নারী-শিশুর নিরাপত্তা আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দেশের ক্ষমতায় বসেছে। ক্ষমতা গ্রহণের সময়কাল এখনও এক মাসও পূর্ণ হয়নি। কাজেই বর্তমান সরকারকে তাদের কার্যক্রম ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করার মতো সময় এখনও আসেনি। তবুও সাম্প্রতিক ঘটনাবলি থেকে এটা বলতেই হবে যে— নারী ও শিশুর ওপর যে ধরনের হামলা ও আক্রমণ সংঘটিত হচ্ছে, তা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুকতাকে যেমন ইঙ্গিত করে, তেমনি নারী-শিশুর নিরাপত্তার জন্য এক বিরাট অশনিসংকেত। 

কী পরিমাণ নৈতিক অবক্ষয় আর নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবনতি হলে পিতার কাছ থেকে মেয়েকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা করা সম্ভব! ঘরের ভেতর দাদিকে হত্যা করে নাতনিকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা, রাজধানীতে (হাতিরঝিলে) ছয় বছরের শিশুকে গণধর্ষণের পর হত্যা, কিংবা গলাকাটা অবস্থায় সাত বছরের রক্তাক্ত শিশুর জঙ্গল থেকে টলমলে পায়ে লোকালয়ের দিকে হেঁটে আসা— এসব ঘটনা যেন কোনও বীভৎস ‘হরর মুভি’র গল্পকেও হার মানায়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা ভেঙে পড়লে এসব ‘ঠাকুরমার ঝুলি’র গল্পগুলো আজ আমাদের সামনে চরম নিষ্ঠুর বাস্তব হয়ে ধরা দেয়! 

সরকার ক্ষমতায় বসেছে খুব অল্প সময় হলো। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের মেয়াদ যতই স্বল্প হোক না কেন, এসব ‘হরর’ ঘটনা বন্ধ করার উদ্যোগ অচিরে না নিলে নারী-শিশুর নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মধ্যে পতিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নারী শিক্ষক যখন নিজ দফতরে অধস্তন কর্মচারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন, তখন বলতেই হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে নেই। এভাবে একের পর এক সংঘটিত নৃশংসতাকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে দেখার কোনও অবকাশ নেই। 

মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিবেদনে দেখা যায়, শুধুমাত্র ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই ২৫৩টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৩৩টি ধর্ষণের ঘটনা। নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগীদের মধ্যে আটজন কিশোরী ও সাতটি কন্যা শিশু (সূত্র: কালের কণ্ঠ, ৩ মার্চ ২০২৬)। 

নারীর ওপর শুধু শারীরিকভাবে আক্রমণ হচ্ছে তা নয়, ‘সাইবার বুলিং’কেও একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। সাইবার বুলিংয়ের মাধ্যমে নারীকে সামাজিক, মানসিক এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে ভেঙে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষত এই আক্রমণ সবচেয়ে বেশি দেখা গিয়েছিল ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনের সময়। গণধর্ষণের হুমকিসহ সব ধরনের হেনস্তা ও বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নারী প্রার্থীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার জঘন্য পন্থা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ডাকসুর লড়াকু নারীরা সেসব হুমকিকে তোয়াক্কা না করে দৃঢ়তার সাথে সহপাঠীদের মন জয় করেছেন। ডাকসুর বর্তমান সদস্য হেমা চাকমার নাম এখানে উল্লেখ করা যায়— যিনি সব বাধা পেরিয়ে জয় ছিনিয়ে এনে মোক্ষম জবাব দিয়েছেন। 

শুধু ডাকসুতে অংশগ্রহণকারী নারী প্রার্থী নয়— নারী সংস্কৃতিকর্মী, উদ্যোক্তা ও খেলোয়াড়দের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ, খেলতে বাধা প্রদান এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বানচাল করে দেওয়ার ঘটনা বিগত দেড় বছরে অহরহ ঘটেছে। আদর্শিক ও নৈতিকতাবোধের দৈন্যতা কোন পর্যায়ে নামলে বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়াকে নিয়েও অপমানজনক মন্তব্য করতে কারো জিহ্বা কাঁপে না! এখনই যদি এই নারীবিদ্বেষী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে সুযোগসন্ধানী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই ঢিলেঢালা সুযোগকে বারবার কাজে লাগাতে পারে। 

লক্ষণীয় বিষয় হলো— জুলাই অভ্যুত্থানের পর ‘মব’ তৈরি করে নারীর ওপর আঘাত করার প্রবণতা ব্যাপক হারে বেড়েছিল। নারীর কাজ, পোশাক, দৈনন্দিন কার্যক্রম ও স্বভাবজাত চলাফেরা— সব ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরির জন্য এক ধরনের ‘মব সংস্কৃতি’ গড়ে তোলার চেষ্টার কমতি ছিল না। কিন্তু শত বাধার মুখেও নারীরা রুখে দাঁড়িয়েছেন। মশাল হাতে ‘শিকল ভাঙার পদযাত্রা’ করে তারা এই মব সংস্কৃতির প্রতিবাদ করেছেন। তবে রাষ্ট্র যদি এসব অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান না নেয়, তবে এই প্রতিরোধ দীর্ঘস্থায়ী করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। নারীর ওপর আক্রমণ ও সব ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তির দৃষ্টান্ত তৈরি করতে না পারলে এই মব সংস্কৃতি নির্মূল করা কঠিন হবে। 

এ বছরের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য হলো— ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার; সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’। হ্যাঁ, আজকে যদি নারীর ওপর আক্রমণকারী ও নারীবিদ্বেষী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা না যায়, তবে নারী ও কন্যা শিশুর ন্যায়বিচার কোনোভাবেই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। তাই নিপীড়নকারী, উত্যক্তকারী, ধর্ষক এবং মব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে; নইলে এদেশ কোনোভাবেই নারীবান্ধব হয়ে উঠবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশের একটি বৃহৎ অংশকে অনিরাপদ রেখে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

কাজেই রাষ্ট্রকে অবশ্যই জেন্ডার সংবেদনশীল হতে হবে। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। একই সাথে রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংস্থা ও ব্যক্তি পর্যায়ে জেন্ডার সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো হতে পারে সচেতনতামূলক শিক্ষার প্রথম পাঠশালা। যদিও আমরা দেখেছি, কিছু ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানেই শিশুরা বেশি যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়; তাই সরকারকে এসব প্রতিষ্ঠানের দিকেও কঠোর নজর দিতে হবে। 

আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। সুন্দর মননের শিশুরাই আমাদের আগামীর বাংলাদেশকে নতুন স্বপ্নের পথ দেখাবে।  

লেখক: সদস‍্য, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন