বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে সামরিক শক্তি, কৌশল এবং আন্তর্জাতিক জোট সব সময়ই বড় ভূমিকা পালন করেছে। আধুনিক যুগে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার বিশাল প্রতিরক্ষা বাজেট, উন্নত প্রযুক্তি, বিশ্বজুড়ে সামরিক ঘাঁটি এবং শক্তিশালী মিত্র জোট তাকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। তবুও ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে প্রতিটি সংঘাতে নিশ্চিত বিজয় অর্জন করা যায় না। অনেক সময় একটি যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে রাজনৈতিক বাস্তবতা, স্থানীয় প্রতিরোধ, অর্থনৈতিক চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতা মাথায় রাখলে বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি কি আবারও এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে যেখানে স্পষ্ট বিজয় অর্জন করা কঠিন হতে পারে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্র অতীতে বেশ কয়েকটি সংঘাতে প্রত্যাশিত ফল অর্জন করতে পারেনি। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম আলোচিত সংঘাত ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধ। শীতল যুদ্ধের সময় ১৯৫৫ সালে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকারকে সমর্থন দিয়ে উত্তর ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়। যুদ্ধটি দ্রুত বিস্তৃত আকার ধারণ করে এবং বিপুল সংখ্যক মার্কিন সৈন্য সেখানে মোতায়েন করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সংঘাত, ব্যাপক প্রাণহানি এবং দেশের ভেতরে তীব্র জনবিক্ষোভের ফলে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহারে বাধ্য হয়। ১৯৭৫ সালে সাইগনের পতনের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকার ভেঙে পড়ে। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তির ওপরও বড় প্রভাব ফেলে।
ভিয়েতনামের পর আরেকটি দীর্ঘ সংঘাত ছিল আফগানিস্তানে যুদ্ধ। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে এবং দ্রুত তালেবান সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু এরপর শুরু হয় দীর্ঘ গেরিলা যুদ্ধ। দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতে বিপুল অর্থ ব্যয় এবং হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েনের পরও একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহার করার পর তালেবান আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে। অনেক বিশ্লেষকের কাছে এটি একটি বড় কৌশলগত ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইতিহাসে আরও কিছু ঘটনা রয়েছে যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সামরিক বা কৌশলগতভাবে হতাশাজনক ফল নিয়ে এসেছে। ১৯৬১ সালের বে অফ পিগস অভিযান কিউবায় ফিদেল কাস্ত্রোর সরকারকে উৎখাতের একটি ব্যর্থ চেষ্টা ছিল। একইভাবে কোরিয়ান যুদ্ধ দ্রুত বিজয়ের আশা নিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত একটি যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হয় এবং কোরিয়া আজও বিভক্ত। ১৯৮৩ সালে লেবাননে মার্কিন মেরিন ব্যারাকে আত্মঘাতী হামলায় ২৪১ জন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সেখানে থেকে সেনা সরিয়ে নেয়। ১৯৯৩ সালে সোমালিয়ার মোগাদিশুর যুদ্ধও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কঠিন সামরিক অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়।
এই সব অভিজ্ঞতা দেখায় যে আধুনিক যুদ্ধের ফলাফল কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না। একটি সংঘাতের ফল নির্ধারণে রাজনৈতিক লক্ষ্য, স্থানীয় প্রতিরোধ, অর্থনৈতিক ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অনেক পর্যবেক্ষক তাই নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে একটি যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করে। হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক অবকাঠামো ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। কিন্তু পরিকল্পনার একটি বড় অংশ ছিল ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে দ্রুত দুর্বল করে ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা। বাস্তবে তা ঘটেনি। খুব দ্রুতই মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ইরানের ক্ষমতা কাঠামো অক্ষুণ্ন থাকে। এমনকি কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের নেতৃত্ব কাঠামোতে একাধিক বিকল্প উত্তরসূরি আগেই নির্ধারণ করা ছিল, যাতে কোনো নেতা নিহত হলেও পুরো ব্যবস্থা অচল না হয়ে যায়।
হামলার পরপরই পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ও মিত্র ঘাঁটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে। একই সময়ে ইরানের আঞ্চলিক মিত্র সংগঠনগুলোও সক্রিয় হয়ে ওঠে। লেবাননে হিজবুল্লাহ ইসরাইলের বিরুদ্ধে হামলা বাড়ায় এবং সীমান্তে নতুন সংঘর্ষ শুরু হয়। ইয়েমেনে হুথি আন্দোলন সমুদ্রপথ ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়। ফলে যুদ্ধটি দ্রুত বহু ফ্রন্টের সংঘাতে পরিণত হয়।
এই সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরানের সামরিক কৌশল। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, গত দুই দশক ধরে তারা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধগুলো বিশ্লেষণ করে এমন একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছে যাতে রাজধানী তেহরান বোমা হামলার শিকার হলেও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। এই কৌশলকে ইরানি সামরিক বিশ্লেষকেরা বলেন ডিসেন্ট্রালাইজড মোজাইক ডিফেন্স।
এই ধারণার মূল উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধের সময় একটি বড় আঘাতে পুরো কমান্ড কাঠামো ভেঙে পড়া ঠেকানো। ইরানের প্রতিরক্ষা কাঠামোকে একক কমান্ডের অধীনে না রেখে বিভিন্ন আঞ্চলিক স্তরে ভাগ করা হয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস, বাসিজ বাহিনী, নিয়মিত সেনাবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট এবং স্থানীয় কমান্ডগুলো একটি ছড়ানো নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে কাজ করে। ফলে কোনো একটি কমান্ড ধ্বংস হলেও অন্য ইউনিটগুলো যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে।
এই কৌশল অনুযায়ী নিয়মিত সেনাবাহিনী প্রথম আঘাত সামলানোর চেষ্টা করে এবং শত্রুর অগ্রগতি ধীর করে। এরপর আইআরজিসি ও বাসিজ বাহিনী যুদ্ধকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়যুদ্ধে পরিণত করার চেষ্টা করে। হামলা, ওঁত পেতে আক্রমণ, সরবরাহ লাইন বিঘ্নিত করা এবং স্থানীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলা এই কৌশলের অংশ।
স্থল যুদ্ধের পাশাপাশি ইরানের নৌবাহিনী পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী এলাকায় শত্রুর চলাচল কঠিন করে তুলতে পারে। দ্রুতগতির নৌকা, মাইন এবং জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে বাণিজ্য ও সামরিক চলাচল ব্যাহত করা তাদের একটি লক্ষ্য। একই সময়ে ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী দূরপাল্লার হামলার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
এই কৌশলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নতুন ধরনের প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের তৈরি শাহেদ সিরিজের আত্মঘাতী ড্রোন বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। এই ড্রোনগুলোর একেকটির উৎপাদন খরচ প্রায় বিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার ডলার। কিন্তু এগুলো ভূপাতিত করতে প্রতিপক্ষকে ব্যবহার করতে হচ্ছে কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র। এই বিশাল অর্থনৈতিক বৈষম্য যুদ্ধের সমীকরণ বদলে দিচ্ছে।
ইরানের কৌশল হলো একসঙ্গে শত শত ড্রোন উৎক্ষেপণ করা। এই ড্রোনের ঝাঁক আক্রমণ আধুনিক রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করে দেয়। বিপুল সংখ্যক লক্ষ্যবস্তু একসঙ্গে উপস্থিত হলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে প্রতিটি ড্রোন ধ্বংস করা কঠিন হয়ে যায়। ফলে কিছু ড্রোন প্রতিরক্ষা বলয় ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনের যুদ্ধে শুধু উন্নত প্রযুক্তি নয় বরং সাশ্রয়ী অস্ত্রের সংখ্যাও বড় ভূমিকা রাখবে।
এই যুদ্ধের আরেকটি জটিল দিক হলো এর রাজনৈতিক নেতৃত্ব। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই সংঘাতে প্রকৃত চালকের ভূমিকায় রয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বেশি হলেও সংঘাতের রাজনৈতিক লক্ষ্য অনেকটাই ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এই যুদ্ধের ফলাফল যদি পূর্ণ বিজয়ে শেষ না হয়, তাহলে তা ইসরাইলের জন্য গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। যদি যুদ্ধ এমন অবস্থায় শেষ হয় যেখানে বড় ধ্বংসযজ্ঞের পরও ইরানের শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে, তাহলে ইরান দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোতে পারে। সেই সম্ভাবনা ঠেকাতে হলে ইরানের ভেতরের গভীর বাংকার ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা কেবল বিমান হামলার মাধ্যমে অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন।
এদিকে যুদ্ধের প্রভাব আঞ্চলিক ভূরাজনীতিকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। ইতিমধ্যে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জোট রাজনীতিও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আন্তর্জাতিক সমর্থন জোট গঠনের চেষ্টা করছে। কিন্তু বিশ্বের সব বড় শক্তি এই সংঘাতে একই অবস্থান নেয়নি। রাশিয়া ও চীন পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং কূটনৈতিকভাবে যুদ্ধের সমালোচনা করছে। তারা সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তাদের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ভূমিকা যুদ্ধের সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
এই সব বাস্তবতা মিলিয়ে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন বর্তমান সংঘাত শুধু একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়। এটি একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যেখানে সামরিক শক্তি, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি একসঙ্গে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও ইরানের বিকেন্দ্রীকৃত প্রতিরক্ষা কাঠামো, সস্তা কিন্তু কার্যকর অস্ত্র এবং আঞ্চলিক মিত্রদের উপস্থিতি যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্নটি আবারও সামনে আসে। যুক্তরাষ্ট্র কি এমন একটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে যেখানে দ্রুত বিজয় অর্জন করা কঠিন এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৌশলগত চাপ বাড়তে পারে। এর উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ইতিহাস, নতুন সামরিক কৌশল এবং বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন যে এই সংঘাত ভবিষ্যতে বিশ্ব রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়