নবায়নযোগ্য শক্তি: দেশে জ্বালানি সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার ঢেউ এখন বাংলাদেশের রান্নাঘর পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে বিপর্যয় শুরু হয়েছিল, তা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্যের ক্রমাগত ওঠানামা—এই সব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ আজ এক গভীর জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। জ্বালানি তেলের সংকট, শিল্পে উৎপাদন হ্রাস, কৃষিতে সেচ সংকট—এগুলো এখন আর পত্রিকার শিরোনাম নয়, বরং কোটি মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।

কিন্তু এই সংকটের অন্ধকারের ভেতরেও একটি আলোর রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই দুঃসময়ই হয়তো বাংলাদেশকে বাধ্য করবে সেই পথে হাঁটতে, যে পথে হাঁটা উচিত ছিল বহু আগেই—নবায়নযোগ্য শক্তির পথে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবো, নাকি আবারও স্বল্পমেয়াদি সমাধানের ফাঁদে পড়ে দীর্ঘমেয়াদি সর্বনাশ ডেকে আনবো?

বাংলাদেশ তার মোট জ্বালানির একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), কয়লা এবং জ্বালানি তেল আমদানিতে প্রতি বছর বিদেশে চলে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যখন চাপে থাকে, তখন এই আমদানি ব্যয় রীতিমতো অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে আমরা দেখেছি, ডলার সংকটের কারণে জ্বালানি আমদানিতে বিঘ্ন ঘটলে কীভাবে পুরো দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা টলমল করে ওঠে। কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, কৃষক সেচ পান না, হাসপাতালের জেনারেটরে জ্বালানি ফুরিয়ে আসে—একটি আমদানি সংকট কতটা গভীরভাবে মানুষের জীবনে আঘাত করতে পারে, তা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।

এই আমদানিনির্ভরতা শুধু অর্থনৈতিক দুর্বলতা নয়, এটি একটি মারাত্মক কৌশলগত ঝুঁকিও। যেকোনও আন্তর্জাতিক সংঘাত বা সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা এমন একটি দেশ, যার জ্বালানি ভাগ্য নির্ধারিত হয় মস্কো, রিয়াদ বা ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তে—এটি কোনও স্বাধীন দেশের জন্য গর্বের বিষয় নয়। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র টেকসই পথ হলো নিজেদের মাটিতে, নিজেদের সম্পদ থেকে শক্তি উৎপাদন—অর্থাৎ নবায়নযোগ্য শক্তি।

অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশ একটি ছোট, ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, তাই নবায়নযোগ্য শক্তি এখানে সম্ভব নয়। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল এবং এই ভুল ধারণা আমাদের অগ্রগতিকে বছরের পর বছর ধরে আটকে রেখেছে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য শক্তির জন্য প্রকৃতিগতভাবে অত্যন্ত অনুকূল একটি দেশ। বছরে গড়ে প্রায় ২৫০ দিনেরও বেশি সময় প্রচুর সূর্যালোক পাওয়া যায়, যা সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আদর্শ। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে—বিশেষত কক্সবাজার, পটুয়াখালী, ভোলা এবং সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ু প্রবাহের গতিবেগ যথেষ্ট শক্তিশালী, যা বাণিজ্যিক বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত। গ্রামাঞ্চলে কৃষি বর্জ্য ও গবাদিপশুর মলমূত্র থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদনের এক বিশাল অব্যবহৃত সম্ভাবনা রয়ে গেছে। দেশের হাওর অঞ্চল ও বিশাল জলরাশিতে ভাসমান সোলার প্যানেল স্থাপনের সুযোগ রয়েছে, যা জমির সংকটকেও অতিক্রম করতে পারে।

আর ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ইডকলের মাধ্যমে ৬০ লাখেরও বেশি পরিবারে সোলার হোম সিস্টেম পৌঁছে গেছে—এই সাফল্য প্রমাণ করে যে সঠিক নীতি ও প্রণোদনা থাকলে বাংলাদেশের মানুষ নবায়নযোগ্য শক্তিকে সহজেই গ্রহণ করতে পারে। এখন দরকার এই ছোট সাফল্যকে বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া।

বাংলাদেশ সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। কাগজে-কলমে এটি একটি উচ্চাভিলাষী ও প্রশংসনীয় লক্ষ্য। কিন্তু বর্তমানে মোট বিদ্যুতের মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ আসছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। লক্ষ্য আর বাস্তবতার এই বিশাল ব্যবধান আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে।

