বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটাবে ‘পুশইন’ 

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে যে সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা এবং পুশইন তৎপরতা বাড়বে, সেই আশঙ্কা ছিলই— যেটি শুভেন্দু অধিকারীর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে।

গত কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশ-ভারতের বিভিন্ন সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ যে তৎপরতা চালাচ্ছে, সেটি স্পষ্টতই গায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া করা এবং বিএসএফ যে স্বপ্রণোদিত হয়ে এটা করছে, সেটা ভাবার কোনও কারণ নেই। বরং এটা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নির্দেশনায় হচ্ছে এবং এতে যে দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের সায় আছে, সেটিও ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের ব্রিংফিয়ে স্পষ্ট।

গত ৫ জুন দিল্লিতে সাপ্তাহিক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘ভারতে অবস্থানরত সব বিদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রে, তারা বাংলাদেশি হোক বা অন্য যেকোনও দেশের নাগরিক হোক, তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমাদের আইন রয়েছে। সেই আইন অনুযায়ীই তাদের সঙ্গে আচরণ করা হবে।’

আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং মানবিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকার বিস্তীর্ণ পথ দিয়ে জোর করে নারী, পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে বাংলাদেশে পুশইন করা বা ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ। এই তৎপরতা নতুন না হলেও পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের পরে এই প্রবণতা বেড়েছে।

চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পরে ভারতের সঙ্গে যখন বংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকলো, তখনই সীমান্তে পুশইন বেড়ে গিয়েছিল। তবে এবার পুশইন ঠেকাতে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিজিবি বেশ তৎপর। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে আনসার ও ভিডিপি। সেইসঙ্গে সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষও রাত জেগে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে। সবার এই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এখনও পর্যন্ত বিএসএফ কাউকে বাংলাদেশের ভেতরে ঠেলে পাঠাতে সক্ষম হয়নি বা পুশইন করতে পারেনি বলে সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে। তাছাড়া পুশইন ইস্যুতে বিএসএফ সদস্যদের সঙ্গে বিজিবি সদস্যদের বাগবিতণ্ডার যেসব ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে— পুশইন ঠেকাতে বিজিবি এবার জিরো টলারেন্স বা শূন্য সহনশীল নীতি গ্রহণ করেছে— যেটিই প্রত্যাশিত। বিভিন্ন সীমান্তে এ পর্যন্ত বেশ কিছু পুশইন চেষ্টা প্রতিহত করেছে বিজিবি— যা প্রশংসার দাবি রাখে।

মনে রাখতে হবে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী একবার পুশইন করে ফেলতে পারলে, অর্থাৎ লোকজনকে বাংলাদেশের সীমানায় ঠেলে দিতে পারলে ওই লোকদের আবার ভারতে ফেরত পাঠানো খুব কঠিন। কেননা, তখন যাচাই-বাছাই এবং দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের বৈঠকসহ নানা আনুষ্ঠানিকতার ব্যাপার থাকে। কিন্তু বিজিবি যদি কাউকে পুশইন করতেই না দেয়, তাহলে এই জটিলতাগুলো এড়ানো সহজ। তাছাড়া পুশইন শুধু মাত্র পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ইস্যু নয় বা এটি কেবলমত্র বিজিবি-বিএসএফ সমস্যা নয়। বরং একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় তথা বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়। এ নিয়ে যেকোনও আলোচনা হতে হবে ঢাকায় অথবা দিল্লিতে। পশ্চিমবঙ্গে নয়। সীমান্তেও নয়। আলোচনা হবে স্টেট টু স্টেট। ঢাকার সঙ্গে দিল্লির। ঢাকার সঙ্গে কলকাতার নয়।

জুলাই অভ্যুত্থানের পরে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যেভাবে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, সেই জাগয়া থেকে কিছুটা উত্তরণের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিলো গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতার আসার পর থেকে। ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা অনেকটা প্রশমিত হয়ে দু দেশের ভিসা আদান-প্রদানেও জটিলতা কাটতে শুরু করেছিল। কিন্তু এরইমধ্যে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়ের পরে সীমান্তে যে পুশইন তৎপরতা শুরু হয়েছে, সেটি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করবে কিনা, সেটি এখন বড় প্রশ্ন। ভারতীয় মুসলমান মানেই অবৈধ অভিবাসী এবং বাংলাদেশের নাগরিক— এরকম সরলীকরণের চেষ্টা করা হলে বাংলাদেশে বসবাসকারী হিন্দুরাও ভারতীয় নাগরিক, এমন কথাও উঠবে— যা কোনও দেশের জন্য বা কোনও ধর্মের মানুষের জন্যই কল্যাণকর হবে না। রাষ্ট্র মানে সেখানে সব ধর্মের, সব আদর্শের, সব নীতি ও চিন্তার মানুষের সম্মিলন ঘটবে। কিন্তু ভোটের রাজনীতি করতে গিয়ে সেই মানুষকে যখন ধর্মীয় পরিচয়ে চিহ্নিত করে তাকে প্রান্তিক করে দেওয়ার চেষ্টা চলে, সেটি মানবতার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ।

গত বছরের মে মাসেও ভারতীয় সীমান্তরক্ষা বাহিনী পুশইন তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছিল। তখন চোখ ও হাত বেঁধে সীমান্তে এনে লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। দেশের তিনটি সীমান্তপথ দিয়ে অর্ধশত লোককে বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হয়। বৈরী আবহাওয়ার সুযোগে বিএসএফ তাদের হাত ও চোখ বেঁধে নিয়ে আসে। পরে বাঁধন খুলে তাদের বাংলাদেশের ভেতরে ঠেলে দেয়। ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, ভারতে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার নিবন্ধিত বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গাকেও তখন বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়।

তখন প্রশ্ন উঠেছিল, জাতিসংঘের নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদেরকে ভারত কী করে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। কেননা, এটা সুস্পষ্টভাবে জাতিসংঘের সঙ্গে ভারতের শর্তের খেলাপ এবং একইসঙ্গে মানবাধিকারেরও লঙ্ঘন। কিন্তু বাংলাদেশের বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের এই অপতৎপরতার বিরুদ্ধে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাকে অবহিত করেছে বা লিখিতভাবে অভিযোগ জানিয়েছে বলে শোনা যায়নি।

বিভিন্ন সূত্রে তখন জানা গিয়েছিল, গত বছরের মে মাসে হাজারের বেশি মানুষকে ভারত পুশইন করেছে। এর মধ্যে কতজনকে বাংলাদেশ পুশ-ব্যাক করেছে বা করতে পেরেছে, তা নিশ্চিত নয়। আবার যাদেরকে পুশইন করা হয়েছে, তাদের মধ্যে কোনও অপরাধী ছিল কিনা এবং তারা বাংলাদেশের মূল স্রোতে মিশে গিয়ে কোনও ধরনের নাশকতায় জড়িয়ে গেছে কিনা, তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই। তার চেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো, বাংলাদেশ-ভারত দীর্ঘ সীমান্তের পুরোটাজুড়ে সার্বক্ষণিকভাবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির নিশ্ছিদ্র পাহারা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। সীমান্তের অনেক স্পট অরক্ষিত আবার কিছু স্পট দূর্গম। ফলে সীমান্তের কোন ফাঁকফোকড় দিয়ে বিএসএফ কতজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে, তার সঠিক হিসাব বের করা কঠিন।

গত বছরের ওই পুশইন বাংলাদেশ তথা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপে ফেলার ভারতীয় কৌশল বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এখন একটি নির্বাচিত সরকার বাংলাদেশে আছে এবং ভারতের সঙ্গে তারা সম্পর্ক উন্নয়নে আন্তরিক বলেও যখন প্রতীয়মাণ হচ্ছে, তখনও কেন এ ধরনের পুশইন অব্যাহত থাকবে? ভারত কি বিশেষ কোনও কারণে বাংলাদেশকে নতুন করে চাপে ফেলতে চাইছে?

স্মরণ করা যেতে পারে, ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে লালমনিরহাট সীমান্তে দুইশ’র বেশি মানুষকে বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টা করেছিল ভারত। কিন্তু ঢাকার অনমনীয় অবস্থানের কারণে সীমান্তের শূন্যরেখায় তাদের থাকতে হয়েছিল প্রায় দুই মাস। তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোর্শেদ খান এ নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশোবন্ত সিনহার সঙ্গে আলোচনার জন্য দিল্লি গিয়েছিলেন। দিল্লির সঙ্গে আলোচনার ঠিক আগেই দেখা যায়, সীমান্তের শূন্যরেখায় প্রায় দুই মাস ধরে থাকা ওই লোকজন আর নেই। তার মানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সাহসী ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পুশইন বন্ধ হবে না। ভারত যদি বুঝে ফেলে যে, বাংলাদেশ এই ইস্যুতে জোরে কিছু বলবে না বা শক্ত কোনও পদক্ষেপ নিতে পারবে না, তাহলে তারা পুশইন অব্যাহত রাখবে।

বাংলাদেশকে জোরালো ভাষায় পুশইনের প্রতিবাদ করতে হবে। অতীতের মতো ভারত-তোষণ ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতি দিয়ে পুশইন ঠেকানো যাবে না। এখানে সরকারকে মেরুদণ্ড সোজা রেখে ভারতীয় শাসকবর্গের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে হবে। বাংলাদেশ যে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং সে কারণে ভারত একটি বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র হলেও বাংলাদেশের ওপর তার যেকোনও ধরনের খবরদারি বা দাদাগিরির এখতিয়ার নেই, সেটি স্পষ্ট ভাষায় ভারত সরকারকে জানাতে হবে। প্রয়োজনে পুশইনের মতো এই অন্যায্য তৎপরতা ঠেকাতে বাংলাদেশকে তার বিদেশি অন্য বন্ধুদেরকে যুক্ত করতে হবে। বৈশ্বিক জনমত গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে বিষয়টি নিয়ে শুধু পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে নয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ফোনে কথা বলতে পারেন।

এটা যেহেতু একটা আন্তঃরাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক ও মানবিক ইস্যু—অতএব, রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিকভাবেই এর সমাধান করতে হবে। ভারতের কাছ থেকে এই প্রতিশ্রুতি ও নিশ্চয়তা গ্রহণ করতে হবে যে, তারা সীমান্তে পুশইন তৎপরতা বন্ধ করবে। যদি ভারত এটা বন্ধ না করে তাহলে বাংলাদেশ কী করবে— সেটিও ভারতকে জানিয়ে দেওয়া প্রয়োজন।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক