জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের (সংস্কার) বিষয়টি নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলীয় সদস্যদের মধ্যে যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে, সেটি অবধারিতই ছিল। কেননা, যে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সংসদের সরকারি দল হয়েছে, জুলাই সনদ তৈরির প্রক্রিয়াতে তারা বেশ ক্রিটিক্যাল ছিল। ৩০টি রাজনৈতিক দলের মতামত নিয়ে ৮৪টি প্রস্তাব-সংবলিত জুলাই জাতীয় সনদের যে খসড়া তৈরি করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, তার অনেকগুলো প্রস্তাবে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা আপত্তি ছিল। এরপরে ঐকমত্য কমিশন যখন ৪৮টি প্রস্তাব-সংবলিত জুলাই সনদের চূড়ান্ত ডকুমেন্ট প্রস্তুত করে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে পেশ করে, সেখানে বিএনপির নোট অব ডিসেন্টের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়। যে কারণে তখন ঐকমত্য কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ আনে বিএনপি।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নামে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নে যে আদেশ জারি করে, সেটির সাংবিধানিক বৈধতা নিয়েও বিএনপি প্রশ্ন তোলে এবং সবশেষ গত মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) জাতীয় সংসদে বিএনপির সিনিয়র নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির ওই আদেশকে ‘অন্তহীন প্রতারণার দলিল’ বলে অভিহিত করেন। এমতাবস্থায় অনেকের মনে এই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে যে, তাহলে জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ কী বা এই সনদে সংবিধানের যেসব পরিবর্তন/সংশোধন বা সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেগুলো কি হবে না? যদি না হয় তাহলে ৩০টি রাজনৈতিক দল মিলে মাসের পর মাস আলোচনা করে এরকম একটি রাজনৈতিক দলিল তৈরির পেছনে কেন সময় নষ্ট করলো। কেন জনগণের অর্থ খরচ করলো।
জুলাই সনদের অনেক প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি থাকলেও বিএনপি এই সনদ মানে না বা বাস্তবায়ন করবে না, এ কথা অবশ্য একবারও বলেনি। বরং মঙ্গলবার সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিএনপি জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ বাক্য ধারণ করে। তবে এর বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে তাদের দ্বিমত আছে।
বিরোধী দল চায় জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশে যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে, সেই আলোকে জুলাই সনদে উল্লিখিত বিধানগুলো সংবিধানে যুক্ত করা হবে। কিন্তু বিএনপির যুক্তি হলো, যেহেতু বিদ্যমান সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ বলে কোনও বিধান নেই, অতএব রাষ্ট্রপতি এরকম একটি পরিষদের সভা আহ্বান করতে পারেন না। প্রধানমন্ত্রীও এরকম কোনও পরিষদের সভা আহ্বানের জন্য রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না। যদিও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে উল্লিখিত বিধানের আলোকে বিরোধী দলীয় সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের দিনেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। এটি সংবিধান সম্মত হয়েছে কি না এবং সংসদ সদস্যদেরকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ পড়িয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
এই যখন পরিস্থিতি তখন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে বিরোধী দলীয় নেতার মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষ থেকে একটি বিকল্প প্রস্তাব দেন। সেটি হলো, সংবিধান সংশোধনের জন্য সরকারি ও বিরোধী দলীয় সদস্যদের সমন্বয়ে একটি সংসদীয় কমিটি গঠন। প্রাথমিকভাবে তার এই প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান সরকারি ও বিরোধী দল থেকে সমান সংখ্যক সদস্য নিয়ে এই কমিটি গঠনের পরামর্শ দেন। পরদিন বুধবার (১ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘সংবিধান সংশোধনে ১৫ থেকে ২০ সদস্যের একটি কমিটি হবে। সেখানে বিরোধী দলসহ সব দলের প্রতিনিধিদের রাখতে চাই। সবার মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা সংবিধান সংশোধনের কমিটি করতে চাই।’’ যদিও এদিন বিকালেই এই ইস্যুতে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল।
প্রসঙ্গত, জুলাই সনদে ৪৮টি প্রস্তাবই সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন- প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদ, একই ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা না হওয়া, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি মনোনয়ন, বিচারপতিদের নিয়োগ, ন্যায়পাল নিয়োগ, দুর্নীতি দমন কমিশনে নিয়োগ, সংসদে এমপিদের কথা বলার স্বাধীনতা ইত্যাদি। এই ৪৮টি প্রস্তাবের অধিকাংশের সাথেই বিএনপি একমত। কিছু কিছু প্রস্তাবে তাদের নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি আছে মানে হলো, তারা ওই বিধানগুলো জুলাই সনদে যেভাবে লিখিত হয়েছে ঠিক সেভাবে চায় না। বরং অন্যভাবে বা তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী লিখতে চায়। কিছু কিছু প্রস্তাবের সঙ্গে বিএনপি হয়তো একেবারেই একমত নয়। যেমন- একই ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা হতে না পারা।
প্রশ্ন হলো, বিএনপি যদি জুলাই সনদের প্রতিটি বাক্য ও শব্দ মানে, তাহলে আর এই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো, বিএনপি এই সনদের স্পিরিটের সঙ্গে একমত। কিন্তু সব বিধানকে তারা জুলাই সনদের আলোকে হুবহু সংবিধানে যুক্ত করতে রাজি নয়। কারণ শুরু থেকেই বেশ কিছু বিষয়ে তাদের ভিন্নমত রয়েছে। বিএনপি সংবিধান সংশোধন করতে চায় মূলত তাদের ৩১ দফা এবং নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে। দলটির সিনিয়র নেতাদের কথায় যতটুকু ধারণা পাওয়া গেছে তা হলো— বিএনপি জুলাই সনদকে অস্বীকার করে না, আবার জামায়াত ও এনসিপি যেভাবে জুলাই সনদে উল্লিখিত প্রতিটি প্রস্তাবকে হুবহু সংবিধানে দেখতে চায় এবং যে প্রক্রিয়ায় দেখতে চায়, তার সঙ্গে বিএনপির অবস্থানগত পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য থাকাটা অযৌক্তিক নয়। বরং সংসদে যেহেতু বিএনপির দুই- তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে— সুতরাং, সংবিধানের কোথায় কতটুকু পরিবর্তন আনা হবে, সেই এখতিয়ার মূলত এখন তাদের। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিএনপি সংবিধানে কোনও ধরনের সংশোধনী না আনলেও বিরোধীদের কিছু করার নেই। তারা এর প্রতিবাদে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করতে পারে। এমনকি রাজপথে আন্দোলনও গড়ে তুলতে পারে, কিন্তু কোনও সরকার বা কোনও সংসদ পরবর্তী সংসদ বাস্তবায়ন করতে বাধ্য থাকবে, এমন কোনও বিধান চাপিয়ে দিতে পারে না। কারণ প্রতিটি সংসদই সার্বভৌম জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে এবং প্রতিটি সংসদকেই ‘সুপ্রিম’ বলা হয়। সেই যুক্তিতে বিএনপি যদি জুলাই সনদ নিয়ে সংসদে একটি কথাও না বলে, তারপরও সাংবিধানিকভাবে বিরোধী দলের ওয়াকআউট এবং আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া কিছু করার নেই। তবে বিএনপি সেই পথে সম্ভবত যাবে না। বরং তারা জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন করতে চায়, কিন্তু সেটি হবে তাদের মতো করে। জামায়াত ও এনসিপির মতো করে নয়।
বিএনপির সঙ্গে বিরোধী দলের একটা শব্দগত পার্থক্য হলো এই যে বিরোধীরা বলছে তারা সংবিধানের সংস্কার চায়। আর বিএনপি বলছে সংশোধন। কারণ সংবিধান সংস্কার বলে কোনও শব্দ সংবিধানে নেই। বিদ্যমান সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া লিখিত আছে। সংবিধান সংস্কার বলে কিছু নেই। কিন্তু বিরোধীদের দাবি হলো, জুলাই অভ্যুত্থান এই সংস্কারের বিষয়টি সামনে এনেছে। যেহেতু তারা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরের বছর তথা বাহাত্তর সালে রচিত সংবিধানকে ‘মুজিববাদী’ ও ফ্যাসিস্টের সংবিধান মনে করে, ফলে তারা মনে করে এই সংবিধান আর সংশোধনযোগ্য নয়, বরং এটিকে সংস্কার করতে হবে। যদিও জুলাই সনদে যে ৪৮টি দফায় সংবিধানের বিভিন্ন বিধান পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে, সেগুলোর পক্ষে যদি সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য ভোট দেন, তাহলে ওই সংশোধনীগুলো সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাবে। সেটির নাম সংস্কার নাকি সংশোধন— তাতে কিছু যায় আসে না।
প্রশ্ন হলো, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর জন্য ২০১০ সালে যে বিশেষ কমিটি করা হয়েছিল, তখন এই ইস্যু নিয়ে তৎকালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগ এবং বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল, সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে, নাকি এবার সত্যিই সংবিধান সংশোধন/সংস্কার ইস্যুতে সরকারি ও বিরোধী দলগুলো একটা ঐকমত্যে পৌঁছাবে? আবার কমিটি গঠনে ঐকমত্য হলেও যখন প্রস্তাবগুলো সংসদে অনুমোদনের জন্য আসবে, তখন বিএনপি কি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিরোধী দলের সব প্রস্তাব নাকচ করে দেবে, নাকি জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট বিবেচনায় রেখে সংবিধানকে আধুনিক ও গণতান্ত্রিক করার চেষ্টা করবে— সেই প্রশ্নের উত্তর জানতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক