বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ নেই, কিন্তু মৃত্যুর দৌড়ে সবার আগে 

চিররঞ্জন সরকার
২১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০

বিশ্বকাপ ফুটবল এ দেশের মানুষের কাছে শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং ঝগড়া-মারামারির মৌসুম। এ প্রতিযোগিতায় আমাদের সাফল্য অবশ্য ঈর্ষণীয়। আমরা এখনও বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিতে পারিনি, কিন্তু বিশ্বকাপকে ঘিরে প্রাণহানির খবরে প্রায়ই শিরোনাম হতে পেরেছি। যে টুর্নামেন্টে ৯৫ বছরেও একটি ম্যাচ খেলতে পারিনি, সেই টুর্নামেন্টের সমর্থন করতে গিয়ে মানুষ মারা যাওয়ার নজির গড়তে আমাদের জুড়ি নেই। মাঠে গোল করে না ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা—গোলমাল করি আমরা। ট্রফি ওঠে অন্য দেশের অধিনায়কের হাতে, আর লাশ ওঠে আমাদের কাঁধে। ফিফার র‌্যাঙ্কিংয়ে আমাদের নাম খুঁজে পেতে কষ্ট হয়, কিন্তু ফুটবল-উন্মাদনায় আত্মঘাতী আচরণের কোনও র‌্যাঙ্কিং থাকলে, হয়তো আমরা বহু আগেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে যেতাম। এ এক বিচিত্র অর্জন—যে বিশ্বকাপে আমাদের কোনও দল নেই, সেই বিশ্বকাপেই মৃত্যুর মিছিলে আমরা সবচেয়ে সক্রিয় সমর্থক।

এই প্রতিযোগিতার একমাত্র ট্রফি হলো শোক, আর একমাত্র পদক—একটি কফিন। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে গৌরবের চেয়ে হতাশার অধ্যায়ই বেশি। জাতীয় দল কবে বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব থেকে বিদায় নেয়, অনেকেই খবরও রাখেন না। দেশের লিগে দর্শক নেই, মাঠে ঘাস নেই, ক্লাবে অর্থ নেই, খেলোয়াড়ের ভবিষ্যৎ নেই। কিন্তু বিশ্বকাপ এলেই যেন বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্র থেকে মুছে গিয়ে লাতিন আমেরিকার কোনও প্রদেশে পরিণত হয়! ময়মনসিংহের মানুষ নিজেকে বুয়েনস আইরেসের নাগরিক ভাবেন, বরিশালের কেউ বিশ্বাস করেন তাঁর জন্ম রিও ডি জেনিরোতে হওয়ার কথা ছিল। পাসপোর্টে বাংলাদেশ লেখা থাকলেও আবেগের নাগরিকত্ব অনেক আগেই বিদেশে হস্তান্তর করা হয়েছে!

বিশ্বকাপের সময় দেশের রাস্তাঘাটও যেন স্বাধীন পরিচয় হারায়। বাংলাদেশের পতাকার চেয়ে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, পর্তুগাল কিংবা ফ্রান্সের পতাকাই বেশি চোখে পড়ে। এমনভাবে পতাকা উড়ে, যেন জাতিসংঘ সদর দফতর ভুল করে কুষ্টিয়া, কুমিল্লা বা নরসিংদীতে চলে এসেছে। যে মানুষটি নিজের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নাম জানেন না, তিনিই অনর্গল বিশ্লেষণ করেন আর্জেন্টিনার মিডফিল্ড বা ব্রাজিলের ফর্মেশন। নিজের দেশের অধিনায়ক কে, তা জানার আগ্রহ নেই—কিন্তু মেসি, রোনালদো কিংবা নেইমারের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এমন পাণ্ডিত্য, যেন সেটাই বিসিএসের সিলেবাস।

এরপর শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গৃহযুদ্ধ। ফুটবল আর খেলা থাকে না, ধর্মে পরিণত হয়। মেসির সমালোচনা করলে রাষ্ট্রদ্রোহীর মতো বিচার, রোনালদোকে নিয়ে ঠাট্টা করলে মানবতাবিরোধী অপরাধের আসামি।

পৃথিবীর অন্য প্রান্তে খেলোয়াড়েরা ম্যাচ শেষে একে অপরকে আলিঙ্গন করেন, জার্সি বিনিময় করেন—আর বাংলাদেশে তাঁদের সমর্থকেরা একে অপরের রক্ত ঝরান। মাঠে খেলা শেষ হয় ৯০ মিনিটে, আমাদের উন্মাদনা শেষ হয় থানার জিডি, হাসপাতালের বেড কিংবা কবরস্থানে।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, আমরা মৃত্যুকেও ফুটবল উৎসবের অংশ বানিয়ে ফেলেছি। কেউ পতাকা টানাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন, কেউ বহুতল থেকে পড়ে যান, কেউ খেলা দেখতে গিয়ে হৃদরোগে মারা যান, কেউ আবার প্রিয় দল হেরে যাওয়ায় আত্মহত্যা করেন। একজন মানুষ তাঁর পরিবার, স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ—সব কিছু বিসর্জন দেন এমন একটি দলের জন্য, যে দল তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কেই কিছু জানে না। যে দেশের হয়ে তিনি মরতে প্রস্তুত, সেই দেশের কোনও নাগরিক তাঁর নামও কোনও দিন শুনবে না।

কুমিল্লার অটোচালক শরিফুল ইসলামের হত্যাকাণ্ড এই উন্মাদনার সবচেয়ে নির্মম প্রতীক। একজন মানুষ ফুটবল নিয়ে একটি মন্তব্য করেছিলেন। তিনি কারও সম্পদ লুট করেননি, রাষ্ট্রের ক্ষতি করেননি, কারও জীবন নেননি। তবু তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো। ভাবুন, লিওনেল মেসি যদি জানতেন, তাঁর একটি ম্যাচ নিয়ে ঠাট্টার জেরে বাংলাদেশে একজন মানুষ খুন হয়েছেন, তিনিও হয়তো বিশ্বাস করতে পারতেন না। কারণ মেসি ফুটবল খেলেন; আমরা ফুটবলকে যুদ্ধ বানাই।

বিস্ময়কর হলো, যাঁদের জন্য এই যুদ্ধ, তাঁদের কিছুই যায় আসে না। ব্রাজিল হারলে নেইমার পরিবার নিয়ে ছুটি কাটান, আর্জেন্টিনা জিতলে মেসি সন্তানকে নিয়ে হাঁটতে বের হন, রোনালদো হারলেও পরদিন অনুশীলনে ফিরে যান। কিন্তু বাংলাদেশে তখন কেউ ঘোষণা দেন— ‘আজ থেকে সম্পর্ক শেষ’, কেউ লেখেন, ‘আজ রক্ত ঝরবে’, কেউ বন্ধুত্ব ভাঙেন, কেউ জীবনই শেষ করে দেন। বিদেশি খেলোয়াড়ের জয়-পরাজয় আমাদের কাছে ব্যক্তিগত সম্মান-অপমানের প্রশ্ন, অথচ নিজের দেশের ফুটবলের পরাজয় যেন জাতীয় অভ্যাস।

এই বৈপরীত্যই সবচেয়ে করুণ। আমরা ফুটবল উন্নয়নের জন্য মাঠ বানাতে চাঁদা তুলি না, কিন্তু বিদেশি দলের বিশাল পতাকা বানাতে লাখ লাখ টাকা খরচ করি। স্কুলে কোচ নেই, উপজেলা পর্যায়ে অবকাঠামো নেই, স্থানীয় ক্লাব বাঁচতে হিমশিম খায়—কিন্তু বিদেশি দলের সমর্থক সংগঠনের সদস্যসংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায়। মনে হয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানি পণ্য হলো ধার করা পরিচয়, আর সবচেয়ে বড় রপ্তানি পণ্য অন্ধ আবেগ।

মনোবিজ্ঞানীরা একে পরিচয়ের সংকট বলেন। নিজের অর্জন কম হলে মানুষ অন্যের সাফল্যকে নিজের পরিচয় বানিয়ে নেয়। তাই আর্জেন্টিনার জয়কে নিজের জয়, ব্রাজিলের হারকে নিজের অপমান মনে হয়। অথচ আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের কোনও নাগরিক জানেনই না, বাংলাদেশের কোনও গ্রামে তাঁদের জন্য একজন মানুষ সারা রাত কেঁদেছেন, কিংবা প্রাণ হারিয়েছেন।

সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো, বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই উন্মাদনারও মৃত্যু ঘটে। যে পতাকা টানাতে গিয়ে একজন মানুষ প্রাণ হারালেন, কয়েক সপ্তাহ পর সেই পতাকাই বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে, ধুলো মেখে কোনও ছাদের কোনায় কিংবা বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ঝুলতে থাকে। যে বন্ধুত্ব ফুটবল বিতর্কে ভেঙে গিয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা আবার জোড়া লাগে। ফেসবুকের কমেন্ট যুদ্ধ থেমে যায়, প্রোফাইল ছবির ফ্রেম বদলে যায়, নতুন ইস্যু এসে পুরোনো উত্তেজনাকে গ্রাস করে। শুধু ফিরে আসে না কয়েকটি প্রাণ। কয়েকটি পরিবারের ক্যালেন্ডারে বিশ্বকাপ আর চার বছর পরপর আসা একটি উৎসব নয়—বরং একটি স্থায়ী শোকের তারিখ। মেসি জানেন না, রোনালদোও জানেন না—কিন্তু বাংলাদেশের কোনও এক মা জানেন, ফুটবল কখনও তাঁর সন্তানকে ফিরিয়ে দেবে না। কোনও এক শিশুর কাছে বিশ্বকাপ মানে আর গোলের উল্লাস নয়, বাবার শূন্য চেয়ার। কোনও এক স্ত্রীর কাছে ফুটবল মানে আর খেলার আনন্দ নয়, অসমাপ্ত একটি সংসার।

আসলে সমস্যাটা ফুটবলে নয়, সমস্যাটা আমাদের ফুটবল দেখার সংস্কৃতিতে। আমরা খেলাকে খেলা থাকতে দিইনি— তাকে ধর্ম বানিয়েছি, পরিচয়ের ব্যাজ বানিয়েছি, অহংকারের অস্ত্র বানিয়েছি। যে খেলার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত ছিল সৌহার্দ্য, সহনশীলতা আর প্রতিদ্বন্দ্বীকে সম্মান করার মানসিকতা, সেই খেলাকেই আমরা ঘৃণা, বিদ্বেষ আর সহিংসতার বাহনে পরিণত করেছি। আমরা প্রিয় দলের জয়কে ব্যক্তিগত বিজয় আর পরাজয়কে ব্যক্তিগত অপমান মনে করি। ফলে খেলার বাঁশি শেষ হলেও আমাদের রাগের বাঁশি বাজতেই থাকে। মাঠে বিশ্বমানের ফুটবল খেলতে পারিনি, কিন্তু ফুটবলকে কেন্দ্র করে নিজেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার অদ্ভুত দক্ষতা আমরা অর্জন করেছি।

ফিফা হয়তো কোনও দিন বাংলাদেশের নাম বিশ্বকাপের ট্রফিতে খোদাই করবে না। ইতিহাসও হয়তো আমাদের ফুটবল সাফল্যের জন্য মনে রাখবে না। কিন্তু যদি ‘ফুটবল-উন্মাদনায় আত্মঘাতী আচরণ’, ‘তুচ্ছ কারণে সহিংসতা’ কিংবা ‘সমর্থনের নামে আত্মবিনাশ’—এমন কোনও বিশ্ব প্রতিযোগিতা থাকত, তাহলে আমাদের বাছাইপর্ব খেলতে হতো না; সরাসরি ফাইনালে জায়গা মিলতো। কারণ ফুটবলে আমরা বিশ্বমানের নই, কিন্তু ফুটবলকে কেন্দ্র করে নিজেরাই নিজেদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠার শিল্পে আমরা বহু আগেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। আর এই চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফি কোনও সোনার কাপ নয়—এটি কয়েকটি কবর, কয়েকটি অনাথ সন্তান, কয়েকটি আজীবন নিঃসঙ্গ মা, আর একটি জাতির বারবার একই ভুল থেকে শিক্ষা নিতে না পারার নির্মম স্মারক!

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
স্ত্রী ছেড়ে যাওয়ায় বাবাকে পিটিয়ে হত্যা করলো ছেলে
স্ত্রী ছেড়ে যাওয়ায় বাবাকে পিটিয়ে হত্যা করলো ছেলে
ব্যবসায়ীকে মারধর করে দোকান বন্ধের হুমকি, পদ হারালেন শ্রমিক দল নেতা
ব্যবসায়ীকে মারধর করে দোকান বন্ধের হুমকি, পদ হারালেন শ্রমিক দল নেতা
মন্ত্রিসভার রদবদল নিয়ে যা বললেন ডা. জাহেদ
মন্ত্রিসভার রদবদল নিয়ে যা বললেন ডা. জাহেদ
ইরান যুদ্ধে অর্থ সংকটে যুক্তরাষ্ট্র, ফুরিয়ে যাচ্ছে তহবিল
ইরান যুদ্ধে অর্থ সংকটে যুক্তরাষ্ট্র, ফুরিয়ে যাচ্ছে তহবিল
সর্বশেষসর্বাধিক