ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপির সরকার গঠন স্রেফ একটি নির্বাচনি জয় নয়, বরং এক বিশেষ রাজনৈতিক সমীকরণের ফলাফল। নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য উত্থান নিয়ে যে ‘রাজনৈতিক হাওয়া’ বা সুকৌশলী গুজব ছড়ানো হয়েছিল—তা খোদ বিএনপি শিবিরেও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছিল। তবে ইতিহাসের সত্য এটাই যে শেষ মুহূর্তের স্নায়ুযুদ্ধে জয়ী হয়ে বিএনপি যে আজ ক্ষমতায় বসেছে, তার কারিগর কেবল তাদের নিজস্ব কর্মী-সমর্থকরা নন। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, নারী ও আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল একটি বিশাল অংশের ভোটই বিএনপিকে বড় ব্যবধানে সংসদে পৌঁছে দিয়েছে।
সেই ক্রান্তিকালে এই বিশেষ ভোটারগোষ্ঠীর আস্থা অর্জনে বিএনপি কেবল দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও তাদের প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বয়ান সাজিয়েছিল। সরকার গঠনের পর নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার জন্য দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতিগুলোর সংযোগ দৃশ্যমান হচ্ছে না।
বর্তমান সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত সিদ্ধান্ত হলো—ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধকরণ। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’ সংশোধনের অধ্যাদেশকে তড়িঘড়ি করে সংসদে বিল আকারে পাস করার মাধ্যমে এই সরকার কার্যত দলটিকে আইনি কাঠামোর বাইরে ঠেলে দিয়েছে। এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তনের এক সংকেত।
তবে এই সিদ্ধান্তের চরম বিড়ম্বনা ফুটে ওঠে বিএনপির অতীত ও বর্তমান অবস্থানের বৈপরীত্য। আমরা দেখেছি, ২০২৪ সালের চরম উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন যে বিএনপি কোনও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার দর্শনে বিশ্বাসী নয়। এমনকি নির্বাচনের প্রাক্কালে তারেক রহমানও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দোহাই দিয়ে একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
ভোটের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক বয়ানে যে পরিপক্বতা ও দূরদর্শিতার আভাস পাওয়া গিয়েছিল, তা এখন সুনিপুণ বিভ্রম বলে মনে হতে শুরু করেছে। ‘টাইম ম্যাগাজিন’-এ দেওয়া সেই বহুল আলোচিত সাক্ষাৎকারে তিনি যখন বলেছিলেন, “আজ যদি একটি দল নিষিদ্ধ করা হয়, তবে কাল আমার দলও নিষিদ্ধ হবে না তার নিশ্চয়তা কী?”—তখন সাধারণ মানুষের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। তার এই উক্তিটি কেবল একটি রাজনৈতিক মন্তব্য নয়, এক ধরনের ‘গণতান্ত্রিক নিরাপত্তা’র প্রতিশ্রুতি বলে প্রতীয়মান হয়েছিল। জনমনে এই ধারণা গেঁথে গিয়েছিল যে দীর্ঘ প্রবাস জীবন এবং চড়াই-উতরাই তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শনে এক ইতিবাচক রূপান্তর ঘটিয়েছে। তিনি হয়তো প্রতিশোধের বদলে স্থিতিশীলতার পথে হাঁটবেন।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা বলছে ঠিক উল্টো কথা। আওয়ামী লীগকে আইনি প্রক্রিয়ায় নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে বিএনপি কার্যত সেই প্রতিশোধের রাজনীতির বিষচক্রেই প্রবেশ করলো, যা থেকে উত্তরণের স্বপ্ন তারা জাতিকে দেখিয়েছিল নির্বাচনের আগে। যে তারেক রহমান অপরাধীর বিচার এবং দল নিষিদ্ধকরণকে আলাদা করে দেখার নীতিগত অবস্থান নিয়েছিলেন, ক্ষমতা বসে তিনি সেই অবস্থান থেকে ঘুরে গেলেন। এই বৈপরীত্য আজ একটি রূঢ় সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে—নির্বাচনের আগের সেই উদারবাদী ভঙ্গি ছিল ভোট পাওয়ার কৌশল মাত্র।
একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রথম এবং প্রধান দাবি থাকে জীবনের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন। বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর জনমনে এই বিশ্বাস জন্মেছিল যে অরাজকতার যে ‘মব সংস্কৃতি’ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মহীরুহ হয়ে উঠেছিল, তার অবসান ঘটবে। কিন্তু শাসনের দশম দিনেই বাংলাদেশ ব্যাংক ও বরিশালের আদালতে সংঘটিত বিশৃঙ্খলা সেই আশায় প্রথম কুঠারাঘাত করে। সরকারের নির্লিপ্ততা তখন থেকেই জনমনে আশঙ্কার বীজ বপন করেছিল, যা কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে এক নৃশংসতম রূপ পরিগ্রহ করেছে।
কুষ্টিয়ায় একজন পীরকে যেভাবে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে পুরোনো ভিডিও’র অজুহাতে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হলো, তা কোনও সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। এটি কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর নামান্তর। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে গণপিটুনি বা মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ১৯৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে—২০২৪ সালে যা ছিল ১২৮। ১৯ মাসে শতাধিক মাজারে হামলা, ভাঙচুর, বাউল-সুফিদের ওপর আঘাত এবং এমনকি কবর থেকে লাশ তুলে পোড়ানোর মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতা আজ আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে।
কুষ্টিয়ার ঘটনায় সরকারের নীরবতা রহস্যজনক। যখন আইনকে নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই উন্মাদনা থামানোর বদলে প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে, তখন সেই ‘নীরবতা’ অপরাধীদের কাছে প্রশ্রয় হিসেবেই গণ্য হয়। ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে যে ‘ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের’ চাষ করা হচ্ছে, তা দেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মূলে কুঠারাঘাত করছে। জনগণ কি তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের ‘মব শাসিত’ রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্যই বিএনপিকে বিপুল ম্যান্ডেট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছে?
বিএনপি নির্বাচনি ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় বসার পর জনমনে যে ন্যূনতম স্বস্তির আশা ছিল, তা এখন হতাশায় রূপ নিতে শুরু করেছে। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—কেন একটি শক্তিশালী জনমত নিয়ে গঠিত সরকার এই ‘মব সংস্কৃতি’র লাগাম টেনে ধরতে পারছে না? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সালাহ উদ্দিন আহমদ অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন যে দেশে আর কোনও মব কালচার চলবে না। কিন্তু তার সেই হুঙ্কার কি কেবলই কাগুজে বাঘের গর্জন ছিল? কার্যত দেখা যাচ্ছে, সরকারের এই ঘোষণা আর মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে কোনও যোগসূত্র নেই। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করে আবার ১৯৭১ সালের গণহত্যায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সম্পৃক্ততা স্বীকার করে, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনও অবস্থান না নিয়ে জামুকা (জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল) বিল পাস করে জামায়াতকে রাজনৈতিক আশকারার মধ্য দিয়েই তবে মবকে জারি রাখতে চাইছে বিএনপি?
বিএনপি সরকারের গত দুই মাসের পথচলা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনেই নয়, বরং মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি থেকেও যোজন দূরে সরে যাচ্ছে। বিবিসি বাংলাকে (৭ অক্টোবর, ২০২৫) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সগৌরবে ঘোষণা করেছিলেন যে তার শাসনামলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং নাগরিকের মত প্রকাশের অধিকারে আর কোনও হস্তক্ষেপ করা হবে না। তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন, দমন-পীড়নের সেই অন্ধকার অধ্যায় চিরতরে সমাপ্ত হবে। এর চেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে যে কেবল একটি ঐতিহাসিক ভাষণ—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ বাজানোর দায়ে শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন জন শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে? তারা এখনও কারাগারে।
ক্ষমতার দুই মাস না পেরোতেই বিএনপির রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রশ্নবিদ্ধ—কেন তারা নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারছে না? একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও ভীতিজাগানিয়া বিশ্লেষণ এখন মুখে মুখে—সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ তকমা দিয়ে বিএনপি আসলে হুবহু তারই ‘দমনমূলক মডেল’ অনুসরণ করছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আইন করে নিষিদ্ধ করা, ভিন্নমত দমনে পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম রাখা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেওয়া— এই সবই তো সেই পুরোনো ব্যবস্থারই প্রতিচ্ছবি। অপরদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে লোকদেখানো দূরত্ব বজায় রাখলেও সরকারের প্রতিটি নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব অনুভব করা যাচ্ছে।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, বিএনপি কি এই ‘কথাখেলাপি’ তকমা নিয়েই ক্ষমতার মেয়াদ পার করতে চায়? তারা কি একবারও ফিরে তাকাবে সংবাদমাধ্যম এবং ভোটের মাঠে জনগণের কাছে দেওয়া তাদের সেই উচ্চাভিলাষী অঙ্গীকারগুলোর দিকে? তবে বিএনপির এই বিষয়ে মনোযোগের যে খামতি আছে, তা তো অতো-শতো না ভেবেই বলা যায়, অনুভব করা যায়।
জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়