মার্কিন-ইরান যুদ্ধ ও বিপন্ন বিশ্ব

২০২৬ সালের সেই অভিশপ্ত ফেব্রুয়ারি মাসটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক কালান্তক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, যখন দীর্ঘ চার দশকের পুঞ্জীভূত বারুদ শেষ পর্যন্ত এক মহাবিস্ফোরণে রূপ নিলো। ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই ভোরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলা কেবল ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোকে গুঁড়িয়ে দেয়নি, বরং কয়েক দশকের তথাকথিত ‘কৌশলগত ধৈর্য’ বা স্ট্র্যাটেজিক পেশেন্সের অবসান ঘটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে এক অন্তহীন আগ্নেয়গিরিতে পরিণত করেছে। এই যুদ্ধ কোনও আকস্মিক দুর্ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল এক অনিবার্য ভূ-রাজনৈতিক সংঘর্ষের চূড়ান্ত পরিণতি। যখন তেহরানের আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেল এবং হরমুজ প্রণালিকে ইরান একটি দুর্ভেদ্য জলবন্দি খাঁচায় পরিণত করলো— তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, এই যুদ্ধ কেবল দুটি অঞ্চলের সীমান্ত লড়াই নয়, বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার এক মরণপণ লড়াই।

এই সংঘাতের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটি এখন ওয়াশিংটনের রিপাবলিকান প্রশাসনের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকটে রূপ নিয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ‘লিমিটেড এনগেজমেন্ট’ বা সীমিত অংশগ্রহণের নীতি মেনে চললেও, ২০২৬-এর এই যুদ্ধ তাদের সেই কৌশলের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের জন্য আসল পরীক্ষাটি কেবল রণাঙ্গনে বিজয় নয়, বরং অভ্যন্তরীণ জনমত এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখা। যুদ্ধের শুরুতে যে জাতীয়তাবাদের উন্মাদনা দেখা গিয়েছিল, তেলের দাম লিটার প্রতি আকাশচুম্বী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ক্ষোভে পরিণত হচ্ছে। মার্কিন নাগরিকদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— হাজার মাইল দূরের একটি আদর্শিক লড়াইয়ের জন্য কেন তাদের পকেট খালি করতে হবে? হোয়াইট হাউসের জন্য এটি এক মরণপণ দোটানা, একদিকে ইসরায়েলের মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রকে রক্ষা করার নৈতিক দায়বদ্ধতা, অপরদিকে অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি সামাল দিয়ে আসন্ন নির্বাচনে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা। যদি এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ওয়াশিংটনকে হয়তো ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের চেয়েও বড় কোনও রাজনৈতিক পরাজয়ের গ্লানি বইতে হতে পারে।

এই সংঘাতের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো এর অপ্রতিসম চরিত্র। প্রথাগত যুদ্ধের ব্যাকরণ মেনে এটি কেবল সেনাবাহিনীতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সাইবার হামলা, ড্রোন যুদ্ধ এবং জ্বালানি জিম্মি করার মাধ্যমে এটি প্রতিটি সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে ইরান কার্যত বিশ্ব অর্থনীতির নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছে। তেলের দাম যখন ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলার স্পর্শ করল, তখন ওয়াশিংটন বা তেহরানের চেয়েও বেশি আর্তনাদ শোনা গেল ঢাকা, কলম্বো কিংবা কায়রোর মতো শহরগুলোতে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই যুদ্ধ এক অস্তিত্ব রক্ষার সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভৌগোলিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে হাজার মাইল দূরে থাকলেও অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এই অঞ্চলের সঙ্গে এক অদৃশ্য নাড়ির টানে যুক্ত। কাতার ও সৌদি আরব থেকে আসা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি যখন হরমুজ প্রণালির গোলকধাঁধায় আটকে গেল, তখন বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চলগুলো স্থবির হয়ে পড়তে শুরু করলো। আমাদের মতো দেশগুলো যারা আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর ভিত্তি করে নিজেদের মধ্যম আয়ের স্বপ্ন বুনেছিল, তাদের জন্য এই যুদ্ধ এক রূঢ় বাস্তবতা নিয়ে এসেছে। লোডশেডিং কেবল একটি সাময়িক অসুবিধা নয়, এটি আমাদের উৎপাদনশীলতা এবং রফতানি সক্ষমতার ওপর এক মারণাঘাত।

এই যুদ্ধের ভয়াবহতা এখন সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে ‘গলফ রিজিয়ন’ বা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে। এক সময় যা ছিল বিশ্বের জ্বালানি ভাণ্ডার, আজ তা এক বিশাল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতের মতো স্থিতিশীল রাজতন্ত্রগুলো এখন এক অস্তিত্ব সংকটের মুখে। ইরান ও তার প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো যখন সৌদি তেলের খনি ও দুবাইয়ের মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে, তখন পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল। এর ফলে কাতার বা কুয়েতের মতো দেশগুলো চাইলেও তাদের জ্বালানি বাজারে পাঠাতে পারছে না। উপসাগরীয় অঞ্চলের এই অস্থিরতা প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক বিশ্বের নিরাপত্তা কতটা ভঙ্গুর এবং একটি অঞ্চলের সংঘাত কীভাবে পুরো পৃথিবীকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দিতে পারে

এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ বা ‘এন্ড গেম’ বিশ্লেষণ করতে গেলে আমাদের তিনটি সম্ভাব্য মেরুকরণের দিকে তাকাতে হয়। প্রথমত, একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ বা ‘অ্যাটট্রিশন ওয়ার’। ইরান যদি তার প্রচলিত সামরিক শক্তির বদলে তাদের ‘প্রতিরোধ বলয়’ বা প্রক্সি নেটওয়ার্ককে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে দেয়, তবে এই যুদ্ধের কোনও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা থাকবে না। লেবানন থেকে ইয়েমেন এবং ইরাক থেকে সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই রণক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হয়তো প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকবে, কিন্তু প্রতিটি গলিতে বা পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা গেরিলা যোদ্ধাদের দমানো হবে অসম্ভব। দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি হলো একটি ‘বিপর্যয়কর সমঝোতা’। যখন মার্কিন প্রশাসন দেখবে যে তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে ধসে পড়ছে এবং অপরদিকে ইরান যদি তাদের শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার শেষ প্রান্তে পৌঁছে যায়, তখনই কেবল আলোচনার টেবিল গুরুত্ব পাবে। তবে এই চুক্তির শর্ত হবে অত্যন্ত রূঢ়, যা হয়তো কোনও পক্ষকেই পূর্ণ তৃপ্তি দেবে না।

ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৬-এর এই সংঘাতের ফলে রাশিয়া ও চীন মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব বলয় আরও মজবুত করার সুযোগ পাবে। ওয়াশিংটন যখন সামরিকভাবে এখানে আটকা পড়বে, তখন বেইজিং তার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক জাল বিস্তার করে এই অঞ্চলের নতুন অভিভাবক হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এটি বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন একাধিপত্যের সূর্যাস্ত এবং একটি বহুমুখী বা ‘মাল্টিপোলার’ বিশ্বের চূড়ান্ত উদ্বোধন ঘটাবে। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর জন্য এই যুদ্ধের শেষ বা ভবিষ্যৎ অত্যন্ত ধূসর। আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। পরিশেষে, ২০২৬-এর এই মহাযুদ্ধের কোনো সহজ বা আনন্দদায়ক পরিসমাপ্তি নেই। এই প্রলয় যদি আজ থামেও, তার ক্ষতচিহ্ন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির যে ভাঙন শুরু হয়েছে, তা মেরামত করতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর সময় লেগে যাবে। মার্কিন প্রশাসনের জন্য এটি কেবল একটি যুদ্ধ নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে তাদের টিকে থাকার এক চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর