ক্যাডার বৈষম্য ও স্বায়ত্তশাসনের সংকট: পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষা-স্বাস্থ্য 

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর বৈষম্য নীরবে কাজ করে যাচ্ছে, যার প্রভাব ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে। এর মূলে রয়েছে পদোন্নতি ও মর্যাদা প্রাপ্তিতে চরম আন্তক্যাডার বৈষম্য। একদিকে যেখানে একই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে দেশের মেধাবীরা রাষ্ট্রীয় সেবায় প্রবেশ করেন, অপরদিকে কর্মজীবনের অগ্রগতিতে তাদের জন্য নির্ধারিত পথ সমান নয়। বিশেষ করে কলেজ শিক্ষক ও চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে এই বৈষম্য সবচেয়ে প্রকটভাবে দৃশ্যমান, যা কেবল ব্যক্তিগত অসন্তোষের বিষয় নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন।

বিসিএস পরীক্ষা বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, যেখানে হাজার হাজার মেধাবী তরুণ-তরুণী অংশগ্রহণ করেন। এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রশাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরীক্ষার কাঠামো, প্রশ্নের মান, মূল্যায়নের পদ্ধতি সবকিছুই একই মানদণ্ডে নির্ধারিত। অর্থাৎ, একজন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা এবং একজন কলেজ শিক্ষক বা চিকিৎসক একই প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় সেবায় প্রবেশ করেন। অধিকন্তু, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগদানকারীরা অনেক ক্ষেত্রে উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে আসেন। কিন্তু কর্মজীবনের অগ্রগতিতে এই অতিরিক্ত যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন হয় না, যা দীর্ঘমেয়াদে এই দুই খাতকে পিছিয়ে পড়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য একটি সুস্পষ্ট এবং ধারাবাহিক পদোন্নতির কাঠামো বিদ্যমান। একজন কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে ধাপে ধাপে উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব হয়ে সচিব পর্যন্ত উন্নীত হতে পারেন। এই অগ্রযাত্রায় প্রতিটি ধাপে তার ক্ষমতা, মর্যাদা এবং আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধি পায়। এমনকি সিনিয়র সচিব পর্যন্ত পৌঁছানোর সুযোগও তাদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। ফলে এই পেশায় একটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য এবং প্রেরণা তৈরি হয়, যা নতুন প্রজন্মের মেধাবীদের আকৃষ্ট করে।

অপরদিকে কলেজ শিক্ষকরা প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপক পর্যন্ত উন্নীত হতে পারেন। কিন্তু এই পদোন্নতির সংখ্যা সীমিত এবং প্রতিটি ধাপে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত থাকে। সর্বোচ্চ পদে পৌঁছালেও তারা প্রশাসন ক্যাডারের মতো সাধারণত গ্রেড ১ বা সিনিয়র সচিব পর্যায়ের সুযোগ পান না। একইভাবে চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও পদোন্নতির সুযোগ সীমিত এবং তাদের ক্যারিয়ার অগ্রগতি একটি নির্দিষ্ট স্তরে গিয়ে থেমে যায়, ফলে এই খাতগুলো কাঠামোগতভাবে পিছিয়ে পড়ছে।

এই বৈষম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পেশাভিত্তিক শিক্ষাগত যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়নের অভাব। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও চিকিৎসকরা, বিশেষত স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্যশিক্ষা ক্ষেত্রে, কর্মজীবনে প্রবেশের পরও নিয়মিতভাবে নিজেদের দক্ষতা উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে বাধ্য হন। গবেষণা, প্রশিক্ষণ, উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন এসব তাদের পেশাগত উন্নতির জন্য অপরিহার্য। অর্থাৎ, তাদের ক্যারিয়ার সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা এবং অ্যাকাডেমিক দক্ষতার ওপর। কিন্তু প্রশাসন ক্যাডারের ক্ষেত্রে এমন বাধ্যবাধকতা তুলনামূলক কম। সেখানে অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতাই প্রধান বিবেচ্য বিষয়। ফলে প্রশাসনিক পেশার সঙ্গে শিক্ষক ও চিকিৎসকদের মূল্যায়নের মানদণ্ডে একটি মৌলিক পার্থক্য তৈরি হয়। পেশাগত স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের ঘাটতি যুক্ত হওয়ায় এই বৈষম্য আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে এবং সংকটকে গভীরতর করছে।

এই বৈষম্যের প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকেও প্রভাবিত করে। যখন একজন মেধাবী শিক্ষার্থী দেখে যে শিক্ষকতা বা চিকিৎসা পেশায় তার ক্যারিয়ার অগ্রগতি সীমিত, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসন বা অন্যান্য সুবিধাজনক পেশার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মেধার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত আরও পিছিয়ে পড়বে, যা জাতীয় উন্নয়নের জন্য গুরুতর হুমকি।

শিক্ষা খাতের দিকে তাকালে এই সংকট আরও স্পষ্ট হয়। একটি দেশের উন্নয়নের ভিত্তি হলো তার শিক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু যদি সেই ব্যবস্থার চালিকাশক্তি শিক্ষকরা যথাযথ মর্যাদা ও সুযোগ না পান, তাহলে সেই ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়া অবশ্যম্ভাবী। বর্তমানে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্য শিক্ষকের অভাব দেখা যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠাভ্যাস কমছে, গবেষণার আগ্রহ হ্রাস পাচ্ছে এবং সৃজনশীল চিন্তার পরিবর্তে মুখস্থনির্ভরতা বাড়ছে। এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো— শিক্ষকতা পেশার প্রতি মেধাবীদের আকর্ষণ কমে যাওয়া, যা সরাসরি এই খাতকে পিছিয়ে পড়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

স্বাস্থ্য খাতেও একই চিত্র দেখা যায়। দক্ষ চিকিৎসকের অভাব, সেবা প্রদানের মানের তারতম্য এবং পেশাগত অসন্তোষ এই খাতকে প্রভাবিত করছে। একজন চিকিৎসক দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম করে, উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে এবং মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু তার পেশাগত মর্যাদা এবং ক্যারিয়ার অগ্রগতির সীমাবদ্ধতা তাকে হতাশ করে তোলে। এর ফলে অনেক চিকিৎসক বিদেশমুখী হন বা বিকল্প পেশার দিকে ঝুঁকে পড়েন, যা দেশের জন্য একটি বড় ক্ষতি, এবং স্বাস্থ্যখাতকে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে ফেলছে।

এই প্রেক্ষাপটে স্বতন্ত্র পে স্কেল এবং উচ্চতর গ্রেডের দাবি সামনে আসে। অনেক শিক্ষাবিদ এবং পেশাজীবী মনে করেন, শিক্ষক ও চিকিৎসকদের জন্য একটি আলাদা বেতন কাঠামো প্রবর্তন করা উচিত, যেখানে তাদের পেশাগত অবদান এবং যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। এটি শুধু আর্থিক সুবিধার বিষয় নয়, বরং এটি একটি পেশার প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। যখন একটি পেশাকে উচ্চতর মর্যাদা দেওয়া হয়, তখন সেটি সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা দেয় এবং নতুন প্রজন্মকে সেই পেশায় আসতে উৎসাহিত করে।

তবে এই সমস্যার সমাধান শুধু বেতন বা গ্রেড বৃদ্ধি দিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত নীতিমালা, যেখানে সব ক্যাডারের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং পেশাভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে প্রতিটি পেশার জন্য একটি স্পষ্ট ক্যারিয়ার পথ নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে কর্মজীবনের শুরু থেকেই একজন কর্মকর্তা বা পেশাজীবী তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পেতে পারেন।

এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞানচর্চার শীর্ষ কেন্দ্র নয়, বরং এটি একটি জাতির চিন্তার স্বাধীনতার প্রতীক। যদি শিক্ষকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারেন, যদি তাদের ওপর প্রশাসনিক চাপ বা রাজনৈতিক প্রভাব থাকে, তাহলে তারা তাদের সৃজনশীলতা হারিয়ে ফেলেন। এর ফলে শিক্ষা ও গবেষণার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই একটি শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি, না-হয়, শিক্ষা খাতের পিছিয়ে পড়া আরও ত্বরান্বিত হবে।

সম্প্রতি উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটি পুনর্গঠনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের মধ্যেই বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল। অথচ কমিটির সভাপতি করা হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবকে। সচিবরা দক্ষ প্রশাসক হতে পারেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি অ্যাকাডেমিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার চেয়ে অ্যাকাডেমিক দূরদৃষ্টি, গবেষণার গভীরতা ও শিক্ষাদানের দর্শনকে অগ্রাধিকার দেওয়া বেশি প্রয়োজন। এ ধরনের সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের সংকটকে আরও ঘনীভূত করে এবং শিক্ষা খাতকে পিছিয়ে দেয়।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পেশাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষক ও চিকিৎসকদের উচ্চ মর্যাদা, পর্যাপ্ত আর্থিক সুবিধা এবং স্পষ্ট ক্যারিয়ার অগ্রগতি নিশ্চিত করা হয়। ফলে এই পেশাগুলোতে মেধাবীরা আকৃষ্ট হন এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। বাংলাদেশেও এমন একটি ব্যবস্থা প্রবর্তন করা এখন সময়ের দাবি।

মোটকথা, বাংলাদেশের বিদ্যমান ক্যাডারভিত্তিক কাঠামোর ভেতরে যে বৈষম্য রয়েছে, তা দূর করা অত্যন্ত জরুরি। একই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে, একই বা অধিক যোগ্যতা নিয়ে কর্মজীবন শুরু করার পরও যদি কেউ তার প্রাপ্য মর্যাদা ও সুযোগ না পায়, তাহলে সেটি একটি বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। এই বৈষম্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের সংকট দূর না হলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের পিছিয়ে পড়া রোধ করা সম্ভব নয়।এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হলে প্রয়োজন একটি দূরদর্শী, ন্যায্য এবং অংশগ্রহণমূলক নীতি প্রণয়ন, যেখানে প্রশাসন, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসহ সব খাতের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি হবে এবং প্রতিটি পেশা তার প্রাপ্য সম্মান ও সুযোগ পাবে। তবেই একটি দক্ষ, টেকসই এবং মানবিক রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করবে।

লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়