নিঃসঙ্গ ও একাকী থাকার শাস্তি আমরা চাই না

শাহানা হুদা রঞ্জনা
৩১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০

পর পর কয়েকটি নিঃসঙ্গ মৃত্যুর খবর আমাদের অনেককেই কষ্ট দিয়েছে, একই সাথে করেছে আতঙ্কিত। এই মানুষগুলোর একদিন সব ছিল। এখনও পরিবারে অনেকেই আছেন, কিন্তু পাশে কেউ নেই। ঘরের কোণে একা, অনাদৃত অবস্থায় থেকে চলে গেলেন।

হয়তো সমাজটাকে আমরা এভাবেই পাল্টে ফেলছি। একটা বয়সে কাজ, ব্যস্ততা, অর্থ উপার্জন, আরাম-আয়েশ, বিনোদনের কথা ভেবে নিজেরা একক পরিবারে থাকতে শুরু করি। এরপর জীবনের একটা পর্যায়ে গিয়ে দেখি আমরা অনেকটাই একা হয়ে গেছি।

কাছের মানুষগুলো একসাথে থেকে ছোট-বড় সুখ ও দুঃখ ভাগ করে নিতে পারাটা একসময় ছিল অনেক আনন্দের। আমার বাবা বলতেন, সবাই পাশে থেকে যদি শক্তি জোগায়, তাহলে সেখানেই তুমি সুখ খুঁজে পাবে। একা থাকার মধ্যে কোনও সুখ নেই। সবার সাথে থাকলে কোনও কিছু না পাওয়ার দুঃখ সহজে স্পর্শ করতে পারে না। আর যখন অনুভব করতে পারবে তোমরা একা নও, তখন মানসিকভাবে শক্তি খুঁজে পাবে। সবাই সবার পাশে থাকলে মানুষ কখনও ভেঙে পড়ে না, নিঃসঙ্গ ও বিষণ্ন হয় না।

আমার বাবা মনোচিকিৎসক ছিলেন না, অথচ আজ থেকে ৫০ বছর আগে তিনি জীবনযাপনের সহজ যে পথ আমাদের দেখিয়েছিলেন, এরই প্রকাশ দেখছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘সার্জন জেনারেল’ ডা. ভিভেক মার্থির প্রতিবেদনে। তিনি বলেছেন, জনস্বাস্থ্যের পরবর্তী বড় সমস্যা হচ্ছে নিঃসঙ্গতা। বহু মানুষ নিঃসঙ্গতায় ভোগেন। এই ভোগার অনুভূতিটা ক্ষুধা অথবা তৃষ্ণার মতো। সামাজিক নিঃসঙ্গতা দিনে ১৫টি সিগারেট খাওয়ার সমান ক্ষতি করে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

প্রতিবেদনটি বলছে, নিঃসঙ্গ ব্যক্তিদের হার্টের রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ৩০ শতাংশ বেশি। শুধু হৃদরোগ নয়, সামাজিকভাবে নিঃসঙ্গ ও বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের স্মৃতিভ্রংশ, স্ট্রোক, বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও অকাল মৃত্যুর শিকার হওয়ার ঝুঁকিও অনেক বেশি।

চিকিৎসকরা এখন মুখোমুখি বসে পরিবার-পরিজন, সহকর্মী, বন্ধুবান্ধব বা পরিচিতদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য পরামর্শ দিচ্ছেন। সেইসাথে কম সময় কাটাতে বলছেন অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ডা. ভিভেক বলেছেন, ‘‘একাকিত্ব বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইন্টারেকশন বা মিথস্ক্রিয়ার কোনও বিকল্প নেই। যোগাযোগের জন্য আমরা যত বেশি প্রযুক্তির দ্বারস্থ হয়েছি, ব্যক্তিপর্যায়ে যোগাযোগ ততই হারিয়েছি।”

আধুনিক মানুষ ক্রমশ একা হয়ে যাচ্ছে। মানুষ যখন সুখে থাকে ও সুস্থ থাকে, তখন এই একা থাকাটা উপভোগ করে। কিন্তু হতাশা, বিষণ্নতা, ভয় বা জটিল কোনও সমস্যায় পড়লে, অথবা মানসিক অস্থিরতা বেড়ে গেলে বা শরীর খারাপ হলে মানুষ খুব নিঃসঙ্গ ও অসহায় বোধ করে।

এতদিন ধারণা করা হতো একাকিত্বের কারণে মানুষ শুধু মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, একা থাকা ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে শারীরিক ক্ষতির পরিমাণও কম নয়। একাকিত্বের কারণে অসময়ে মৃত্যুর পরিমাণ বেড়েছে ২৬ শতাংশ।

যে সময়টায় আমরা বড় হয়ে উঠেছি অর্থাৎ সেই ৭০/৮০ দশকে ঢাকা শহরে আশ্রয় দেওয়ার মতো মানুষ কম ছিল, আয়ও ছিল সীমিত। এরপরও এই মানুষগুলো দায়িত্ব নিতে পিছপা হয়নি। সেই সময় অনেক মানুষ একসাথে থাকতো, সাধারণ খাবার ভাগ করে খেতো, একটা পড়ার টেবিলে ভাইবোন গুনগুনিয়ে পড়তো, একটা ডিম ভেজে বাসার সবাই ভাগ করে খেতো। পাশাপাশি থেকে সামাজিকীকরণটা বা সোশ্যালাইজেশনটা শিখে নিয়েছিল। তাই সেই অল্প পাওয়া মানুষগুলোকে বিচ্ছিন্নতায় ভুগতে হয়নি।

সময়ের সাথে সাথে আমাদের জীবনমানের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। অনেকেরই বড় বাড়ি হয়েছে, গাড়ি হয়েছে, ব্যাংকে টাকা বেড়েছে, খাদ্য অভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে। ঘর ভরা নতুন দামি আসবাব, হাতে প্রযুক্তি কিন্তু সেই ভালোবাসায় ঘেরা আশ্রয় কোথায়? প্রয়োজনের সময় এই শহরে পা রাখার মতো জায়গা কোথায়? পাশে দাঁড়ানোর মতো বন্ধু-স্বজন কোথায়? পাড়া-প্রতিবেশী, সবাই যেন থেকেও নেই। আশপাশে অনেকেই আছে, কিন্তু আসলে কেউ নেই।

আজকের এই নাগরিক জীবনে কপটতার ছড়াছড়ি, আন্তরিকতার অভাব। আমাদের বাহ্যিক অনেক কিছুই বেড়েছে কিন্তু কমেছে ভালোবাসা ও সহমর্মিতা। প্রতিনিয়ত অনুভব করছি— আমরাই ক্রমশ জীবনকে প্রতিযোগিতার মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছি। আর যত বেশি প্রতিযোগিতার মধ্যে ঢুকছি, ততই যেন সুখ হারিয়ে ফেলছি।

নিঃসঙ্গতা কিশোর-তরুণদের বেশি ভোগাচ্ছে। এদের বন্ধু অনেক, কিন্তু এরা আত্মীয় ও পরিবারকে এড়িয়ে চলতে চায়। মূলত নির্ভর করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তির ওপর। এদের অনেকেই মধ্যবয়সে গিয়ে নিজের বিচ্ছিন্ন অবস্থাকে মেনে নিতে পারে না। এই একাকিত্ব ব্যক্তির মধ্যে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে।

মানব সমাজের ইতিহাস সমাজবদ্ধ মানুষের কথা বলে। পরিবার ও সমাজ ছাড়া মানুষ বাঁচে না, বাঁচা কষ্টকর। বর্তমানের শহুরে নিরাপত্তা, সুবিধাদি, নানা প্রযুক্তিগত সুযোগ মানুষকে একা বাস করার কিছু সুযোগ হয়তো করে দিয়েছে, কিন্তু মানসিকভাবে মানুষ একা থাকা নিয়ে এখনও দুর্বল। এই কারণেই মানুষ নিজের দুঃসময়ে পরিবার, বন্ধু ও সন্তানের পাশে থাকতে চায়।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউরো-সায়েন্টিস্ট ম্যাথিউ লিবারম্যান বলেন, “বেঁচে থাকতে প্রত্যক্ষ সামাজিক যোগাযোগ প্রয়োজন এবং সেটা আমাদের দেহ জানে। তবে বিষয় হলো, একাকিত্বের মতো মানসিক আঘাত প্রমাণ করে যে সামাজিক যোগাযোগটা কতটা জরুরি।” এখানে ‘‘একাকিত্বকে” উনি ‘‘মানসিক আঘাত” বলে মনে করছেন। তিনি বলেছেন, যেভাবে খিদা লাগলে পেট জানান দেয়, তেমনই কোনও কিছুর ঘাটতি হওয়ার সংকেত দেয় একাকিত্ব।

একটা পর্যায়ে গিয়ে মানুষের পক্ষে ভালোবাসাহীন পরিবেশে বেঁচে থাকাটা খুব কষ্টের হয়ে পড়ে। এই একাকিত্ব থেকে মুক্তির জন্যই পরিবার প্রথার সৃষ্টি। আবার পরিবারকে যেন বিচ্ছিন্ন থাকতে না হয়, সেজন্য সমাজের সৃষ্টি। পরিবার ও সমাজের স্থান তাই ব্যক্তির ওপরে। আমরা অবশ্য ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার চাপে পড়ে তা ভুলে যাচ্ছি এবং স্বার্থপরের মতো নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিগহাম ইয়ং ইউনিভার্সিটি’র সাইকোলজি ও নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক ড. জুলিয়ান হল্ট-লান্সটেড এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “আমাদের মস্তিষ্ক যোগাযোগের জন্য প্রস্তুত করা। দলের মধ্যে থেকে মানুষ কাজ করায় অভ্যস্ত।” তিনি মনে করেন, “আমরা যাদের বিশ্বাস করি, তাদেরই সান্নিধ্য আশা করি। তবে সেটা পাওয়া না গেলে, আমরা বিচ্ছিন্ন হই, আশপাশের মানুষদের আর বিশ্বাস করতে পারি না। অথবা সেই দল থেকে আমরা বের হয়ে যাই। এটা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য হুমকিস্বরূপ।”

মানুষ কখনোই পুরোপুরি একা থাকে না। তবে সমস্যা হয় তখনই, যখন মানুষ কোনও কারণে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে বা এমন সম্পর্কে জড়িয়ে যায়, সে সম্পর্কে আবেগ বা ভালোবাসা থাকে না, শুধু স্বার্থ থাকে। স্বার্থের কারণে যে সম্পর্ক তৈরি হয়, সেই সম্পর্ক নষ্ট হতে সময় লাগে না। আর সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া মানে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়া।

শুধু কাজ বা সাফল্য যে মানুষকে একাকিত্ব কাটানোর, পরিপূর্ণভাবে সুখী করার ও বাঁচার রসদ দিতে পারে না, মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস সেই কথাই বলেছেন এভাবে, তারুণ্য পেরিয়ে বার্ধক্যে পা রাখার আগ পর্যন্ত তিনি উপলব্ধি করতে পারেননি যে কাজের বাইরেও মানুষের আলাদা একটা জীবন রয়েছে। আর সেই জীবনটাই হলো সামাজিক জীবন। নিজের সম্পর্কগুলোকে যত্ন করার জন্য, সফলতা উদযাপনের জন্য এবং ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্যেও সময় নিতে হবে, যখনই প্রয়োজন মনে হবে বিরতি নিতে হবে। মোট কথা সুখ বা দুঃখ ভাগ করে নিতে হবে।

মনীষীরা বলেন, ‘‘ভাগ করে নিলে সুখ বাড়ে, আর দুঃখ কমে।” অথচ আমরা এখন সেই ভাগ করাটাই ভুলে যাচ্ছি। যখন সাধ্যের বাইরে গিয়ে নিজের ও পরিবারের সাধ মেটানোর চেষ্টা করে, তখনই মানুষ পরাজিত হতে শুরু করে। তরুণরা সুখ বলতে টাকা বোঝে, অবশ্য আমরাও তাই বুঝি। এখন সুখ মাপি টাকার অঙ্কে। এই চক্করে পড়ে জীবন থেকে হারিয়ে যায় শান্তি। ভালোবাসাহীন ও একাকী জীবনে পড়ে থাকে শুধু অতৃপ্ত আত্মা।

কবি জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি বলেছেন, ‘‘আগে তোমার মনকে মুক্ত করে দাও এবং তারপর মনোযোগী হও। কান বন্ধ করে শোন!” আমরা ভালো থাকার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় পড়ে মনোযোগটাই হারাতে বসেছি। বুঝতেই পারছি না কখন আমরা পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে একসাথে থেকেও একা হয়ে পড়ছি।

পোলিস দার্শনিক জিগমুন্ট বাউম্যান বলেছেন, ‘‘আমরা সবাই এখন একসাথে একা। আমরা গণনিঃসঙ্গতার শাস্তিপ্রাপ্ত।” এই শাস্তি আমরা চাই না, চাই না একাকিত্ব নিয়ে বাঁচতে। চাই পাশে থাকা কিছু মানুষ আর তাদের ভালবাসা।

লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
শাহজালালে ৫২ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারে পৃথক ৩ মামলার কিনারা পাচ্ছে না পুলিশ
শাহজালালে ৫২ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারে পৃথক ৩ মামলার কিনারা পাচ্ছে না পুলিশ
নিঃসঙ্গ ও একাকী থাকার শাস্তি আমরা চাই না
নিঃসঙ্গ ও একাকী থাকার শাস্তি আমরা চাই না
স্বর্ণের দাম বাড়লো, ভরিতে কত 
স্বর্ণের দাম বাড়লো, ভরিতে কত 
অস্ত্র ছাড়তে রাজি হামাস, দাবি ট্রাম্পের
অস্ত্র ছাড়তে রাজি হামাস, দাবি ট্রাম্পের
সর্বশেষসর্বাধিক