একটি সমন্বিত ও স্থিতিশীল শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই বহুমাত্রিক ও বিভক্ত কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। দেশে বর্তমানে সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা, ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা, ইংলিশ ভার্সন শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ইত্যাদি একাধিক ধারার শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর ভেতরে আবার প্রতিটি ধারায় বিভিন্ন উপধারা রয়েছে। বিশেষ করে মাদ্রাসা শিক্ষার ভেতরে প্রধান দুটি ধারা— আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসা বিদ্যমান। কওমি ধারার উপধারা হিসেবে আবার নূরানী, কারিয়ানা, হাফেজিয়া, ফুরকানিয়া মাদ্রাসা বিদ্যমান। ক্যাডেট মাদ্রাসা নামেও কিছু বিশেষ ধরনের মাদ্রাসা আছে। অপরদিকে সাধারণ শিক্ষায় ক্যাডেট কলেজ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত ও কেজি স্কুল বিদ্যমান। ফলে একটি দেশের শিক্ষার্থীরা একই রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েও ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা দর্শন, পাঠ্যক্রম ও মূল্যবোধের পরিবেশে বেড়ে উঠছে।

শিক্ষার এই বহুধাবিভক্ত কাঠামো শুধু বৈচিত্র্যের প্রতীক নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি গভীর অসামঞ্জস্য ও অস্থিরতারও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এসব শিক্ষাধারার অনেক প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে কওমি ধারার বিপুল সংখ্যক মাদ্রাসা জাতীয় শিক্ষাক্রমের আওতায় আসতে আগ্রহী নয়। তারা জাতীয় কারিকুলামের সঙ্গে নিজেদের শিক্ষা পদ্ধতিকে সমন্বয় করতে চায় না এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি সনদ গ্রহণ করতে চায় না। তাদের শিক্ষার সঙ্গে উচ্চতর আধুনিক শিক্ষা কিংবা কর্মমুখী শিক্ষা সংযুক্ত করতে চায় না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মত কর্মজীবনে প্রবেশ করার লক্ষ্যও অনেক ক্ষেত্রে তাদের থাকে না। ফলে একটি বড় অংশের শিক্ষার্থী এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে ওঠে, যার সঙ্গে রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন কাঠামোর সরাসরি সংযোগ খুব সীমিত।

বাংলাদেশে এমন বহু কেজি স্কুল, মাদ্রাসা, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে— যেগুলোর কোনও আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন বা পূর্ণাঙ্গ তথ্য সরকারের কাছে নেই। এসব প্রতিষ্ঠানে কী ধরনের শিক্ষক নিয়োগ করা হয়, কী ধরনের পাঠদান পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, কী ধরনের পাঠ্যক্রম পড়ানো হয়, কী ধরনের মূল্যবোধ শেখানো হয় বা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য কী ধরনের দক্ষতা তৈরি করা হয়, এসব বিষয়ে রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট ধারণা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। এর ফলে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্রের নীতিগত তদারকি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শিক্ষার মান ও লক্ষ্য সম্পর্কে জাতীয় পর্যায়ে একটি ঐক্যবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে না।

এই বাস্তবতার প্রভাব জাতীয় জীবনে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা ধারায় বেড়ে ওঠা মানুষদের চিন্তা-চেতনা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি অনেক ক্ষেত্রে পরস্পর বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়। সমাজে সহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার পরিবর্তে বিভাজন ও অসহিষ্ণুতার প্রবণতা তৈরি হয়। একটি জাতির নাগরিকরা যদি ছোটবেলা থেকেই সম্পূর্ণ ভিন্ন মানসিক কাঠামোর মধ্যে বেড়ে ওঠে, তাহলে তাদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও ঐক্য গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।

এছাড়া বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা হলো অস্থিরতা বা অস্থিতিশীলতা। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। একটি দলীয় সরকারের সময় যে শিক্ষাসংস্কার চালু হয়, পরবর্তীকালে অন্য দলীয় সরকার ক্ষমতায় এসে তা পরিবর্তন বা বাতিল করে দেয়। এমনকি জাতীয় চেতনা এবং জাতি-রাষ্ট্রের ইতিহাসও পাল্টে দেয়! শিক্ষকরা নিজস্বতা মাটি চাপা দিয়ে বার বার তাদের ক্লাসের বক্তব্য বিপরীত দিকে পাল্টাতে বাধ্য হন। ফলে পাঠদানে নিয়োজিত শিক্ষকদের ওপর ও রাষ্ট্রপ্রবর্তিত শিক্ষার ওপর শিক্ষার্থীদের আস্থা তৈরি হয় না। রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা তৈরি হয় না। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক সবাই একটি অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে থাকে।

প্রশ্ন হলো, একটি দেশের শিক্ষার্থীরা একই ভূখণ্ডে বসবাস করবে, কিন্তু তাদের চিন্তা-চেতনা, মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা ও দক্ষতার ভিত্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে, তা কি একটি কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে? শিক্ষা তো শুধু তথ্য বা জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি জাতির মানসিকতা, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ গঠনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা- ধর্মের মর্ম অনুধাবন ও কর্মের যোগ্যতা অর্জন নিশ্চিত করে। তাই শিক্ষা এমন হতে হবে— যা মানুষকে জ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি নৈতিক, মানবিক, সহিষ্ণু এবং দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।

বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল। প্রকৃতি, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক কাঠামো প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা তৈরি করছে। এই বাস্তবতায় একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত— শিক্ষার্থীদের এমন দক্ষতা ও সক্ষমতা প্রদান করা, যাতে তারা বর্তমান এবং ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে সফলভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। কিন্তু যদি শিক্ষা ব্যবস্থাই বিভক্ত ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে সেই লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তাই বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন নিজস্ব ঐতিহ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক মানের একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। এই শিক্ষাব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যেখানে দেশের সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটি সাধারণ নীতিমালা ও মানদণ্ডের আওতায় পরিচালিত হবে। এর অর্থ এই নয় যে, সব প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য বা ঐতিহ্য মুছে ফেলতে হবে; বরং তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই একটি সাধারণ জাতীয় কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব।

একটি কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, একটি অভিন্ন মৌলিক কারিকুলাম থাকা প্রয়োজন, যেখানে দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, নৈতিকতা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও নাগরিক মূল্যবোধ সম্পর্কে সব শিক্ষার্থী প্রায় সমানভাবে শিক্ষা লাভ করবে। দ্বিতীয়ত, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য একটি বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ও তদারকি ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে রাষ্ট্র জানে কোথায় কী ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তৃতীয়ত, শিক্ষার সঙ্গে কর্মজীবনের একটি সুস্পষ্ট সংযোগ তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা পরিবর্তিত ভবিষ্যতের নতুন নতুন কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষাব্যবস্থাকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে রাখা। শিক্ষা একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় প্রকল্প। তাই এর নীতি ও কাঠামো এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তা আমূল পরিবর্তিত না হয়। বরং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক মানের একটি স্থিতিশীল শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা উচিত, যা বহু বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে চলতে পারে। সেটির সফল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অবশ্যই সব শিক্ষার্থীর জন্য নিশ্চিত করতে হবে মানসম্পন্ন শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাউপকরণ, শিক্ষাপরিবেশ তথা সমান সুযোগ-সুবিধা।

শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির পথ নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান ভিত্তি। আমাদের মাটি ও মানুষের উপযোগী বিশ্বমানের একটি সমন্বিত, সৃজনশীল, স্থিতিশীল, নৈতিক, মানবিক ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করতে পারবে— যারা হবে শিকড়ে সংযুক্ত আন্তর্জাতিক মানের নাগরিক-কর্মী। তখনই আমাদের শিক্ষা সত্যিকার অর্থে জাতি গঠনের শক্তিতে পরিণত হবে।

লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, শিশু সাহিত্যিক ও শিক্ষা গবেষক