তাহলে প্রশ্ন হলো সমস্যা কোথায়? প্রথমত, নবায়নযোগ্য শক্তিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ এখনও অপ্রতুল। কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে যে পরিমাণ ভর্তুকি ও বিনিয়োগ যাচ্ছে, তার ভগ্নাংশও যদি সোলার ও বায়ু প্রকল্পে যেত, তাহলে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। দ্বিতীয়ত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। তৃতীয়ত, জাতীয় গ্রিডকে নবায়নযোগ্য শক্তির জন্য প্রস্তুত করা হয়নি—সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন না হলে উৎপাদন বাড়লেও তা কাজে লাগবে না। এই নীতিগত দুর্বলতাগুলো দূর না করলে যত বড় লক্ষ্যমাত্রাই ঘোষণা করা হোক না কেন, তা কাগজেই থেকে যাবে।

শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বাংলাদেশের বেসরকারি খাতকে এই রূপান্তরে নেতৃত্ব দিতে হবে। ইতোমধ্যে কিছু দূরদর্শী উদ্যোক্তা সোলার মিনি-গ্রিড, কৃষিক্ষেত্রে সোলার সেচপাম্প এবং শিল্পকারখানায় রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে এগিয়ে এসেছেন। এই উদ্যোগগুলোকে নীতিসহায়তা ও কর-ছাড়ের মাধ্যমে আরও উৎসাহিত করতে হবে।

পাশাপাশি, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জলবায়ু-সংকটপ্রবণ দেশগুলোতে নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্পে অর্থায়ন করতে সদা আগ্রহী। জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম শিকার দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা পাওয়ার অধিকার রাখে। এই কূটনৈতিক সুযোগকে কাজে লাগানো সরকারের একটি জরুরি দায়িত্ব।

যুদ্ধ থামলেও চ্যালেঞ্জ থামবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ আগামী দশকগুলোতে আরও গভীর সংকটের মুখে পড়বে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তীব্র ঘূর্ণিঝড় এবং লবণাক্ততার বিস্তার—এই পরিবেশগত বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলেও জ্বালানি-স্বনির্ভরতা অপরিহার্য। দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীভূত জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, কিন্তু বিকেন্দ্রীভূত সোলার সিস্টেম চলতে থাকে—এটি শুধু পরিবেশের জন্য নয়, দুর্যোগ প্রতিরোধের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাছাড়া, বৈশ্বিক জীবাশ্ম জ্বালানির মজুত ক্রমশ কমছে এবং এর দাম ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। আজ যে দেশ নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ করবে, কাল সেই দেশ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে উৎপাদনশীলতায় এগিয়ে থাকবে। সবুজ শক্তির দিকে বৈশ্বিক যে রূপান্তর ঘটছে, তাতে পিছিয়ে থাকা মানে শুধু পরিবেশগত ক্ষতি নয়, অর্থনৈতিকভাবেও পিছিয়ে পড়া।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য কিছু নির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। প্রথমত, ছাদ-সোলার নীতিমালা সহজ ও আকর্ষণীয় করতে হবে এবং নেট মিটারিং ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে সাধারণ পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ উৎপাদন করে গ্রিডে সরবরাহ দিতে পারে এবং বিনিময়ে ন্যায্য মূল্য পায়। দ্বিতীয়ত, হাওর ও বিশাল জলাশয়গুলোতে ভাসমান সোলার প্যানেল প্রকল্প দ্রুত সম্প্রসারিত করতে হবে—এটি একইসঙ্গে জমি ও বিদ্যুতের দুটি সমস্যার সমাধান দিতে পারে। তৃতীয়ত, কক্সবাজার ও দক্ষিণ উপকূলে অফশোর বায়ু টার্বাইন স্থাপনে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আনতে হবে এবং এ লক্ষ্যে দ্রুত একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। চতুর্থত, কৃষি খাতে সোলার সেচপাম্পের ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে, জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদা কমবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হবে। পঞ্চমত, নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন বন্ধ করতে হবে এবং বিদ্যমান জীবাশ্ম জ্বালানি ভর্তুকির একটি অংশ নবায়নযোগ্য শক্তি গবেষণা ও অবকাঠামো উন্নয়নে পুনর্বণ্টন করতে হবে।

যুদ্ধ থামে, সংকট কাটে—কিন্তু জ্বালানি-নিরাপত্তার প্রশ্ন চিরকালীন। বাংলাদেশ যদি এই সংকটকে কেবল একটি সাময়িক বিপদ মনে করে পুরোনো পথেই হাঁটতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে। কিন্তু যদি এই দুঃসময়কে একটি জাতীয় জাগরণের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা যায়— যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বেসরকারি উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে নবায়নযোগ্য শক্তিতে সাহসী বিনিয়োগ করা যায়— তাহলে বাংলাদেশ একটি শক্তি-স্বনির্ভর, সবুজ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।

সূর্য প্রতিদিন আমাদের মাথার ওপর উঠছে। বায়ু প্রতিনিয়ত আমাদের উপকূল ছুঁয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতি তার শক্তি আমাদের দিতে প্রস্তুত—কেবল আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। আর সেই সিদ্ধান্ত নিতে আর দেরি করার কোনও সুযোগ নেই।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক-প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর