কিছু দিন আগে চ্যাটজিপিটিকে আমি একটি সংবেদনশীল প্রশ্ন করেছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম, মানুষ যখন আত্মহত্যার কথা ভাবে, তখন তার মনে কী চলে? আসলে আমি আত্মহত্যা প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কিছু কাজ করতে চেয়েছিলাম। তো প্রশ্নের উত্তরে চ্যাটজিপিটি সরাসরি কোনও বিপজ্জনক নির্দেশনা না দিলেও বারবার সতর্ক করছিল। সহানুভূতি আর প্রফেশনাল কারও সাহায্য খোঁজার পরামর্শ দিয়েছিল।
আমি বেশ অবাকই হয়েছিলাম। কারণ এর কিছু দিন আগেই আমি খবরের কাগজে দেখেছিলাম ক্যালিফোর্নিয়ার স্টেট আদালতে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে সাতটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রায় সব মামলাতেই অভিযোগ ছিল, চ্যাটজিপিটি মানসিকভাবে সংবেদনশীল ব্যবহারকারীদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে ফ্লোরিডার এক কিশোরের মৃত্যুর পর তার পরিবারের পক্ষ থেকে একটি মামলা হওয়ার পরপরই বিতর্কের মুখে পড়ে চ্যাটজিপিটি।
তখন আমি ভেবেছিলাম, বিপজ্জনক বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে চ্যাটজিপিটি হয়তো তাদের স্ট্রাটেজি পরিবর্তন করেছে।
এর মাঝেই ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি নিখোঁজ হন। এখন অবশ্য তারা দুজনই হত্যার শিকার হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে লিমনের লাশ পাওয়া গেছে। আর একজনের শরীরের কিছু খণ্ডিত অংশ পাওয়া গেছে। যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে—সেটি বৃষ্টির মৃতদেহের অংশ হতে পারে। এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশজুড়েই তোলপাড় চলছে। অবশ্য এরই মধ্যে তাদের খুনি সন্দেহে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত এক মার্কিন নাগরিক হিশাম সালেহ আবুঘরবেহকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ পর্যায়ের (ফার্স্ট ডিগ্রি) দুটি হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা আবুঘরবেহর ফোন ঘেঁটে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন। সেই তথ্যানুযায়ী, লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন আগে থেকেই আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটিকে একাধিক প্রশ্ন করেছিলেন। ১৩ এপ্রিল করা প্রথম প্রশ্নে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, কোনও ব্যক্তিকে যদি একটি কালো রঙের আবর্জনার ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়, তাহলে কী ঘটতে পারে?
লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার একদিন আগে আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করেন, ‘একটি গাড়ির যানবাহন শনাক্তকরণ নম্বর (ভিআইএন) কি পরিবর্তন করা যায়?’ এবং ‘লাইসেন্স ছাড়া বাড়িতে কি বন্দুক রাখা যায়?’ তবে চ্যাটজিপিটি এসব প্রশ্নের উত্তর কী দিয়েছিল, তা নথিতে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একজন মানুষ কেন অপরাধ করার আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে এমন প্রশ্ন করবে? এটি কি কেবল কৌতূহল নাকি একটি পরিকল্পিত অপরাধের অংশ? আর যদি পরিকল্পনা হয়, তাহলে এই প্রশ্নগুলো তার মানসিক অবস্থা সম্পর্কে আমাদের কী ইঙ্গিত দেয়?
প্রথমত, আবুঘরবেহর প্রশ্নগুলো লক্ষ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এগুলো তার তাৎক্ষণিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়। হঠাৎ রাগের বশে করে ফেলা অপরাধ নয়। বরং ধাপে ধাপে আগানো একটি চিন্তার প্রক্রিয়া। লাশ গুম করা, শনাক্তকরণ নম্বর পরিবর্তন করা, অস্ত্র রাখার আইন—এই প্রশ্নগুলো একসঙ্গে একটি সম্ভাব্য পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ, ঘটনাটি হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া নয়, বরং পূর্ব পরিকল্পিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। হয়তো তিনি দীর্ঘদিন ধরেই এই পরিকল্পনাটি করে আসছেন। কেন তিনি হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ করলেন, তা জানতে হয়তো আরও সময় লাগবে।
দ্বিতীয়ত, এমন ঘটনায় অনেকেই তার মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু কোনও ক্লিনিক্যাল মূল্যায়ন ছাড়া এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। এখন পর্যন্ত তার মানসিক অসুস্থতাজনিত কোনও খবর আমরা পাইনি। বরং এখানে যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো— ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা। আবুঘরবেহ জানতেন, তিনি যা করতে যাচ্ছেন, তা তাকে আইনি ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তাই আগেভাগেই সম্ভাব্য ফলাফল বোঝার চেষ্টা করেছেন। এ ধরনের আচরণ বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতার নয়, বরং একটি হিসাবি মানসিকতারই ইঙ্গিত দেয়। অপরাধ করে সহজে পার পেয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজছিলেন তিনি। এই বিষয়টি আবার খুব একটা স্বাভাবিক মানসিকতারও পরিচয় দেয় না।
তৃতীয়ত, এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—চ্যাটজিপিটি কি এই অপরাধে কোনও ভূমিকা রেখেছে? বাস্তবতা হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে কোনও উদ্দেশ্য তৈরি করে না। এটি ব্যবহারকারীর প্রশ্নের প্রতিক্রিয়া জানায়। ফলে, একজন ব্যক্তি যদি অপরাধমূলক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন করেন, প্রযুক্তি সেটিকে প্রতিফলিত করে—সৃষ্টি করে না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, চ্যাটজিপিটি এখানে সহায়ক নয়। তবে চ্যাটজিপিটি তো মানুষেরই সৃষ্টি। তাই সংবেদনশীল প্রশ্নগুলোতে আরও সতর্কতার সঙ্গে উত্তর দেওয়াটা এখন সময়ের দাবি।
কারণ ইতিহাস বলছে, প্রযুক্তি সবসময়ই মানুষের হাতে একটি যন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। একসময় দ্রুতগতির গাড়ি, পরে ইন্টারনেট, এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—প্রতিটি প্রযুক্তিই মানুষের হাতেই ভালো-খারাপ—দুই দিকই ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন, পারমাণবিক প্রযুক্তি একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়, আবার অপরদিকে ধ্বংসাত্মক অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। একইভাবে ইন্টারনেট যেমন জ্ঞান ও যোগাযোগের নতুন দিগন্ত খুলেছে, তেমনই সাইবার অপরাধেরও পথ তৈরি করেছে। প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি কী অপরাধকে সহজ করে দিচ্ছে, নাকি মানুষই তার অপরাধপ্রবণ মনের সহজাত প্রবণতার জন্য নতুন পথ খুঁজে নিচ্ছে?
তবে এখানে আরেকটি বিষয়ও উঠে এসেছে। কেউ যদি মনে করেন, অনলাইনে প্রশ্ন করলেই তা অদৃশ্য হয়ে যায়—তাহলে সেটি ভুল। ডিজিটাল যুগে প্রতিটি অনুসন্ধানই একটি চিহ্ন রেখে যায়। ফলে, এ ধরনের প্রশ্ন অনেক সময় অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যে তথ্য তাকে নিরাপদ রাখবে বলে ভাবার কথা, সেটিই শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে পারে।
হিশাম আবুঘরবেহর ঘটনাটি তাই আমাদের একটি অস্বস্তিকর সত্যের সামনে দাঁড় করায়। প্রযুক্তি বদলায়, পদ্ধতি বদলায়—কিন্তু মানুষের অপরাধ করার মৌলিক প্রবণতা খুব বেশি বদলায় না।