অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সাম্প্রতিক বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতারের বক্তব্য নতুন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। তিনি জানিয়েছেন, চুক্তির কিছু শর্ত, বিশেষত গবাদিপশু, মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানির বিষয়ে তিনি আপত্তি জানিয়েছিলেন। তার যুক্তি ছিল, এ ধরনের শুল্কমুক্ত আমদানি দেশের ক্ষুদ্র খামারিদের অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং একইসঙ্গে জনস্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই উদ্বেগগুলো অমূলক নয়। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় অংশ গরু-ছাগল ও পোলট্রি খামারের ওপর নির্ভরশীল। লক্ষাধিক ক্ষুদ্র খামারি, গ্রামীণ নারী ও উদ্যোক্তা এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতির একটি মৌলিক নীতি হলো— দেশীয় উৎপাদকদের অযৌক্তিক ক্ষতির মুখে ঠেলে না দেওয়া। কাজেই, শুল্কমুক্ত আমদানি যদি স্থানীয় উৎপাদকদের প্রতিযোগিতার বাইরে ঠেলে দেয়, তবে তা নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
তবু প্রশ্নটি এখানেই শেষ হয় না। বরং এখানেই মূল প্রশ্নের শুরু। যদি একজন দায়িত্বশীল উপদেষ্টা সত্যিই মনে করেন যে, একটি চুক্তি দেশের কৃষি, প্রাণিসম্পদ বা জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর, তাহলে তিনি কেন তা ঠেকাতে পারলেন না? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— তার আপত্তি কতটা জোরালো ছিল এবং সেটি সরকারের অভ্যন্তরে কতটা গুরুত্ব পেয়েছিল?
সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। বিশেষত একটি বহুমাত্রিক বাণিজ্যচুক্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা উপদেষ্টার ভিন্ন মত থাকতে পারে। কিন্তু নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনও আপত্তি থাকলে তা কেবল একটি প্রশাসনিক নোট বা সীমিত বৈঠকের মন্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকে না— তা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে শক্তভাবে উপস্থাপিত হয়। প্রয়োজন হলে বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়, আলোচনার সময় নতুন শর্ত আরোপের চেষ্টা করা হয়, এমনকি সিদ্ধান্ত স্থগিত করার দাবিও তোলা হয়।
এখানেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে-উপদেষ্টা পরিষদের ভেতরে কি সত্যিই এমন পরিবেশ ছিল, যেখানে একজন উপদেষ্টা তার মতামত স্বাধীনভাবে তুলে ধরতে পারতেন? যদি এমন পরিবেশ না থাকে, তবে সেটি শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়, বরং তা শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি অন্তর্বর্তী সরকার মূলত গণতান্ত্রিক আস্থার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। সেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নীতিগত বিতর্কের সুযোগ না থাকলে সেই আস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
অপরদিকে, যদি ধরে নেওয়া হয় যে, মতামত দেওয়ার সুযোগ ছিল, তাহলে প্রশ্নটি অন্য দিকে মোড় নেয়। সে ক্ষেত্রে কেন আপত্তিটি শেষ পর্যন্ত নীতিগত সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হলো না? বাণিজ্যনীতি সাধারণত অর্থনীতি, কূটনীতি এবং কৌশলগত সম্পর্কের সমন্বয়ে নির্ধারিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে আলোচনায় অনেক সময় সমঝোতার চাপ থাকে— এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তি কোনও একতরফা দলিল হওয়ার কথা নয়, সেখানে পারস্পরিক স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রাখাই মূল লক্ষ্য।
এখানে আরেকটি নৈতিক প্রশ্নও উত্থাপিত হয়। যদি একজন উপদেষ্টা বিশ্বাস করেন যে, কোনও সিদ্ধান্ত জনগণের স্বার্থবিরোধী, তবে তার সামনে সাধারনভাবে দুটি পথ খোলা থাকে। প্রথমত, তিনি সরকারের ভেতরে থেকেই দৃঢ়ভাবে তার অবস্থান তুলে ধরতে পারেন এবং সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, যদি সেটি সম্ভব না হয় এবং সিদ্ধান্তটি তার নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তবে তিনি প্রতিবাদের পথ হিসেবে পদত্যাগ করতে পারেন। ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ আছে, যেখানে নীতিগত আপত্তির কারণে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা পদত্যাগ করেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে ফরিদা আখতারের সাম্প্রতিক বক্তব্য একটি দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেছেন যে, তিনি আপত্তি তুলেছিলেন, কিন্তু চুক্তির কাঠামো এমন ছিল যে পরিবর্তনের সুযোগ ছিল না। যদি সত্যিই তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন হলো— এই বাস্তবতা তিনি তখনই কেন জনসমক্ষে তুলে ধরেননি? একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার অংশ।
অবশ্য এটাও সত্য যে, সরকারের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় অনেক সময় কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। কিন্তু দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর যখন বিষয়টি সামনে আসে, তখন শুধু ব্যক্তিগত উদ্বেগ প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়, বরং প্রয়োজন পুরো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা।
মূলত এই ঘটনাটি আমাদের সামনে বৃহত্তর একটি প্রশ্ন তুলে ধরে—বাংলাদেশে নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়া কতটা অংশগ্রহণমূলক এবং জবাবদিহিমূলক? আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তি কেবল অর্থনীতির বিষয় নয়— এটি কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং সামাজিক কাঠামোর সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। কাজেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট সব খাতের মতামত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, ফরিদা আখতারের বক্তব্য আমাদের শুধু একটি চুক্তির ভেতরের দ্বন্দ্ব নয়, বরং শাসনব্যবস্থার একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে— নীতিগত আপত্তি কি সত্যিই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে, নাকি তা কেবল ইতিহাসের ফুটনোট হয়ে থাকে !
লেখক: মানবাধিকার কর্মী