প্রসঙ্গ ছাত্রী হলের গেট ২৪ ঘণ্টা খোলা: পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি 

শাহানা হুদা রঞ্জনা
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলোর গেট ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার দাবিতে নারী শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে আসছেন বেশ কিছু দিন ধরে। এই আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রী হলগুলোর গেট বন্ধের সময় রাত ১০টা থেকে বাড়িয়ে রাত ১১টা নির্ধারণ করেছে। তবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা হলের ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার দাবিতে অনড়।

ছাত্রীদের এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অনেকে প্রশ্ন করছেন—হলের বাইরে রাত ১১টার পর বা সারা রাত ছাত্রীদের কী কাজ থাকতে পারে? এই প্রশ্নের পক্ষে এবং বিপক্ষে নানা ধরনের যুক্তি দেওয়া বা তর্কবিতর্ক করা যায়। কিন্তু এই দাবির যৌক্তিকতা বিচার করার জন্য, এই দেশ ও শহরের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা দরকার।

হলের গেট ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা সংক্রান্ত ছাত্রীদের এই দাবির পক্ষে কারণগুলো পর্যালোচনা করা যাক। তারা ‘লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যহীন’ নারী হল চাইছেন। ছাত্রদের হল যদি ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকতে পারে, ছাত্রী হল কেন নয়?

বাংলাদেশের বাস্তবতায় অনেক কিছুই পুরুষ বা ছাত্রদের জন্য অসুবিধাজনক বা বিব্রতকর নয়, কিন্তু মেয়েদের জন্য তা অসুবিধাজনক এবং ঝামেলাপূর্ণ। এই দেশে পুরুষরা অবলীলায় খালি গায়ে, হাফ প্যান্ট পরে বের হতে পারে, ইচ্ছামতো বিড়ি ফুঁকতে পারে, যেখানে-সেখানে টয়লেট করতে পারে। মেয়েদের পক্ষে এর কোনোটাই করা সম্ভব হয় না। পুরুষরা যত সহজে রাতবিরাতে ঘুরে বেড়াতে পারে, মেয়েরা চাইলেও তা পারে না।

নারী প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। এ দেশের গ্রামগঞ্জে মেয়েরা এখনও একা স্কুল-কলেজে বা রাতে ঘরের বাইরে টয়লেটে যেতেও নিরাপদ বোধ করেন না। সেই একই ধরনের নিরাপত্তাহীনতা শহরেও আছে।

কোনও মেয়ে যখন বেশি রাতে নিজের প্রয়োজনে রাস্তায় বের হন, তখন পুলিশ, মাস্তান, ভবঘুরে, মাদকসেবী সবাই তাদের লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করে। এ রকম অনেক ঘটনা অতীতে ঘটেছে। এই সেদিন দুটি মেয়ে রিকশায় করে টিএসসিতে এসেছিল গভীর রাতে চা খেতে। তাদের সেখানে হেনস্তা হতে হয়েছে।

এই সমাজ এখনও রাতে ডিউটির পেশাগুলোকে নারীর জন্য যোগ্য পেশা বলে মনে করে না, বরং বিভিন্নভাবে টিজ করে ও অশোভন মন্তব্য করে। নারীকে অসম্মান ও অবমাননা করার প্রবণতা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে।

কাজে বা বিশেষ দরকারে কোনও মেয়ে যখন রাতে পথে বের হয়ে বিপদে পড়েন, তখন সাধারণত তার পক্ষে কেউ থাকে না। সবার প্রশ্ন, এত রাতে রাস্তায় কেন বের হয়েছো? অথচ একজন পুরুষকে কখনোই এই প্রশ্ন করা হয় না।

এই যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা হলের গেট ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার দাবি জানাচ্ছেন, এই নিউজগুলোর নিচে বেশিরভাগ মানুষই অশ্লীল ও কু-ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছে। এর থেকেই বোঝা যায় একশ্রেণির মানুষের নারীবিদ্বেষী মানসিকতা। এ ধরনের একটি সামাজিক পরিস্থিতিতে নারী কতটা নিরাপদ এটা ভাবার দরকার আছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং এর আশপাশের এলাকায় ইভটিজিং, আপত্তিকর মন্তব্য এবং যৌন হয়রানির মুখোমুখি হতে হয় ছাত্রীদের।

ছাত্রীদের ক্যাম্পাস জীবনের অন্যতম বড় একটি অনিরাপত্তা ও উদ্বেগের কারণ এটি। ক্যাম্পাসের অন্ধকার ও নির্জন এলাকায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই।

কম আলো থাকার সুযোগে বহিরাগত বা কিছু উচ্ছৃঙ্খল শিক্ষার্থী ছাত্রীদের লক্ষ্য করে আপত্তিকর মন্তব্য বা ইশারা করে। নির্জন পয়েন্টগুলোতে প্রক্টরিয়াল টিম বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সিকিউরিটি গার্ডদের পর্যাপ্ত টহল থাকে না। বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াত সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসকে অরক্ষিত করে রাখে।

এছাড়া আছে সাইবার বুলিং ও অনলাইন হয়রানি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপের পেজগুলোতে ছাত্রীদের ছবি বা নাম উল্লেখ করে পরোক্ষভাবে ট্রল বা আপত্তিকর মন্তব্য করার প্রবণতা দেখা যায়। এখন গেট খোলা রাখার জন্য যেসব ছাত্রী আন্দোলন করছেন, তাদের অনেককেই অনলাইনে চরিত্রহনন বা মানহানিকর মন্তব্যের শিকার হচ্ছেন।

আন্দোলনকারী ছাত্রীদের যুক্তি হলো—তাদের হলের ভেতর বন্দি না রেখে প্রশাসন যদি ক্যাম্পাসে ইভটিজিং বন্ধ, সিসিটিভি স্থাপন এবং বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে পুরো ক্যাম্পাস এমনিতেই নিরাপদ হয়ে উঠবে।

এই দাবির মুখে প্রশাসন বলছে, ছাত্রীদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলের দায়িত্ব। গেট পুরোপুরি খোলা রাখলে গভীর রাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে বা কোনও ছাত্রী বিপদে পড়লে তার প্রাতিষ্ঠানিক দায় প্রশাসনের ওপর এসে বর্তায়।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোর ভেতরের পরিবেশ রাতে পুরোপুরি নিরাপদ নয় বলে মনে করে প্রশাসনও। তাহলে কেন প্রশাসন নিরাপত্তা বিধানে কাজ করছে না? প্রশাসন বলছে, তাদের জনবল ও কাঠামোগত সংকট আছে। ছাত্রী হলগুলোতে ২৪ ঘণ্টা গেট খোলা রাখতে হলে প্রতি শিফটে পর্যাপ্ত বিশ্বস্ত ও নারী নিরাপত্তাকর্মী এবং হল কর্মকর্তা প্রয়োজন। বর্তমানে তাদের এই পরিমাণ অতিরিক্ত জনবল ও বাজেট নেই। গভীর রাতে হল প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পক্ষে প্রতিটি শিক্ষার্থীর আসা-যাওয়া মনিটর করা বা জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়া প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কঠিন।

এখানে আরেকটি প্রশ্ন উঠেছে, এই ছাত্রীরা যখন ছুটিতে নিজের বাসায় যান, তখন কি তারা দাবি জানাতে পারেন সারা রাত বাসার গেট খোলা রাখার? বা চাইলেই রাতে যখন ইচ্ছা তখন বাইরে বের হতে পারেন? পারেন না, কারণ পরিবার সেই অনুমতি দেয় না। ঠিক তেমনি, ছাত্রীরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেন, তখন হল কর্তৃপক্ষই হন তাদের অভিভাবক। তাদের জিম্মায় পরিবার মেয়েদের তুলে দেন।

কর্তৃপক্ষও বলছে, অনেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক চান না যে তাদের সন্তান গভীর রাতে হলের বাইরে থাকুক। কোনও ছাত্রী রাতে হলে না ফিরলে, অনেক সময় অভিভাবকরাই হল প্রশাসনকে দায়ী করেন। তাই শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার জন্য এবং সামাজিক ও পারিবারিক শৃঙ্খলার কথা বিবেচনা করে একটি ‘নির্দিষ্ট সময়সীমা’ বজায় রাখা জরুরি বলে মনে করে প্রশাসন।

ছাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, ১১টার পর হলে ঢুকতে গেলে জবাবদিহির নামে তাদের প্রশাসনিক হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। তাছাড়া তারা মনে করেন, জরুরি প্রয়োজনের সময়সীমা হয় না।

গভীর রাতে কোনও শিক্ষার্থীর জরুরি চিকিৎসা বা দূরপাল্লার জার্নি শেষে ক্যাম্পাসে ফেরার প্রয়োজন হলে—এই ১১টার সময়সীমাও তাদের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। একজন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর প্রতিদিন রাত ১১টার পর বাইরে কী কাজ থাকতে পারে। প্রতিদিন তো জরুরি প্রয়োজন থাকতে পারে না।

এমনকি টিউশনি বা লাইব্রেরি ওয়ার্ক থাকলেও তা রাত ১১টার মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। তাহলে অনিরাপদ একটা পরিস্থিতিতে সারা রাত হলের গেট খোলা রাখার প্রশ্ন আসছে কেন? আর হলে বসবাসকারী কত শতাংশ ছাত্রী এই স্বাধীনতা চাইছেন, সেটাও দেখার বিষয় আছে।

তবে কারও যদি প্রয়োজন থাকে, তবে অবশ্যই তিনি অনুমতি নিয়ে বাইরে যেতে পারেন, যেকোনও সময়ে। যেমন- ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় বা অন্যান্য সময়ের জাতীয় আন্দোলনে নারী শিক্ষার্থীরা হলের নিয়ম ভেঙে রাতের বেলাও রাজপথে নেমেছেন এবং সফল হয়েছেন। তখন কেউ তাদের বাধা দেয়নি। যখন এরকম কোনও আন্দোলন চলে, তখন ক্যাম্পাস এবং ক্যাম্পাস-সংলগ্ন এলাকা অন্যরকম থাকে, সবাই সজাগ থাকে।

অথচ এই জুলাই আন্দোলনে রাজপথে যে নারীরা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, বিজয়ের পর তাদের অনেকেই আজ নীরব। নারী নেতৃত্বের বড় একটি অংশ রাজপথ, সংগঠন, এমনকি জনপরিসর থেকেও অনেকটা সরে গেছেন—কিংবা নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।

আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী প্রথম সারির নারীরা স্বীকার করেছেন, অনলাইন ও অফলাইনে নারীদের লক্ষ্য করে ট্রল, গালাগালি এবং সাইবার বুলিংয়ের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীর চুল ধরে টানা, শরীরে আঘাত করা, আজেবাজে গালি ছুড়ে দেওয়া— সবই হয়েছে চব্বিশ পরবর্তী সময়ে। তারা অভিযোগ করেছেন, সে সময় তাদের সঙ্গে আন্দোলনে থাকা পুরুষ সদস্যরা কেউ এগিয়ে আসেননি।

নারীকে ‘শৃঙ্খলে বন্দি করা’র সঙ্গে ‘নারীর নিরাপত্তা’র দিকটিকে গুলিয়ে ফেললে হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একজন মেয়ের ভালো-মন্দ বোঝার সক্ষমতা আছে। কিন্তু অনিরাপদ পরিবেশ পরিস্থিতিও তাকে বুঝতে হবে।

আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি সেই আশির দশকে, তখন পারিপার্শ্বিক অবস্থা নারীর অনুকূলেই ছিল। নারীবিদ্বেষী মোর‌্যাল পুলিশিং ছিল না। তখনও ছাত্রী হল ও আমাদের বাসায় ফেরার একটা নিয়ম ছিল। লাইব্রেরি, টিউশনি, কবিতা বা নাটকের সংগঠন, এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও রাজনীতি যাই করো না কেন—রাত ৮/৯টার মধ্যে শেষ করে ঘরে বা হলে ফিরতে হবে।

বিশ্বের অনেক দেশ মনে করে, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তার মূল ভিত্তি ‘কাউকে বন্দি রাখা নয়, বরং পরিবেশ নিরাপদ রাখা’। সেই নিরাপদ পরিবেশ আমরা কি দিতে পারছি? গেট ২৪ ঘণ্টা খুলে রাখার প্রথম ধাপ এটা নিশ্চিত করা যে ছাত্রছাত্রীরা যেন নিজেদের ক্যাম্পাসে নিরাপদ থাকতে পারেন। এই ব্যবস্থা প্রশাসনকে নিতেই হবে। এরপর ছাত্রী হলের গেট ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখবে কিনা, এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।

শাহানা হুদা রঞ্জনা: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
গৃহপরিচারিকা থেকে ‘সেক্স সিম্বল’, মাত্র ৩৫ বছরে রহস্যময় মৃত্যু নায়িকার
গৃহপরিচারিকা থেকে ‘সেক্স সিম্বল’, মাত্র ৩৫ বছরে রহস্যময় মৃত্যু নায়িকার
রাষ্ট্রপতির হাত ধরে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু
রাষ্ট্রপতির হাত ধরে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু
ধর্মীয় উপাসনালয়ের কর্মীদের সম্মানী ও উৎসব ভাতা দেবে সরকার
ধর্মীয় উপাসনালয়ের কর্মীদের সম্মানী ও উৎসব ভাতা দেবে সরকার
প্রসঙ্গ ছাত্রী হলের গেট ২৪ ঘণ্টা খোলা: পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি 
প্রসঙ্গ ছাত্রী হলের গেট ২৪ ঘণ্টা খোলা: পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি 
সর্বশেষসর্বাধিক