ঢাকা শহরের গণপরিবহনের আধুনিকতা

বড় শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গণপরিবহন। দ্রুত নগরায়ণ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে তিলোত্তমা ঢাকার প্রধান সমস্যা যানজট নিরসনে গণপরিবহনই হতে পারে বাস্তবসম্মত সমাধান। বর্তমান সরকার তার নির্বাচনি ইশতেহারে নিরাপদ ও টেকসই ঢাকা বিনির্মাণের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।  সে বাস্তবতায় ইশতেহারে বলা হয়েছে, “মেট্রোরেলের পাশাপাশি মনোরেল ব্যবস্থা চালু করা হবে। এর ফলে, রাজধানী ও তার কাছাকাছি বিভিন্ন স্থানগুলোকে আরও সহজে ও নিরাপদে সংযুক্ত করা সম্ভব হবে।” গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ইতোমধ্যে মেট্রোরেল চালু হয়েছে। তবে অন্তত দুটি কারণে মনোরেল প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, খরচের হিসাবে মনোরেল সাশ্রয়ী। কিংবা বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল হয়ে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে বৈদেশিক ঋণের ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়, তা হ্রাস করবে। এছাড়া, মেট্রোরেলের রক্ষণাবেক্ষণ প্রযুক্তি তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল। দ্বিতীয়ত, মনোরেল স্থাপনা তৈরিতে সময় কম লাগবে বলে জনগণের ভোগান্তি কমানো সম্ভব হবে।

বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকেই এ লেখার প্রয়াস। বলেছিলাম, মেট্রোরেল নিয়ে লিখবো। তবে একটি ভিন্ন বিষয়ের অবতারণা করে শুরু করি। যুগে যুগে অর্থনীতিবিদরা (কিংবা নীতিনির্ধারক) অনেক মুন্সিয়ানার পরিচয় দিলেও কিছু কিছু বিষয়ের সমাধান করতে পারেননি। উদাহরণ দেই— একসময় ‘রফতানিমুখী’ নাকি ‘আমদানিনির্ভর’ বাণিজ্য পরিচালনা করা হবে, সেটি নিয়ে বিতর্ক ছিল। বিশেষ করে, আশির দশকের আগেও এটি প্রাসঙ্গিক ছিল। এখন রফতানিমুখী বাণিজ্য একটি ‘উইন-উইন’ ধারণা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করায়— প্রায় সব দেশ এর সম্প্রসারণ করছে। বাণিজ্য এখন আর ‘জিরো সাম গেম’ নয়, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক বিভিন্ন ধরনের বাঁধা থাকলেও এটি ‘পজিটিভ সাম হিসেবেই স্বীকৃত। এছাড়া, আলোচনার মধ্যে থাকা বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সফলতা হলো প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন বিতর্কের অবসান হওয়া, যা পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র— এ দুই দর্শনের অর্থনীতিবিদদেরন জন্য চমৎকার আলোচ্যসূচি হিসেবে চল্লিশের দশক থেকে মুখরোচক ছিল।

তবে যেসব ক্ষেত্রে বিতর্ক এখনও চলমান তার একটি হলো— একটি অর্থনীতিতে সরকারের কী ভূমিকা হবে। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলে দিলাম, আপনি যদি বিভিন্ন আয়ভিত্তিক অর্থনীতির জন্য সরকারের কাজের পরিধি ও গুরুত্ব নির্ধারণ করতে পারেন, তবে আগামিতে কোনও এক নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সুইডেন থেকে ফোন পাবেন। অর্থাৎ, আপনি অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেতে যাচ্ছেন। অর্থনীতিতে সরকার ভূমিকা কী ও কতটুকু এটি এখনও একটি অমীমাংসিত বিষয়। সরকার আপনার বিছানার মশারি টাঙ্গিয়ে দেবে কিনা, সেটি একটি অ্যাকাডেমিক বিষয় এবং দুঃখজনক হলেও অমীমাংসিত। আশা করি, ভিন্ন কোনও লেখনিতে এ বিষয়ে হয়তো বিস্তারিত লিখবো।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষা করা বাদ দিলে সরকারের যেসব ভূমিকা অর্থনীতিবিদরা স্বীকার করে নিয়েছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো— পাবলিক পণ্য ও সেবার প্রচলন এবং বাজারে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি। আমাদের মেট্রোরেল এ দুটি ক্ষেত্রেই সফলতা পেয়েছে। একটি পাবলিক পণ্য হিসেবে মিরপুর থেকে মতিঝিলগামী যাত্রীদের জন্য এর চেয়ে ভালো আর কী হবে? এছাড়া প্রতিযোগিতার বাজারে বাসের বিকল্প হিসেবে এটি একক স্থান করে নিয়েছে। এভাবে সোশ্যাল ওভারহেড ক্যাপিটাল সৃষ্টির মাধ্যমে সরকার ব্যালেন্সড গ্রোথ কৌশলে অংশগ্রহণ করতে পারে। এ কৌশলের মূলকথা হচ্ছে, সোশ্যাল ওভারহেড ক্যাপিটাল বাড়লে জনগণ কর্তৃক ডাইরেক্ট প্রডাক্টিভ অ্যাক্টিভিটি বাড়বে। মেট্রোরেলকে ঘিরে ঢাকা ও এর আশেপাশে কীভাবে বিনিয়োগ বাড়ছে, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। তবে কষ্টের বিষয় হচ্ছে— মিরপুর থেকে মতিঝিলে যেসব বাস চলাচল করতো, সেসব বাসচালকদের মুখের দিকে তাকানো যায় না। প্রায় যাত্রীহীন বাস নিয়ে চলাচল করায় তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান হয়তো জরুরি হয়ে পড়েছে!

মেট্রোরেল শুধু এসব কর্মসংস্থানের পরিবর্তন নয়, সমাজের অন্য অনেক হিসাব পাল্টে দিয়েছে। সত্য-মিথ্যা জানা হয়নি। মেট্রোরেল যুগে প্রবেশের আগে পাত্রের যোগ্যতা যাচাই করতে গিয়ে জানা গেল— পাত্র প্রতিদিন মিরপুর থেকে মতিঝিল গিয়ে অফিস করে। পাত্রী পক্ষ ছেলের ধৈর্য দেখে বিয়েতে রাজি হয়ে যায়! এখন হয়তো রামপুরা থেকে মিরপুর বা মতিঝিল যাওয়ার ক্ষেত্রে এভাবে পাত্রের যোগ্যতা বিচার করা যেতে পারে। মিরপুর বসবাস করা আর মতিঝিল গিয়ে অফিস করার নেপথ্যে রয়েছে অর্থনীতির মারপ্যাঁচ। দেশের অর্থনীতির প্রাণ হলো ঢাকা শহর। তবে এখানেও কর্মসংস্থানের অভাব। তাই কাজের ক্ষেত্র কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আর জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মিরপুর কিংবা শহর থেকে খানিক দূরে বসবাস করাই অনেকের জন্য একমাত্র উপায়। যদিও মিরপুরের জীবনযাত্রার ব্যয় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যাচ্ছে।

মেট্রোরেলে প্রত্যাশিতভাবে যাত্রীর চাপ অনেক। সেদিন ‘কারওয়ান’ বাজার স্টেশনে ট্রেনে একজনের সঙ্গে দেখা। বিষয়টি ভালো লেগেছে যে, আমাদের সবার পরিচিত ও প্রচলিত শব্দ ‘কাওরান’ বাজার ব্যবহার করা হয়নি, সঠিক শব্দচয়ন হয়েছে। অনেক যাত্রী থাকায় তিনিও দাঁড়িয়ে আছেন। জানতে চাইলাম, কোন স্টেশন থেকে এসেছেন? তিনি জানালেন সচিবালয়। অর্থাৎ, মতিঝিলের পরের স্টেশন। তার মানে হচ্ছে, মতিঝিল থেকেই সিট পাওয়া যাচ্ছে না। তাকে কোথায় যাবেন জিজ্ঞেস করলে তিনি জানালেন, সাভার। আমি বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বললেন যে, মিরপুর ১০ নম্বরে নেমে সেখান থেকে বাসে যাবেন। আশ্চর্য হইনি, এভাবে গেলেও অনেক সময় বেঁচে যাবে। মেট্রোতে প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ যাত্রী ভ্রমণ করছেন। ট্রেনের সময় সূচির হিসাবে মিনিটে প্রায় ৪৫০ জন যাত্রী পারাপার হচ্ছে।

মেট্রোরেলকে ঘিরে ঢাকার যে জীবন, তা আরও গতিশীল হয়েছে। দুই থেকে তিন ঘণ্টার যাত্রাপথ এখন ৩০ মিনিটে হয়ে যাচ্ছে। যারা মেট্রোরেল স্থাপনা তৈরির সময় অতিরিক্ত যানজটের কষ্ট সহ্য করেছেন— আমার মতো অনেকেই এ আনন্দের হিসাব তখন মেলাতে পারেননি। বেঁচে যাওয়া কর্মঘণ্টাকে কীভাবে আরও মূল্যবান করা যায়, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। মেট্রোরেলকে ঘিরে পজিটিভ এক্সটারনালিটির কারণে উত্তরা অঞ্চলের উন্নয়ন হবে। অনেকেই উত্তরায় থাকবেন আর পুরান ঢাকায় এসে চাকুরি-ব্যবসা করবেন। তবে উত্তরায় থাকার একটা বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে ট্রেনের সিট পাওয়া। ইতোমধ্যে জায়গার দামও বেড়ে গেছে। তবে এসব অপরিকল্পিত উন্নয়ন সুশৃঙ্খল নগরায়নের অন্তরায়।

পৃথিবীর প্রায় সব বড় শহরে নদী ও মেট্রোরেল (মনোরেল) রয়েছে। সে বিবেচনায় ঢাকা এখন আর পিছিয়ে নেই। আমাদের রয়েছে ‘কালোত্তীর্ণ’ বুড়িগঙ্গা। এখন গণপরিবহন হিসেবে যোগ হয়েছে মেট্রোরেল। আশা করি, অচিরেই মনোরেল যুক্ত হবে। যদিও পৃথিবীর অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় ঢাকা শহর অনেকটাই অনিরাপদ। ম্যানহোলেও পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেদিন শুনলাম, শ্রমিক শ্রেণির এক লোক ম্যানহোলের পাশ দিয়ে যাওয়া আরেকজনকে বলছেন, মাইন্ড অব গ্যাপ! বুঝতে দ্বিধা নেই, তিনি মেট্রোরেল ব্যবহার করছেন। এভাবেই মেট্রোরেল আমাদের ঢাকার শহুরে জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়েছে। তবে এখনও অনেকেই একে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাই লাইনের কাছাকাছি গিয়ে পরিদর্শন করছেন, ছবি তুলছেন, ভিডিও করছেন, কিংবা উঁকিঝুঁকি মারছেন। ফলে কর্তব্যরত আনসার সদস্যরা বারবার বাঁশি দিয়ে সতর্ক করছেন। মেট্রোরেল চালুর এতদিন পর অহেতুক বাঁশির শব্দ অনেকের কাছেই বিরক্তির উদ্রেক করছে।

মেট্রোরেলকে ঘিরে আনন্দের অনেক উপকরণ রয়েছে। এখনও কোচগুলো ঝকঝকে! কেউ আঁকাআঁকি করেননি! কিংবা পোস্টারও নেই! এর পেছনেও রয়েছে উন্নয়ন অর্থনীতির চমকপ্রদ দর্শন। বর্তমান বাজার অর্থনীতিতে সরকার উন্নয়ন ব্যয়কে ফলপ্রসূ করতে অংশীজনের মধ্যে সম্পদের অংশীদারত্ব সৃষ্টি করে। যার ফলে এর ব্যবস্থাপনা অনেক সহজ ও স্বল্প ব্যয়ের হয়ে থাকে। মেট্রোরেল এরকমই এক সরকারি সম্পদ, যা সবাই ওন করছে। ফলে এটি রক্ষায় সবাই বেশ মনোযোগী। যাত্রীদের সবাই বেশ যৌক্তিক আচরণ করছেন, হয়তো নিজের স্বার্থেই। এ স্বার্থ সৃষ্টির মাধ্যমেই সরকার উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে তরান্বিত করতে পারে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেট্রোরেল হয়ে উঠছে থামতে না জানা জীবনের প্রতিচ্ছবি। যে কেউ তার অবস্থান জানাতে সহজেই বলতে পারেন— আমি ৩৩৩ নম্বর পিলারের কাছে আছি! ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় যদি আপনি এস্কেলেটরের ইমারজেন্সি স্টপ বাটনে চাপ না দেন, তবে থেমে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই, গন্তব্যে পৌঁছে যেতে আগের মতো আর অনিশ্চিত সময় লাগবে না! স্টেশন থেকে বের হওয়ার জন্য যে গেট (এ থেকে ডি) রয়েছে, তা বিজয় সরণী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন বাদ দিলে সব স্টেশনের জন্য একই ডিজাইনের হওয়ায় ঝামেলা এড়ানো যাচ্ছে। কর্তৃপক্ষকে একটা ধন্যবাদ দেওয়া যেতেই পারে। মেট্রোরেল আমাদের কাছে কতটুকু জনপ্রিয়, তার একটা উদাহরণ দেই। বাবা ও মেয়ে ট্রেনে বসে গল্প করছেন, দুই প্রজন্মের দুইজন। মেয়ে ট্রেনের বিভিন্ন বিষয় বাবাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে। আমিও মনযোগী শ্রোতা হিসেবে ওনাদের কথা শুনছি। কথার এক পর্যায়ে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ঢাকা থেকে যশোরের দিকে এরকম ট্রেন চালনার পরিকল্পনা আছে কি? আমি ওনাকে দুঃখ না দিতে চেয়ে বললাম, আমার জানা নেই।

কোচের সংখ্যা, ট্রেনের ফ্রিকোয়েন্সি বিবেচনায় চাহিদার চেয়ে জোগান অনেক কম। বাজার ভারসাম্যে সরাসরি ঘাটতি রয়েছে। এটি লাভজনক হবে কিনা, সেটি বিবেচনায় না নিয়ে ট্রেনের ফ্রিকোয়েন্সি এবং চলাচলের সময় বাড়ানো যেতে পারে। আর্থিক লাভ কতটুকু হচ্ছে, তার চেয়েও বড় বিষয় হলো— এর প্রত্যক্ষ সুবিধার চেয়ে পরোক্ষ সুবিধা অনেক বেশি, যা স্পিলওভার ইফেক্টের মাধ্যমে ঢাকার অর্থনীতির চাকাকে আরও গতিশীল করবে। কোচের ডিসপ্লে বোর্ড কিংবা স্টেশনে বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষা ও সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা করা যেতে পারে। যেহেতু সবাই ওন করছে, সেহেতু মানুষের মনস্তত্ত্ব বিবেচনায় এসব প্রচার ফলপ্রসূ হবে বলে আমার বিশ্বাস। খবরে প্রকাশ, ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার স্টেশনের খোলা জায়গা ব্যবসার জন্য বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেওয়া হবে। তবে যাত্রীদের স্বাভাবিক গতি ও কার্যক্রম যেন বাঁধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল নিতে হবে।

যাত্রী হিসেবে আমাদের মনে অনেক আশঙ্কা কাজ করে। এর কারণও রয়েছে। গতবছর ২৬ অক্টোবরে ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে মেট্রোরেলের পিলার থেকে খুলে পড়া বিয়ারিং প্যাডের আঘাতে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এর আগেও ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনের কাছে একটি বিয়ারিং প্যাড সরে যাওয়ার ঘটনায় দীর্ঘ সময় ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। এগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত এবং সুষ্ঠু তদন্দের দাবিদার। এখন চলার পথে চোখ উপরে দিয়ে রাখতে হয়, যেকোনও কিছু খুলে পড়ে যাচ্ছে কিনা! একেকটি বগি কতজন যাত্রী নিয়ে চলাচল করতে পারবে, সে বিষয়ে আমাদের ধারণা নাই। তাই যাত্রীর মাত্রাতিরিক্ত চাপের ফলে ভয় জাগে যেকোনও দুর্ঘটনা ঘটে কিনা! তাছাড়া, ভূমিকম্পের কারণে মেট্রোরেলের স্থাপনা কততুকু টিকে থাকবে, সে বিষয়েও এক রকমের সন্দেহ কাজ করে।

স্টেশনের বাইরে ও রেলপথের নিচে অনেক ছিন্নমূল মানুষ দেখা যায়। এটিও অর্থনীতির অবস্থা দিয়ে সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়। ঝকঝকে স্টেশন ও ট্রেনের কোচের বিপরীতে এগুলো একেবারেই বেমানান। যাত্রীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ার কারণে ওঠানামায় একটা সিস্টেমেটিক পরিবর্তন জরুরি। চলন্ত সিঁড়িগুলো নিচে নামছে নাকি ওপরে উঠছে দূর থেকে সেরকম কোনও নির্দেশনা নাই। ফলে এর কাছে গিয়ে দেখতে হচ্ছে। মেয়েদের কোচের সংখ্যাও বাড়ানো যেতে পারে। মাঝে মাঝে টিকিট কাউন্টার ঠিকমতো কাজ করছে না। বৃষ্টি হলে স্টেশনের লিফটগুলো বন্ধ করে রাখতে হয়। যাত্রীদের অনেকেই শারীরিকভাবে অক্ষম কিংবা বয়স্ক, তাই লিফটের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। হঠাৎ কোনও কারণে ট্রেন বন্ধ থাকলে যাত্রীদের কষ্ট হচ্ছে, আর সময়ের হিসাব মিলানো দুরূহ হয়ে পড়ছে। পত্রিকার খবরে প্রকাশ— কখনও কখনও আন্দোলনকারীরাও স্টেশনে ঢুকে পড়ছেন। স্টেশনের নামকরণ নিয়েও কোনও বক্তব্য নাই। তবে ‘উত্তরা দক্ষিণ’ আর ‘উত্তরা উত্তর’ এর মিল রেখে ‘মধ্য উত্তরা’ নামকরণ কি হতে পারতো? একটা অনুরোধ করতে চাই, সুযোগ থাকলে কোচের ডিসপ্লে বোর্ডগুলোতে প্রমিত বাংলা ফন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে।

বর্তমান সরকার নির্বাচনি ইশতেহারে গণপরিবহনের ব্যাপকতা বাড়িয়ে যানজট নিরসনে তার আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। যানজট নিরসনের লক্ষ্যে গণপরিবহন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও মানোন্নয়ন, জনবহুল নগরগুলোতে পাবলিক ট্রান্সপোর্টকে অধিকতর কার্যকর ও সহজলভ্য করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে মর্মে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। মেট্রোরেল নিয়ে আলোচনার প্রায় সবকিছু মনোরেলের জন্যও প্রাসঙ্গিক। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে ঢাকাকে একটি আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে মনোরেল হতে পারে একটি কার্যকর সমাধান। কারণ একটি কার্যকর গণপরিবহন ছাড়া ঢাকা অচল। শহরের অধিক সংখ্যক লোককে এক স্থান হতে অন্য স্থানে স্থানান্তরের এর চেয়ে ভালো ব্যবস্থা আর নাই। তাছাড়া, শহরের যানজট নিরসনে যানবাহনের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করতে হয়। এ ধারণা থেকেই সার্কুলার রোডের প্রবর্তন হয়েছে। যেহেতু প্রয়োজনের তুলনায় সড়ক যোগাযোগের অবকাঠামো অনেক কম, এজন্য নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ অনেকক্ষেত্রেই অসম্ভব। তাই মনোরেল একটি ফলপ্রসূ সমাধান হতে পারে। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাসম্পন্ন দেশে মনোরেল একটি বাস্তবসম্মত ও সম্ভাবনাময় গণপরিবহন হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক