সম্প্রীতির মেরুবন্ধন হোক পহেলা বৈশাখ!

এমন একটি ভোর আছে, যা কোনও মসজিদের একার নয়, কোনও মন্দিরের একার নয়, কোনও গির্জার একার নয়— অথচ সবার। সেই ভোর আসে বৈশাখের প্রথম দিনে, বাংলা সনের উদ্বোধনী সুর হয়ে, উষ্ণ এপ্রিলের বাতাসে ভেসে, ঢোলের মন্থর বোলে ঘোষিত হয়ে। সেই ভোরে বাংলাদেশজুড়ে একটি অসাধারণ ঘটনা ঘটে— একটি পুরো জাতি একসঙ্গে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, একসঙ্গে হাসে, একসঙ্গে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। পুরোনো বছরের যত গ্লানি, যত ক্লান্তি, যত বিভেদ— সব যেন ধুয়েমুছে যায় বৈশাখের প্রথম আলোয়। পহেলা বৈশাখ শুধু একটি তারিখ নয়। এটি একটি যুক্তি— একটি জীবন্ত, শ্বাসপ্রশ্বাসশীল, প্রতি বছর নবায়িত যুক্তি — যে একটি জাতি তার বিভেদের সমষ্টির চেয়ে অনেক বেশি কিছু হতে পারে। এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, এটি একটি সংস্কৃতি, একটি অনুভূতি, একটি সম্মিলিত স্বপ্ন।

এমন এক পৃথিবীতে, যেখানে পরিচয়ের রাজনীতি মানুষকে ক্রমশ খণ্ডে খণ্ডে ভাগ করে দিচ্ছে, পহেলা বৈশাখ সেই বিভাজনকে অস্বীকার করে দাঁড়িয়ে থাকে। ঢাকার রমনা বটমূলে যখন ছায়ানটের শিল্পীরা এসো হে বৈশাখ গেয়ে ওঠেন, তখন সেই সুর শুধু হিন্দুর কানে পৌঁছায় না, শুধু মুসলমানের হৃদয় স্পর্শ করে না — সেই সুর পৌঁছে যায় সবার কাছে। সেই মুহূর্তে ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, দলীয় পরিচয়— সব গৌণ হয়ে পড়ে। মানুষ শুধু বাঙালি হয়ে ওঠে।

এই উৎসবে প্রবেশের কোনও টিকিট নেই, কোনও বিশেষ পরিচয়পত্র লাগে না। পথের মানুষ, মাঠের কৃষক, শহরের চাকরিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র— সবাই সমান অধিকারে এই উৎসবের অংশীদার। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নগর-গ্রাম— পহেলা বৈশাখ এই সব বিভাজনকে

একদিনের জন্য হলেও অর্থহীন করে দেয়। এটি কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি বাংলার সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত এক সত্য— যে সত্য বলে, উৎসব মানুষকে জুড়ে দেয়, ভাঙে না।

পহেলা বৈশাখের ইতিহাস কেবল আনন্দের ইতিহাস নয়, এটি বাঁচার ইতিহাস। মোঘল আমলে সম্রাট আকবর বাংলা সন প্রবর্তন করেছিলেন কৃষিকাজের খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য। তখন থেকেই বৈশাখের প্রথম দিনে হালখাতা খোলার রেওয়াজ শুরু হয়। ব্যবসায়ীরা পুরনো বছরের হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতা খুলতেন, ক্রেতাদের মিষ্টি খাওয়াতেন। কিন্তু কালে কালে এই উৎসব শুধু ব্যবসায়িক হিসাবের দিন থেকে রূপান্তরিত হয়েছে এক সামাজিক মিলনের উপলক্ষে— যেখানে মানুষ কেবল হিসাব মেলাতে নয়, মন মেলাতেও আসে।

১৯৬৫ সালে, যখন পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালির সংস্কৃতিকে দমন করতে চেয়েছিল, রবীন্দ্রসংগীতকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল, তখন রমনার বটতলায় ছায়ানটের উদ্যোগে

পহেলা বৈশাখ উদযাপন একটি সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের রূপ নিয়েছিল। সেদিন বাঙালি প্রমাণ করেছিল— তাদের পরিচয় কেউ কেড়ে নিতে পারে না। ভাষা আন্দোলন যেমন রাজনৈতিক স্বাধীনতার বীজ বুনেছিল, তেমনই পহেলা বৈশাখের সেই উদযাপন সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল। সেই চেতনাই আজও প্রতি বছর বৈশাখের ভোরে জেগে ওঠে, নতুন শক্তিতে, নতুন উদ্যমে।

পহেলা বৈশাখের দিনে গ্রামে গ্রামে, শহরে শহরে যে দৃশ্য দেখা যায়, তা এই দেশের সম্প্রীতির এক অন্যরকম সাক্ষ্য দেয়।

হিন্দু পরিবারের উঠোনে মুসলমান প্রতিবেশী পান্তা-ইলিশ খেতে বসেন। মুসলমানের দোকানে হিন্দু বন্ধু হালখাতায় মিষ্টিমুখ করেন। শোভাযাত্রায় শাড়ি পরা মেয়েটির পাশে হাঁটেন পাঞ্জাবি পরা ছেলেটি— দুজনের মুখেই একই হাসি। চট্টগ্রামের পাহাড়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ নিজেদের মতো করে নববর্ষ পালন করেন, কিন্তু সেই উৎসবের প্রাণে একই সুর— নতুনকে স্বাগত জানানো, পুরনো ক্লেশ ভুলে যাওয়া।

এই দৃশ্য আদর্শলিপির কোনও পাতা থেকে নেওয়া নয়। এটি বাস্তব। এটি প্রমাণ করে যে সংস্কৃতি যেখানে মানুষকে কাছে টানে, সেখানে বিভেদ দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজনীতি যা পারে না, উৎসব তা পারে— কারণ উৎসব মানুষের অন্তরকে স্পর্শ করে, মাথাকে নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রা আজ ইউনেস্কোর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। পেঁচা, বাঘ, হাতি, পদ্মফুল, ময়ূর— এই প্রতীকগুলো শুধু লোকশিল্পের উপাদান নয়, এগুলো একটি দর্শন বহন করে। পেঁচা জ্ঞানের প্রতীক, বাঘ শক্তির, পদ্ম পবিত্রতার— এই প্রতীকগুলো কোনও একটি ধর্মের নয়,

এগুলো বাংলার মাটির, বাংলার মানুষের।

এই শোভাযাত্রায় কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিস্টান— সেই প্রশ্ন কেউ করে না।

সবাই একই রঙে রাঙানো, একই গানে মাতোয়ারা। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন কেবল একটি বার্তা দিতে— মঙ্গল হোক সবার, কল্যাণ হোক সবার। এই মিছিল কোনও একটি দলের নয়, কোনও একটি গোষ্ঠীর নয়— এই মিছিল সমগ্র মানবতার।

পহেলা বৈশাখ কোনও ধর্মীয় উৎসব নয — এটি একটি সাংস্কৃতিক উৎসব। কোন ধর্মের সঙ্গে এর কোনও বিরোধ নেই। এটি মানুষের উৎসব। আর যখন একটি জাতির অভিন্ন সাংস্কৃতিক সুতো

ছিঁড়ে যায়, তখন যা বাকি থাকে তা বিভেদ— আর বিভেদ থেকে জন্ম নেয় অবিশ্বাস, আর অবিশ্বাস থেকে সহিংসতা।

ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, যে জাতি উৎসবে একত্রিত হতে পারে, সে জাতি সংকটেও একত্রিত থাকতে পারে। ১৯৭১ সালে এই বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়ই লক্ষ মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করিয়েছিল। পহেলা বৈশাখ সেই পরিচয়ের বার্ষিক উদযাপন— একটি জাতির নিজেকে আবার খুঁজে পাওয়ার দিন। আজকের বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখের মতো একটি উৎসব নিছক আনন্দের উপলক্ষ নয়— এটি একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা। এটি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়: আমরা আগে বাঙালি, তারপর অন্য সব পরিচয়।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে এই উৎসবকে সংরক্ষণ করা, পৃষ্ঠপোষকতা করা এবং সকল নাগরিকের কাছে নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলা। নাগরিক সমাজের দায়িত্ব আছে এই উৎসবকে

অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করা, যাতে এটি কর্পোরেট ব্র্যান্ডিংয়ের হাতিয়ার না হয়ে মানুষের উৎসব হয়েই থাকে। আর প্রতিটি পরিবারের দায়িত্ব আছে শিশুদের শেখানো— বৈশাখ মানে শুধু নতুন পোশাক নয়, বৈশাখ মানে নতুন মন, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন সম্পর্ক।

নতুন প্রজন্মের কাছে এই উৎসব পৌঁছে দেওয়া শুধু ঐতিহ্য রক্ষার বিষয় নয়। এটি তাদের একটি উত্তরাধিকার দেওয়া— এই শিক্ষা যে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একসাথে বাঁচা যায়, একসঙ্গে

হাসা যায়, একসঙ্গে গান গাওয়া যায় এবং একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়া যায়। এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি— এবং পহেলা বৈশাখ সেই শক্তির সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রকাশ।

প্রতিটি বৈশাখের ভোরে যখন রমনা বটমূলে সুর ওঠে, যখন গ্রামের আলপথে নতুন কাপড় পরা শিশু দৌড়ায়, যখন শহরের ব্যস্ত মানুষটিও থামে এবং মুহূর্তের জন্য হলেও অপরিচিতের দিকে তাকিয়ে হাসে — তখন বোঝা যায়, বাংলাদেশ কেবল একটি ভূখণ্ড নয়। এটি একটি অনুভূতি, একটি প্রতিশ্রুতি, একটি স্বপ্ন যা প্রতি বছর নতুন করে জন্ম নেয়।

বিভেদের রাজনীতি আসে এবং যায়। কিন্তু বৈশাখের ভোরের সেই আলো, সেই সুর, সেই মানুষের ঢল— তা থেকে যায়। থেকে যায় কারণ এটি কারো দেওয়া নয়, এটি বাংলার মাটি থেকে উঠে আসা — আমাদের সবার। পহেলা বৈশাখ সেই প্রতিশ্রুতির নাম। সম্প্রীতির সেই স্বপ্নের নাম।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক