ঢেঁকি নাকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। আর বাঙালি? সে আমেরিকায় গেলেও ‘বাঙালিগিরি’ ছাড়ে না। তবে এই ‘বাঙালিগিরি’ হিমালয়জয়ী সাফল্যের নয়, বরং হোমল্যান্ড সিকিউরিটির লাল তালিকায় নাম তোলার। আমরা সাধারণত বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশিদের সাফল্যের গল্প শুনতে ভালোবাসি। কেউ নাসা-তে রকেট বানাচ্ছে, কেউ গুগল-এ কোড লিখছে, কেউবা হার্ভার্ডে লেকচার দিচ্ছে—এসব শুনে আমরা ৫৬ ইঞ্চি বুক ফুলিয়ে বলি,’দেখো, বাঘের বাচ্চা কাকে বলে!’ কিন্তু এমন খবর এখন খুব বেশি আসে না। বরং বেশিরভাগ সময় এমন কিছু খবর আসে, যেখানে বুক ফুলানো তো দূরের কথা, লজ্জায় বুকটা হঠাৎ করেই রিফ্লেক্স অ্যাকশনের মতো ভেতরে ঢুকে যায়। তখন মনে হয়, আমরা কি সত্যিই বিশ্বজয় করছি, নাকি বিশ্বমঞ্চে ‘ক্রাইম থ্রিলার’-এর নতুন কোনও স্ক্রিপ্ট লিখছি?
অবশ্য আমাদের এখন আর লজ্জায় মাথা হেঁট হয় না। হবেই বা কী করে? লজ্জায় মাথা হেঁট হতে হতে আমাদের মাথা যে অনেক আগেই মাটির কয়েক স্তর নিচে গিয়ে খনিজ পদার্থের সঙ্গে মিশে গেছে! সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) এমনই এক তালিকা প্রকাশ করেছে— ‘ওয়ার্স্ট অব দ্য ওয়ার্স্ট’ বা খারাপের চেয়েও খারাপ অপরাধীদের তালিকা। সেখানে সগৌরবে জায়গা করে নিয়েছেন আমাদের ১০ জন দেশি ভাই। নাম-পরিচয়সহ তাদের ছবি এমনভাবে প্রকাশ করা হয়েছে, যেন বিশ্ববাসী বুঝতে পারে— এরা কেবল গলি ক্রিকেটের প্লেয়ার নয়, এরা একেকজন ‘গ্লোবাল প্লেয়ার’। পার্থক্য শুধু একটাই, এরা সিলিকন ভ্যালিতে অ্যাপ বানায় না, এরা বানায় অপরাধের নিত্যনতুন ফাঁদ।
আমরা এমন এক বিচিত্র জাতি, যারা নেতিবাচকতা থেকেও ইতিবাচক ‘গর্ব’ চিপে বের করতে ওস্তাদ। কেউ কেউ হয়তো ইতোমধ্যেই ক্যালকুলেটর নিয়ে হিসাব কষে ফেলেছেন— প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিযানে ৪ লাখ অবৈধ অভিবাসী ধরা পড়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশি মাত্র ১০ জন! শতাংশের হিসাবে তো আমরা গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়ার মতো ভালো অবস্থায় আছি! এই যুক্তি শুনে মনে পড়ে, পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের মধ্যে ৫ নম্বর পেয়ে কোনও এক চাপাবাজ ছাত্র বলছে, ‘আব্বা, আমি তো অন্তত ফেল করা হাজার হাজার ছাত্রদের মধ্যে টপ টেনে আছি!’ এই ‘আত্মসান্ত্বনার গণিত’ আমাদের জাতীয় প্রতিভারই এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।
ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) জানিয়েছে, এই বিশাল অভিযানে ৫৬ হাজার গুরুতর দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী ধরা পড়েছে। সেই ভিড়ের মধ্যে আমাদের এই ১০ জন যেন একেকটি ‘বিশেষ প্রতিনিধি’। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য তাদের এই অবদান অনস্বীকার্য— অবশ্যই তা আক্ষরিক অর্থে নয়, বরং কলঙ্কের কালিতে। তালিকার অপরাধগুলো দেখলে মনে হয়— এরা যেন কোনও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ক্রাইম সিরিজের জন্য অডিশন দিতে গিয়েছিলেন। শিশু নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, ড্রাগ ডিলিং, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, সশস্ত্র ডাকাতি— কী নেই সেখানে! যেন কেউ একটা চেকলিস্ট ধরিয়ে দিয়ে বলেছে, ‘বাবা, যত রকমের পাপ আছে, সবগুলোতে একটু করে আঙুল ছোঁয়াও, বৈচিত্র্য না থাকলে লোকে খাবে না!’ এই ‘মাল্টি-টাস্কিং’ প্রতিভা আমাদের দেশের কোনও বিশেষ কোচিং সেন্টারের অবদান কিনা, তা নিয়ে উচ্চতর গবেষণা হতেই পারে।
চলুন, আমাদের এই ‘অ্যাভেঞ্জার্স’ টিমের সদস্যদের কীর্তি একটু খতিয়ে দেখি। কাজী আবু সাঈদ সাহেব ক্যানসাসের মতো শান্ত জায়গায় গিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্কদের খারাপ কাজে নামিয়ে জুয়ার বোর্ড সাজিয়েছেন। শাহেদ হাসান আবার একটু ক্ল্যাসিক চোর—অস্ত্রও রাখেন, আবার দোকান থেকে ছোটখাটো চুরিও করেন। মোহাম্মদ আহমেদ ও এমডি হোসেন সাহেবরা নিউইয়র্কের ব্যস্ততায় যৌন অপরাধের মতো জঘন্য কাজে সময় বের করে নিয়েছেন। মাহতাবউদ্দিন আহমেদ ও নেওয়াজ খান আবার ‘ফার্মাসিউটিক্যালস’ সেক্টরে আগ্রহী— তবে সেটা গাঁজা আর হ্যালুসিনোজেনিক মাদকের। শাহরিয়ার আবির চুরিতে বিশ্বাসী, আলমগীর চৌধুরী ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির ‘টেকনিক্যাল’ গুরু, ইশতিয়াক রাফি অস্ত্র ও সিন্থেটিক মাদকের কম্বো প্যাক নিয়ে চলেন, আর কনক পারভেজ প্রতারণায় পিএইচডি করেছেন। এত বৈচিত্র্য! এরা সবাই মিলে যদি একটা স্টার্টআপ খুলতো, তবে তার নাম হতে পারতো ‘গ্লোবাল ক্রাইম সলিউশনস লিমিটেড’!
আমাদের দেশে এখন স্টার্টআপের জয়জয়কার। তরুণরা নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে পিচ করছে। কিন্তু এই ১০ জন প্রবাসী দেখিয়ে দিলেন, আইডিয়া যদি ‘শয়তানি’ হয়, তবে সেটাও কত দ্রুত আন্তর্জাতিক বাজারে ‘স্কেল’ করা যায়। তারা প্রমাণ করেছেন, বিদেশের মাটিতে গ্রিন কার্ড পাওয়া কঠিন হতে পারে, কিন্তু ‘ব্ল্যাক লিস্টে’ নাম তোলা ডালভাত। তারা যেন আমাদের শিখিয়ে দিলেন, বৈধ পথ বন্ধুর, কিন্তু জেলখানার পথ বড়ই মসৃণ।
এখন প্রশ্ন জাগে, এই মানুষগুলো কি হঠাৎ করেই কুইন্স বা টেক্সাসের মাটিতে গিয়ে অপরাধী হয়ে গেল? নাকি এদের ডিএনএ-তেই এই ‘শর্টকাট’ বুদ্ধির বীজ আগে থেকেই পোতা ছিল? আমরা কি এমন এক সমাজ তৈরি করছি যেখানে সাকসেস মানেই হলো কেবল টাকা, সেটা চুরি করে হোক বা ডাকাতি করে? যদি তাই হয়, তবে এই ১০ জন কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের ক্ষয়ে যাওয়া নৈতিকতার এক একটা জীবন্ত প্রোফাইল পিকচার।
আমরা প্রায়ই আক্ষেপ করি, ‘বিদেশে গেলে মানুষ কত সভ্য হয়!’ কিন্তু আসলে কি তাই? মানুষ কি বদলে যায়, নাকি সুযোগ পেয়ে তার ভেতরের আসল রূপটা ডালপালা মেলে বড় হয়ে ওঠে? দেশে থাকলে যে হয়তো বড়জোর পাড়ার মোড়ে ইভটিজিং বা পকেটমারি করতো, সুযোগের অভাবে সে হয়তো বড় কিছু হতে পারেনি। কিন্তু আমেরিকায় গিয়ে যখন দেখলো বিশাল মঞ্চ, অমনি সে ‘ব্রডওয়ে’ স্টাইলে অপরাধ শুরু করে দিলো। নাটক নয়, অপরাধই হয়ে উঠল তার জীবনমুখী শিল্প।
ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির উপ-সহকারী মন্ত্রী লরেন বিস কড়া গলায় বলেছেন, যারা শিশুদের ক্ষতি করে বা নিরীহ মানুষের ওপর হামলা চালায়, তাদের আমেরিকায় থাকার কোনও অধিকার নেই। এই কথা শুনে আমাদেরও আয়নার সামনে দাঁড়ানো উচিত। এই মানুষগুলোর কি আসলে কোথাও থাকার অধিকার আছে? নাকি আমাদের সমাজই এমন এক কারখানা হয়ে গেছে, যেখান থেকে প্রতি বছর ‘ডিফেক্টিভ’ মাল উৎপাদিত হয়ে বিদেশে রফতানি হচ্ছে?
এখানে একটা চমৎকার দ্বিমুখী আচরণ আছে। যখন কোনও বাংলাদেশি অস্কার পায় বা নাসায় নাম করে, আমরা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ফাটিয়ে ফেলি— ‘বাংলার বাঘ!’ কিন্তু যখন এই ১০ জনের ছবি আসে, তখন আমাদের সুর বদলে যায়। আমরা বলি, ‘ও তো আসলে ভালো ফ্যামিলির না,’ ‘ও তো ছোটবেলায় দেশ ছেড়েছে,’ বা ‘ওর পাসপোর্টের মেয়াদ বোধহয় নেই।’ অর্থাৎ, ভালো হলে আমাদের ‘জাতীয় গৌরব’, আর খারাপ হলে তার ‘ব্যক্তিগত ব্যর্থতা’। এই ‘সিলেক্টিভ দেশপ্রেম’ আমাদের জাতীয় চরিত্রের এক রহস্যময় দিক।
আসল কথা হলো, আমরা ছোটবেলা থেকেই আইন ভাঙাকে ‘স্মার্টনেস’ মনে করতে শিখি। লাইনে না দাঁড়িয়ে আগে যাওয়া, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা, বা ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়াকে আমরা মনে করি ‘চালাকি’। এই ছোট ছোট চালাকিগুলোই যখন বড় হয়, তখন সেগুলো হয়ে ওঠে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি বা ড্রাগ ডিলিং। যে মানুষ ছোটবেলা থেকে নিয়ম ভাঙাকে বাহাদুরি মনে করে, সে ম্যানহাটনে গিয়েও নিয়ম ভাঙার সুযোগ খুঁজবে—এটাই স্বাভাবিক।
এই ১০ জনের ছবি তাই শুধু তাদের ব্যক্তিগত লজ্জার দলিল নয়, বরং আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতার এক আয়না। তারা হয়তো আমেরিকার ইমিগ্রেশন জেলে পচবে, কিন্তু তাদের যে মনস্তত্ত্ব, সেটা আমাদেরই অলিগলিতে ঘুরে বেড়ানো হাজার হাজার তরুণের মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় আছে। আমরা যদি কেবল সাফল্যের উৎসবে মেতে থাকি, আর ব্যর্থতার দুর্গন্ধকে কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রাখি, তবে আগামীতে এমন ‘দশ রত্ন’ থেকে ‘দশ হাজার রত্ন’ বের হতে সময় লাগবে না।
সবচেয়ে লজ্জার বিষয় হচ্ছে, আমরা চাই বা না চাই, ইন্টারনেটে কেউ যখন ‘বাংলাদেশি আমেরিকান’ লিখে সার্চ করবে, তখন এই ১০ জনের হাসিমুখ (বা গ্রেফতারকৃত মুখ) তাদের স্ক্রিনে ভেসে উঠবেই। আমাদের পরিচয় এখন আর কেবল লাল-সবুজ পতাকা বা সুন্দরবন নয়, আমাদের পরিচয়ে যুক্ত হয়েছে এই ‘ব্যাড হাম্ব্রে’ তকমাও। এখন সময় এসেছে ‘গর্ব’ আর ‘লজ্জা’— এই দুইয়ের মাঝখানের সূক্ষ্ম সুতাটাকে চেনার। কারণ, সবকিছুতেই যদি আমরা নির্লজ্জের মতো গর্ব খুঁজি, তবে একদিন লজ্জাটাই আমাদের অলঙ্কার হয়ে দাঁড়াবে। আর সেইদিন হয়তো আমেরিকা থেকে আমাদের পুরো জাতিকেই ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করা হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট