়ে লড়াই করা কঠিন। আমরা যেমন দূষিত পানি বা খাবারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে দোষ দিই না, তেমনই ডিজিটাল দূষণকেও শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাস বলে এড়িয়ে যাওয়া ভুল। মনোযোগ এখন সামাজিক সম্পদ। এটা শেষ হলে ক্ষতি সবার।

ভিন্ন এক ডিজিটাল ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে

এই লেখা প্রযুক্তির বিরুদ্ধে নয়। সংযোগ সুযোগ বাড়িয়েছে, কণ্ঠস্বর জোরালো করেছে, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পৌঁছে দিয়েছে। প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশ অনলাইনে থাকবে কিনা, তা নয়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অনলাইনে। প্রশ্ন হলো- কীভাবে থাকবে।

স্কুলে শিশুদের শেখানো যেতে পারে মনোযোগ কীভাবে কাজ করে, অ্যালগরিদম কীভাবে আবেগকে প্রভাবিত করে, কীভাবে অগভীর দুনিয়ায় গভীরভাবে পড়তে হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান ফোন-ফ্রি জায়গা তৈরি করতে পারে। শাস্তি হিসেবে নয়, সুরক্ষা হিসেবে। শিক্ষায় মিডিয়া ও মনোযোগ সাক্ষরতা যুক্ত করা জরুরি; স্কুল-হাসপাতাল-অফিসে ফোন-ফ্রি সময় ও জায়গা দরকার;  শিশু ও কিশোরদের জন্য স্ক্রিন ব্যবহারের জাতীয় নীতিমালা দরকার। মানসম্পন্ন, দীর্ঘ-ফর্ম বাংলা লেখা ও সাংবাদিকতায় বিনিয়োগ জরুরি এবং সমাজ যেভাবে যোগাযোগ করে, সমাজ সেভাবেই চিন্তা করে।

চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার মূল্য

‘ব্রেইন রট’ মূলত একটা অনুভূতির নাম। এর মানে হলো সব সময় ব্যস্ত, কিন্তু গভীর নয়। সব সময় সংযুক্ত, কিন্তু মনোযোগহীন। অনেকের কাছে ‘ব্রেইন রট’ কথাটা কৌতুক মনে হতে পারে। বাস্তবে কিন্তু তা নয়। এটি এক সতর্কবার্তা। মনে রাখতে হবে আমাদের মানসিক পরিবেশ আমাদের অভিযোজন ক্ষমতার চেয়েও দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তরুণ। তার ভবিষ্যৎ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না। বরং নির্ভর করে দেশের তরুণ প্রজন্মের মানসিক সহনশীলতার ওপর। মনোযোগ শেখা, নাগরিকত্ব ও কল্পনার কাঁচামাল। আর  বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ সমাজ। কিন্তু সেই শক্তি টিকে থাকবে তখনই, যখন তারা পড়তে পারবে, ভাবতে পারবে, অপেক্ষা করতে পারবে।

ডিজিটাল হওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়েছে। এখন তাকে একটু থামতে হবে, এতটুকু প্রশ্ন করার জন্য: আমরা কী ধরনের মন তৈরি করছি? কারণ শেষ পর্যন্ত, একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ডেটা বা ব্যান্ডউইথ নয়। সে দেশের মানুষের একসঙ্গে, ধীরে, গভীরভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা-ই তার আসল সম্পদ। একবার যদি আমরা একসঙ্গে মনোযোগ দিতে না পারি, তাহলে সেটি ফিরিয়ে আনা স্ক্রল বন্ধ করার চেয়ে অনেক কঠিন।

লেখক: জনস্বাস্থ্য ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, সিনিয়র লেকচারার, মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)।