রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন ঘিরে পদত্যাগের গল্প আর ‘ষড়যন্ত্রের ধোঁয়া’

সাবির মুস্তাফা
২৩ জুলাই ২০২৬, ২৩:৩৭আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ০০:০৫

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অবস্থান আবারও চাপের মুখে পড়েছে। তবে এবার চাপটা ছাত্রদের বিক্ষোভ বা সরকারের মন্ত্রীদের প্রকাশ্য অপমানজনক মন্তব্য থেকে আসছে না। এবার চাপ আসছে গুজব আর বেনামি সূত্রের মন্তব্য থেকে। অবস্থাদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, এ দফায় সাহাবুদ্দিনের শেষ রক্ষা হবে না। গুজবের সূচনাই হয়েছিল তার ‘স্বেচ্ছায় পদত্যাগ’-এর গল্প দিয়ে। কিন্তু সেই হালকা মেজাজের গল্প ডানা মেলে অনেক দূর ছড়িয়েছে। এমনকি ‘গোয়েন্দা সূত্র’ ও বেনামি সূত্রের বরাতে ষড়যন্ত্রের ধোঁয়াও তোলা হয়েছে।

তবে গুজব, অপতথ্য বা প্রোপাগান্ডা—যাই হোক না কেন, বিরামহীন এই প্রচারণার মুখে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। তারপরও এখানে কিছু বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করার প্রয়োজন আছে।

বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত যেসব গুজব ছড়ায়, সেগুলোর বেশিরভাগই স্রেফ গুজব হিসেবেই থেকে যায়। কিন্তু কিছু গুজব উদ্দেশ্যমূলকভাবেই ছড়ানো হয়, যাতে রটনা সত্যিই ঘটনায় পরিণত হয়। যেমন ধরুন, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের সম্ভাবনা কি শুধুই গুজব, নাকি এর মধ্যে বাড়তি কিছু মালমসলা আছে? দেশের প্রতিষ্ঠিত পত্রপত্রিকা যখন পদত্যাগের তথ্য ‘খবর’ হিসেবে প্রকাশ করছে, তখন এখানে দুটি সম্ভাবনা থাকতে পারে।

প্রথমত, ঘটনা সত্য এবং সরকারের ভেতরের একটি অংশ খবরটি বাজারে ছেড়ে প্রতিক্রিয়া যাচাই করছে। দ্বিতীয়ত, খবরটি এখনও পাকাপোক্ত নয়, কিন্তু সরকারের একটি মহল এই খবর রটিয়ে রাষ্ট্রপতির অবস্থানকে এমনভাবে দুর্বল করে দিতে চাইছে, যাতে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

হাসিনার সঙ্গে ‘ফোনালাপের’ ধোঁয়া

পত্রপত্রিকায় বেনামি ‘সূত্রের’ বরাতে অনেক কিছু প্রকাশ করা হচ্ছে। এগুলোর কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা, তা যাচাই করা না গেলেও উদ্দেশ্য আঁচ করা সম্ভব।

একটি পত্রিকার খবরে বলা হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি গত মে মাসে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে থাকাকালে টেলিফোনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন। এই তথ্য সম্পর্কে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অবগত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে দ্য ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়।

তবে বাংলা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, স্বয়ং রাষ্ট্রপতি নিজেই শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপের বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন। বাংলা ট্রিবিউনের পাঠানো প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন এক হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় বলেছেন, ‘এটি কল্পনার বাইরে।’

বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন প্রকাশের পর দ্য ডেইলি স্টার টেলিফোনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলে জানতে চায়, শেখ হাসিনার সঙ্গে তার ফোনালাপ হয়েছিল কিনা। জবাবে রাষ্ট্রপতি বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে বলেন, ‘এটা পুরোপুরি ভিত্তিহীন। কারও যদি মাথা খারাপ হয়, সে এ ধরনের কথা বলতে পারে।’

বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সাংবাদিকদের বলেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির ফোনালাপের কোনও তথ্য তাঁদের কাছে নেই। অর্থাৎ, উল্লেখিত ‘গোয়েন্দা সূত্রের’ তথ্যের সত্যতা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যে তাদের নির্দিষ্ট কোনও উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য পত্রপত্রিকার মাধ্যমে অপতথ্য ছড়ায়, তা নতুন কিছু নয়।

ডেইলি স্টার-এর আগের প্রতিবেদনে অজ্ঞাতনামা বিএনপি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, অন্যান্য বিষয়ও এখানে জড়িত আছে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে, কিছু দিন আগে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার ঘোষণা এবং সেটিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ।

‘শিশু আর পাগল’

এই তথ্য দেখে মনে হয়, শেখ হাসিনার ঘোষণা সরকারের একাংশকে আতঙ্কিত করেছে এবং তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কাউকে ক্ষমতার দোরগোড়ায় রাখতে নারাজ। হয়তো তাদের আশঙ্কা, রাষ্ট্রপতি—যার কার্যত কোনও নির্বাহী ক্ষমতা নেই—কোনও না কোনোভাবে শেখ হাসিনার অনুকূলে কিছু করতে পারেন।

বিএনপির হয়তো মনে আছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাতেই রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির নির্দেশ দেন। তিনি কোন ক্ষমতাবলে, কোন প্রক্রিয়ায় এই নির্দেশ দিয়েছিলেন, তার ব্যাখ্যা কেউ চায়নি; সে সময় ব্যাখ্যা দেওয়ারও কোনও প্রয়োজন ছিল না।

তারা কি আশঙ্কা করছেন, সাহাবুদ্দিন একইভাবে শেখ হাসিনাকেও ‘ক্ষমা’ করে দিতে পারেন? সেই আশঙ্কা অবশ্য অবাস্তব। কারণ, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যা সম্ভব হয়েছিল, ২০২৬ সালের বাস্তবতায় তা অসম্ভব।

তা ছাড়া মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগের ভেতরে মোটেই জনপ্রিয় নন। তিন বছর আগে রাষ্ট্রপতি পদে তার মনোনয়ন দলের ভেতরে অনেক নবীন-প্রবীণ নেতাকর্মীকে ক্ষুব্ধ করেছিল। কাজেই, সাহাবুদ্দিন কোনোভাবে আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখবেন—এমনটা হয়তো শিশু বা পাগল ছাড়া কেউ মনে করেন না।

তারেক রহমানের সম্মান

এখানে আশ্চর্যের বিষয় হলো, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন নিজেই একাধিকবার তার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা বলেছেন। নির্বাচনের আগে তিনি বলেছিলেন, নতুন সরকার গঠনের পর তিনি পদত্যাগ করবেন। তার প্রতি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অসম্মান ও অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণকে তিনি পদত্যাগের ইচ্ছার কারণ হিসেবে দেখিয়েছিলেন।

নির্বাচনের পর বিএনপির প্রধান এবং নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দৃশ্যত রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে তার পদমর্যাদার উপযুক্ত সম্মান দেখিয়েছেন। সাহাবুদ্দিন ও রহমানের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠার ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছিল। রাষ্ট্রপতি গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি দায়িত্বে বহাল থাকতে ইচ্ছুক। তবে সরকার যদি তাঁকে সরিয়ে দিতে চায়, তাহলে তিনি সানন্দে পদত্যাগ করবেন।

অর্থাৎ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি অনুরোধ করেন, তাহলে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে দ্বিধা করবেন না। এখানে কোনও তিক্ততা থাকার প্রশ্নই ওঠে না।

তাহলে হঠাৎ এই গুঞ্জন, গুজব কেন? বেনামি খবরের আশ্রয় তো তখনই নেওয়া হয়, যখন কর্তৃপক্ষ নিজেদের নাম-পরিচয় আড়াল রেখে কোনও একটি ঘটনা ঘটাতে চায়।

তাহলে কি রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের এই প্রচেষ্টার পেছনে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি নেই? যদি তা-ই হয়, তাহলে এই প্রচারণার লক্ষ্য শুধু রাষ্ট্রপতির অবস্থান দুর্বল করাই নয়, বরং প্রধানমন্ত্রীর ওপর একটি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী এবং তার মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা যদি রাষ্ট্রপতির বিদায়ে একমত হতেন, তাহলে এমন লুকোচুরি বা বেনামি সূত্রের বরাত দিয়ে পত্রপত্রিকায় ‘তথ্য’ ছড়ানোর প্রয়োজন হতো না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেছেন, পদত্যাগের জন্য রাষ্ট্রপতির ওপর সরকারের কোনও চাপ নেই।

বঙ্গভবন থেকে উৎখাতের প্রচেষ্টা

এসব সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতির ‘আসন্ন পদত্যাগের’ গল্প নিজস্ব একটি গতি অর্জন করেছে এবং তা প্রবল বেগে গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক মাধ্যমে কোনও কিছু ভাইরাল হয়ে গেলে তা থামানো প্রায় অসম্ভব। তখন আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে—যা রটে, তা কিছুটা তো বটে?

রাষ্ট্রপতি যদি নিজেই, সরকারের কোনও অনুরোধ বা চাপ ছাড়াই পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তাহলে তার ব্যাখ্যা তিনি একসময় দেবেন—এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তিনি পদত্যাগপত্র পাঠাবেন জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে। তবে তার আগে প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি অবহিত করবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁদের মধ্যে এ বিষয়ে কোনও আলোচনা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না।

অন্যদিকে, যেভাবে পদত্যাগের ‘খবর’ প্রথমে সামাজিক মাধ্যমে, পরে গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, তা দেখে মনে হয়—এই পদত্যাগ, যদি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা পুরোপুরি স্বেচ্ছায় হচ্ছে না। একই সঙ্গে এতে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি সম্পৃক্ততাও আছে বলে মনে হয় না।

মো. সাহাবুদ্দিনকে বঙ্গভবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা আগেও দেখা গেছে, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। তখন চাপ এসেছিল প্রকাশ্যে। ২০২৪ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ইনকিলাব মঞ্চসহ বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়। এমনকি বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের চেষ্টাও করা হয়েছিল।

ছাত্রদের আন্দোলনের সময় একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল যে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ না করে পারবেন না। কিন্তু পরে দেখা যায়, বিএনপি এবং সামরিক বাহিনী সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের বিরোধিতা করে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তারা সাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগে বাধ্য করতে সক্ষম হয়নি।

বর্তমান পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। একটি নির্বাচিত সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা নয়। নির্বাচিত সরকারের প্রধানের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সম্পর্কও দৃশ্যত ভালো। পদে বহাল থাকা বা না থাকার বিষয়ে দুজনের মধ্যে খোলামেলা আলোচনার পথে কোনও প্রতিবন্ধকতা আছে বলেও মনে হয় না।

সরকার বা দল হিসেবে বিএনপি যদি চায় সাহাবুদ্দিনের জায়গায় অন্য কাউকে রাষ্ট্রপতি করতে, তাহলে এখানে কোনও বাধা নেই। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি যখন নিজেই বলেছেন, সরকার চাইলে তিনি সানন্দে পদত্যাগ করবেন।

প্রশ্ন হলো, সাহাবুদ্দিন কি সত্যিই নিজে থেকে সরে যেতে চান? নাকি সরকার তাকে সরাতে চায়? এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য পুরো বিষয়টি নিয়ে জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটাতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক ও পডকাস্টার

/ইউএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
দিনভর আলোচনায় রাষ্ট্রপতি: পদত্যাগ নাকি অপসারণ
দিনভর আলোচনায় রাষ্ট্রপতি: পদত্যাগ নাকি অপসারণ
আমাকে তিনবার বয়কট করা হয়েছে: রুনা লায়লা
আমাকে তিনবার বয়কট করা হয়েছে: রুনা লায়লা
গণভোট অবৈধ হলে বিএনপির সরকারও অবৈধ, তারেক রহমান অবৈধ প্রধানমন্ত্রী: সারজিস
গণভোট অবৈধ হলে বিএনপির সরকারও অবৈধ, তারেক রহমান অবৈধ প্রধানমন্ত্রী: সারজিস
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন ঘিরে পদত্যাগের গল্প আর ‘ষড়যন্ত্রের ধোঁয়া’
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন ঘিরে পদত্যাগের গল্প আর ‘ষড়যন্ত্রের ধোঁয়া’
সর্বশেষসর্বাধিক