খারাপ বা অন্যায় কাজ মুছে দিতে ভালো কিছু প্রয়োজন। এজন্য ভালোর দিকে যেতে হবে। যে ভালো সমাজে পরিবর্তন ও বিকাশ ঘটাবে। নতুনের ছায়াতলে আসবে মানুষ। আলোর পথ ধরে এগিয়ে যাবে সবাই।
দেশে সমাজ, সভ্যতায় যে পচন ধরেছে তা থেকে উত্তরণের জন্য ভালো কিছু প্রয়োজন। পৃথিবীর যত দেশ সংকটের মুখে পড়েছে, তাদের অনেকেই বিকল্প পরিবর্তনে উত্তরণের উপায় খুঁজেছে। ভালো কিছুর চিন্তা করেছে। সেই ভালোটা আসলে কী? আমাদের সামাজিক অবক্ষয় এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে, পচা শামুকে পা কাটার মতো। প্রথমে পচা শামুকে পা কাটলো, তারপর সেফটি। যন্ত্রণায় ডাক্তার দেখানোর পর পায়ের কিছু অংশ কাটা হলো। রোগ সারেনি। এরপর একে একে পুরো পা কাটা হলো। তাতেও সমস্যার সমাধান হয়নি। এবার মৃত্যুর পথে জীবন!
সামাজিক অবক্ষয়ের মাত্রা এমন পর্যায়ে ঠেকেছে, এখন পুরো সমাজ সংকটাপন্ন। অবহেলায় পচা শামুকে পা কাটার গল্পের মতো। রাজনীতি নিজের মতো করে চলছে। নিজস্ব স্টাইলে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কাজ করে যাচ্ছে। সামাজিক সংকট সমাধানে কোনও দলের মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। গত ২৫ বছরে দেশের কোনও নেতা সামাজিক সংকট সমাধানে বিকল্প কোনও চিন্তার কথা বলেছেন বা ভেবেছেন বলে মনে পড়ে না।
সামাজিক সুরক্ষার জন্য রাজনীতির সংস্কৃতির বাইরে বিকল্প আর কী হতে পারে? সেই ভালো হলো সংস্কৃতির জাগরণ বা সাংস্কৃতিক বিপ্লব। এই ভাবনা রাষ্ট্রের মগজ থেকেও কেউ ভাবতে চান না! রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে বাস্তবতা আমরা দেখেছি তা হলো—কোনও কোনও ক্ষেত্রে অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয় প্রশ্রয়ে অপকর্ম করে পার পাচ্ছে। কিংবা রাজনৈতিক শক্তির সাহস নিয়ে অনেকেই অপরাধ করছেন। রাজনীতিকে অনেকেই অপরাধ থেকে পার পাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে দেখেন। বা অপরাধের সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও প্রশাসন যন্ত্রকে অনেক সময় ম্যানেজ করা যায়।
এই সুযোগে সংস্কৃতির বলয় থেকে আমরা দূরে সরে যাওয়ায় সমাজে অপরাধ দিন দিন ভয়ংকর রূপে মাথাচাড়া দিচ্ছে। সংকট মহা-আয়োজনে ঘনীভূত হয়েছে। আমরা একটি অন্ধকারের দিকে যাচ্ছি। অপরাধ কিংবা অপরাধীর এই মনস্তত্ত্বের পরিবর্তনের জন্য চলমান সমাজ ব্যবস্থার কি পরিবর্তন সম্ভব? যদি কার্যকর পথে হাঁটা যায় তবেই সম্ভব এই ক্ষত সারানো বা উপড়ে ফেলার।
বিশ্বে শান্তির দেশের তালিকায় এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অবস্থান কত? অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (আইইপি) গ্লোবাল পিস ইনডেক্স (জিপিআই)-২০২৫ শান্তি সূচকে ৩৩ ধাপ পিছিয়ে ১৬৩টি রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১২৩। সত্যিই এ খবর উদ্বেগের, উৎকণ্ঠার।
বাংলাদেশ ছাড়াও শান্তির সূচকে পিছিয়ে থাকা দেশগুলো হলো—ইউক্রেন, রাশিয়া, মিয়ানমার, কঙ্গো। এসব দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থা সবার জানা। এই ইনডেক্স চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, আমরা খুব খারাপের দিকে যাচ্ছি। এর বড় প্রমাণ হলো সামাজিক বাস্তবতা। এই সূচকের কারণে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে এ নিয়ে কারও ভাবনা আছে?
শান্তির দেশের তালিকা তৈরির জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যেসব বিষয় দেখা হয়, সেগুলোর অন্যতম হলো— অপরাধের হার ও সহিংসতার মাত্রা, সমাজে অস্থিরতা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আশঙ্কা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। এছাড়াও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, হত্যা ও অপরাধজনিত কারণে মৃত্যুর হার। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা এবং তাদের কার্যকারিতা। কারাবন্দির সংখ্যা এবং শরণার্থীদের অবস্থা। এ সব কয়েকটি মানদণ্ডে আমরা পিছিয়ে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় সামাজিক অপরাধ রাষ্ট্রের বড় মাথাব্যথার কারণ কিনা জানি না। বাস্তবতা হলো—পুলিশ প্রশাসন সঠিকভাবে কাজ করতে পারছে না, বা করছে না। দেশে মবের সংস্কৃতি চলছে। অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। আছে বিচারহীনতার সংস্কৃতির বদনাম। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১৮টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ শিশুকে, ধর্ষণের শিকার দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে। বিভিন্ন ঘটনায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১১৫ শিশু খুন হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ ও হত্যার পাঁচটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবক’টিতে শিশুরা প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠজনের শিকার হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পরবর্তী ২০ মাসে ৬৪৩ শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনে নিহত হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ২০৩ জন শিশু নিহত হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এই পরিসংখ্যান ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয়ের স্পষ্ট উদাহরণ। বাবা-মা সন্তানকে হত্যা করছে। সম্পত্তির বিরোধে ও বয়স্ক মা-বাবাকে রাস্তায় ফেলে যাচ্ছে সন্তান। সামান্য ইস্যুতে দেশে খুনোখুনি হচ্ছে। বাড়ছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা আর বিরোধ। সব মিলিয়ে সমাজ রীতিমতো অশান্ত। আমরা অশান্ত সমাজের দাবানলে পুড়ছি।
নির্বিচারে শিশুদের ওপর পাশবিকতা, হত্যা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলেশিশুদের ধর্ষণের মতো অসংখ্য ঘটনার পরও আমরা বলবো—সমাজ পরিবর্তনের জন্য ভাবা উচিত নয়? এই রোগের চিকিৎসার দরকার নেই। যে দেশে শিশুদের ওপর বর্বরতা চলে, সে জাতি-রাষ্ট্র অভিশাপে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা। আমরা শিশুদের সুরক্ষা দিতে পারছি না। রামিসার মতো হয়তো আরও অনেক শিশু নীরবে ভয়ংকর পরিণতির শিকার হচ্ছে। সব কিছু গণমাধ্যমে আসছে না, লোকলজ্জার কারণে অনেক পরিবার তা প্রকাশও করতে চান না। সমাজের এই অস্বাভাবিকতার চিকিৎসা অনিবার্য।
যে নিয়ম স্বাভাবিক পরিস্থিতি ধরে রাখতে পারে না, তখন বোঝা উচিত এই অস্ত্র ভোঁতা হয়ে গেছে। বিকল্প কিছু ভাবতে হবে। অর্থাৎ যে জাতি সংস্কৃতিতে যতটা সমৃদ্ধ সে জাতি ততটা সভ্য ও উন্নত। সংস্কৃতি মানুষকে সভ্য করে তোলে। মনের মধ্যে থাকা দানবকে নিবৃত করে। খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখে। সুস্থ ধারার সংস্কৃতিকে সমাজ বদলের হাতিয়ার বলা হয়। তাই সময় এসেছে সংস্কৃতির বিকাশ, সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও জাগরণের— যা রাজনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে। সমাজ পরিবর্তন ও মানুষের মনোজগৎ বদলাতে সংস্কৃতির দিকে সবাইকে ধাবিত হতে হবে, এটা একটা বিরাট বড় ও কার্যকর ওষুধ।
৫০ বছরের বেশি সময় দেশে সংস্কৃতির স্থবিরতা চলছে। গোটা সাংস্কৃতিক জগৎ অন্ধকার। একমুখী রাজনীতি আর মোবাইল সংস্কৃতির গ্রাসে আমরা সবাই। সংস্কৃতি এমন একটি উপাদান, যা সমাজ চিন্তা, মানসিকতা ও সভ্যতা বদলানোর ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে, অথচ তা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। একে একে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো ছোট হয়ে যাচ্ছে। এলাকাভিত্তিক সাংস্কৃতিক চর্চা নামেমাত্র। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক আয়োজন থামতে শুরু করেছে। গ্রামীণ যাত্রাপালা, নাটক, বিভিন্ন পালা গানের আয়োজন, কবি গান, খেলা, জারি-সারি, গানের আসর, গীত, ধামাইল সব কিছু এখন যেন কাগজের পাতায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠীর সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আগ্রাসন। শিশুদের খেলার মাঠ নেই, প্রয়োজনীয় পার্ক নেই। কমছে সুস্থ ধারার বিনোদন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বাজেট দিন দিন এককেন্দ্রিক ও কম হচ্ছে। বড় বড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো অর্থের অভাবে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। তাহলে মানুষের উন্নত মনোজগৎ ও মানসিকতার বদল কেমনে ঘটবে? অথচ এই উপমহাদেশ ছিল একসময় শিক্ষা সংস্কৃতির উর্বর কেন্দ্র। সংস্কৃতি বিমুখতা আমাদের মন ও চিন্তাকে শক্ত ও অমানবিক করে তুলছে। যেকোনও অপকর্ম করতে মন বাধা দেয় না। তাই অপরাধ বাড়ছে। নিরাপত্তাহীন আমাদের শিশুরা।
সংস্কৃতির বিপ্লব নতুন কিছু নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ পুরোনো প্রথা ভেঙে নতুন সমাজ বদলে সংস্কৃতির পথ ধরে হেঁটেছে। ৯০ দশকে বেলজিয়ামে সামাজিক অপরাধ ঠেকাতে পুরো শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো হয়েছিল। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ইউরোপের অ্যানলাইটেনমেন্ট মুভমেন্ট পুরো পশ্চিমা দুনিয়ায় যে আলোড়ন তৈরি করেছিল, তার মূলকথা ছিল—বিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তির আশ্রয়, ভাবের বিপরীতে বস্তুর প্রাধান্য। উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় যে জাগরণ ঘটে, যার প্রভাব হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। ধর্ম-সংস্কৃতি-সাহিত্য-রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় আদর্শ- সব ক্ষেত্রেই নবীন ভারতে যে রূপান্তর ঘটলো, তার মূলে এক বড় শক্তিরূপে কাজ করেছে এই রেনেসাঁ। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের স্বদেশি আন্দোলনে এই জাগরণ নিজেকে জানান দেয় এক অসাধারণ বিক্রমে।
তাই সামাজিক নিরাপত্তা, সুশাসন, শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, উন্নত ও সভ্য সমাজের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে সংস্কৃতির পথে হাঁটতে হবে। সাংস্কৃতিক বিপ্লব পারে আমাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনতে। সবাইকে নতুন পথ দেখাতে, নিরাপদ সমাজ বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রকে আরও বেশি সুরক্ষিত করতে। সেই সঙ্গে বিশ্বের কাছে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে। সমাজের ক্ষত সরাতে সাংস্কৃতিক বিপ্লব চাই-ই-চাই।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট