একটি রাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন কিছু শব্দ থাকে, যেগুলো কেবল অভিধানের শব্দ নয়—তারা হয়ে ওঠে একটি সময়ের প্রতীক। বাংলাদেশের জন্য ‘গুম’ তেমনই একটি শব্দ। এই একটি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে অসংখ্য পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষা, মায়ের অশ্রু, সন্তানের নির্ঘুম রাত, স্ত্রীর অনিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের এক গভীর প্রশ্ন—‘আমার মানুষটি কোথায়?’
একটি সভ্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতায় নয়; তার শক্তি নিহিত থাকে এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সক্ষমতায়। কারণ রাষ্ট্রের কাছে একজন নাগরিক কখনোই নিখোঁজ একটি সংখ্যা নয়, তিনি একজন মানুষ, যার জীবন, স্বাধীনতা ও মর্যাদা সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন দ্বারা সুরক্ষিত।
সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একজন ব্যক্তিকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার অভিযোগ এবং সে বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য আবারও আমাদের এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে, যেখান থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল। অভিযোগটি সত্য কিনা, সেটি অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের বিষয়। কিন্তু অভিযোগটি উঠেছে—এই বাস্তবতাই রাষ্ট্রের জন্য গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ মানবাধিকার প্রশ্নে রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব অভিযোগকে অস্বীকার করা নয়; বরং অভিযোগের দ্রুত, স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করা।
বাগেরহাট জেলার মোংলার জয়মণি গ্রামের ৩০ বছর বয়সী মিরাজ শেখকে ঘিরে সাম্প্রতিক অভিযোগটি সে কারণেই গভীর উদ্বেগের। পরিবারের দাবি, গত ১০ এপ্রিল কোস্ট গার্ড পরিচয়ে আসা ব্যক্তিরা তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও তাঁর কোনও সন্ধান মেলেনি। নিখোঁজের পর ২১ এপ্রিল তাঁর স্ত্রী মুক্তা খানম থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, জিডির পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধান চলছে। একইসঙ্গে তিনি বলেছেন, কোস্ট গার্ডের মাধ্যমে তুলে নেওয়ার অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনও প্রমাণ তাঁদের হাতে আসেনি এবং কোস্ট গার্ড থেকেও এমন কোনও তথ্য জানানো হয়নি।
অপরদিকে, মুক্তা খানম হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছেন, নিখোঁজ হওয়ার দিন স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি কোস্ট গার্ডের একটি পন্টুনে গিয়ে তাঁর স্বামীকে আটক অবস্থায় দেখেন। তাঁর দাবি, পরে স্পিডবোটে করে মিরাজকে হাড়বাড়িয়া ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।
মিরাজের বোনও অভিযোগ করেছেন, তাঁর ভাইয়ের মোটরসাইকেল কোস্ট গার্ডের সদস্যরাই নিয়ে গিয়েছিলেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই ঘটনাকে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে প্রথম গুমের অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এই ঘটনায় কার বক্তব্য সঠিক, তা তদন্তেই নির্ধারিত হবে। কিন্তু এখানে মূল প্রশ্নটি অন্যত্র।
গুমের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠলে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারগত দায়িত্ব হলো অভিযোগটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত, স্বাধীন ও কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করা। কারণ তদন্তের উদ্দেশ্য কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষা নয়, সত্য উদ্ঘাটন।
বাংলাদেশে গুমের ইতিহাস এখন আর কেবল মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনের বিষয় নয়, এটি জাতীয় বিবেকের অংশ। বহু বছর ধরে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ, আদালতের পর্যবেক্ষণ, গণমাধ্যমের অনুসন্ধান এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সাক্ষ্য আমাদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল—অতীতের সেই অধ্যায়ের অবসান ঘটবে। রাষ্ট্র এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে, যেখানে শুধু গুমই বন্ধ হবে না, গুমের অভিযোগ ওঠার মতো পরিস্থিতিও আর সৃষ্টি হবে না।
দুঃখজনকভাবে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রবণতা ছিল—গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেই প্রথম প্রতিক্রিয়া হতো অস্বীকার, পরে ব্যাখ্যা, আর তদন্ত আসতো অনেক পরে। অথচ একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রের আচরণ হওয়া উচিত সম্পূর্ণ ভিন্ন। অভিযোগ উঠলে প্রথমেই প্রমাণ সংরক্ষণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সুরক্ষিত রাখা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত শুরু করা জরুরি। কারণ সত্যকে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের থাকতে পারে না।
বাংলাদেশ গুম প্রতিরোধে আইনগত উদ্যোগ নিয়েছে, যা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে আইন প্রণয়নই শেষ কথা নয়, তার কার্যকর বাস্তবায়নই মূল বিষয়। বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলে, শক্তিশালী আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন তার সঙ্গে থাকে প্রকৃত জবাবদিহি।
রাষ্ট্রের বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন মুক্তা খানমের সেই বক্তব্য, যেখানে তিনি দাবি করেছেন যে কোস্ট গার্ডের একটি পন্টুনে তিনি তাঁর স্বামীকে আটক অবস্থায় দেখেছিলেন। এই দাবি সত্য কিনা, তা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তে নির্ধারিত হবে। কিন্তু অভিযোগটির গুরুত্ব বিবেচনায় এ বক্তব্য উপেক্ষা করার কোনও সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট পন্টুনের দায়িত্বরত সদস্যদের বক্তব্য, ডিউটি রোস্টার, জাহাজ বা স্পিডবোটের চলাচলের রেকর্ড, প্রবেশ ও বহির্গমন নিবন্ধন, সিসিটিভি ফুটেজ (যদি থাকে) এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য দ্রুত সংরক্ষণ ও যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
একইসঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান থাকবে, মিরাজ শেখকে উদ্ধার এবং তাঁর অবস্থান শনাক্ত করার জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের আইনসম্মত ও কার্যকর ব্যবস্থা অবিলম্বে গ্রহণ করা হোক। তাঁকে উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান চালাতে হবে। আর যদি তদন্তে কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তাঁর পরিচয় বা পদমর্যাদা নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বাংলাদেশের মানুষ এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে কোনও মা তাঁর সন্তানের খোঁজে বছরের পর বছর অপেক্ষা করবেন না, কোনও শিশু বাবার ফিরে আসার আশায় দরজার দিকে তাকিয়ে থাকবে না, আর কোনও পরিবারকে রাষ্ট্রের কাছে এই প্রশ্নটি করতে হবে না—আমার মানুষটি কোথায়?
লেখক: মানবাধিকার কর্মী




