কেন সরকারি চাকরিজীবীদের পে-স্কেল প্রয়োজন? 

রিয়াজুল হক
০৯ জুন ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ০৯ জুন ২০২৬, ১২:০০

সেলিম (ছদ্মনাম) এইচএসসি পাশ করার পর অষ্টম শ্রেণী পাশের একটি সার্কুলারে আবেদন করে এবং ২০০৩ সালে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। প্রায় তেইশ বছর তার চাকরির বয়স। কয়েকদিন আগে মাছের বাজারে তাকে দেখলাম। সেলিম তেলাপিয়া মাছ কিনছিল। আমি তার সামনে যেতেই কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। আমার দিকে না তাকিয়েই বললো, ‘‘পরে কথা বলবো বন্ধু, এখন একটু ব্যস্ত আছি।’’

‎বলে রাখা ভালো, আমি আর সেলিম স্কুলে একসাথে পড়তাম। সেলিম চলে যাওয়ার পর, আমি একটু কৌতূহলবশত সেই মাছের দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘তেলাপিয়ার কেজি কত?’’

‎মাছ বিক্রেতা বললেন, ‘‘একদম ৫০ টাকা।’’

‎আমি বললাম, ‘‘মাছ থেকে তো গন্ধ বের হচ্ছে।’’

‎মাছ বিক্রেতা বললেন, ‘‘একটু নরম হইছে। এজন্য তো কমে দিতাছি। নইলে ১৫০ টাকার নিচে পাইতেন না।’’

তখন আমি বুঝতে পারলাম, সেলিম কেন আমাকে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে তাড়াতাড়ি চলে গিয়েছিল।

‎রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান শক্তি হলো তার সরকারি চাকরিজীবীরা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আর্থিক খাতের তদারকি, আইনশৃঙ্খলা, রাজস্ব আদায়, বিচার সহায়তা, কৃষি সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন— রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত সরকারি চাকরিজীবীরা। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে যদি তাদের বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না থাকে, তাহলে তা শুধু কর্মচারীদের ব্যক্তিগত জীবনে নয়, রাষ্ট্রের সামগ্রিক সেবাদান ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সময়োপযোগী পে-স্কেল কোনও বিলাসিতা নয়, এটি একটি বাস্তব প্রয়োজন।

‎বাংলাদেশে সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয় ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে দেশের অর্থনীতি যেমন পরিবর্তিত হয়েছে, তেমনই পরিবর্তিত হয়েছে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষা খরচ, পরিবহন ব্যয় সবকিছুই উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন কোনও পে-স্কেল আসেনি। ফলে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্রমেই কমে এসেছে।

‎একজন সরকারি চাকরিজীবীর বেতন কেবল তার ব্যক্তিগত আয়ের বিষয় নয়— এটি তার পরিবারের জীবনমানের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন সরকারি চাকরিজীবী যখন মাসের শেষে তার বেতন হাতে পান, তখন সেই অর্থ দিয়ে তাকে বাসাভাড়া, পরিবারের খাদ্য, সন্তানের লেখাপড়া, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ইন্টারনেট, যাতায়াতসহ নানা ধরনের খরচ মেটাতে হয়। কিন্তু যখন বাজারের দ্রব্যমূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং আয় একই জায়গায় স্থির থাকে, তখন তার জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি হয়।

‎আজকের বাজার বাস্তবতা বিবেচনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। দশ বছর আগে যে অর্থ দিয়ে একটি পরিবারের মাসিক বাজার করা সম্ভব ছিল, বর্তমানে সেই একই বাজার করতে অনেক বেশি অর্থ প্রয়োজন হচ্ছে। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, সবজি— প্রায় সব পণ্যের দামই বেড়েছে। শহরাঞ্চলে বাসাভাড়া এবং সন্তানের শিক্ষাব্যয় অনেক পরিবারের জন্য বড় ধরনের চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি স্কুল-কলেজের ফি, কোচিং, বইপত্র, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার খরচ— সবকিছুই আগের তুলনায় অনেক বেশি। একইভাবে চিকিৎসা ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

‎এই বাস্তবতায় একজন সরকারি চাকরিজীবী যদি তার পরিবারের ন্যূনতম চাহিদাগুলো পূরণ করতেই হিমশিম খান, তাহলে তার পক্ষে শতভাগ মনোযোগ দিয়ে রাষ্ট্রের কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা ছাড়া উচ্চমাত্রার কর্মদক্ষতা প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই পে-স্কেলকে কেবল অর্থনৈতিক বিষয় হিসেবে নয়, মানবিক বিষয় হিসেবেও দেখা উচিত।

‎সরকারি চাকরি দীর্ঘদিন ধরে সম্মানজনক ও স্থিতিশীল পেশা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে মেধাবী তরুণদের একটি বড় অংশ বেসরকারি খাত কিংবা বিদেশমুখী হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো আয় ও সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী যখন দেখে যে, একই যোগ্যতা নিয়ে বেসরকারি খাতে বা বিদেশে অনেক বেশি আয় করা সম্ভব, তখন সরকারি চাকরির প্রতি তার আগ্রহ কমে যেতে পারে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র মেধাবী জনবল আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

‎একটি আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য দক্ষ, সৎ ও মেধাবী জনবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই জনবলকে আকৃষ্ট ও ধরে রাখতে প্রতিযোগিতামূলক বেতন কাঠামো প্রয়োজন। উন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশই নিয়মিতভাবে তাদের সরকারি কর্মচারীদের বেতন পর্যালোচনা করে থাকে।

‎পে-স্কেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক মর্যাদা ও মানসিক প্রশান্তি। একজন সরকারি চাকরিজীবী যখন তার সততা বজায় রেখে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন, তখন তিনি আত্মমর্যাদাবোধ নিয়ে কাজ করতে পারেন। কিন্তু যখন আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়, তখন মানসিক চাপ বাড়ে। পরিবারের চাহিদা পূরণ করতে না পারার কষ্ট একজন মানুষের কর্মোদ্যমকে প্রভাবিত করতে পারে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি সবার ওপর সমানভাবে প্রভাব ফেলে। একজন অফিস সহায়ক, ড্রাইভার, নিরাপত্তাকর্মী বা নিম্নপদস্থ কর্মচারীর জন্য বাজারের মূল্যবৃদ্ধি অনেক বেশি কষ্টকর বাস্তবতা। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের বেতনের বড় অংশ খাদ্য ও বাসস্থানের পেছনে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে সঞ্চয় করা তো দূরের কথা, মাস শেষে টিকে থাকাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

‎পে-স্কেল বৃদ্ধি মানেই যে রাষ্ট্রের ওপর অযৌক্তিক বোঝা চাপানো, বিষয়টি এমন নয়। বরং এটিকে মানবসম্পদে বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত। একজন আর্থিকভাবে স্বস্তিতে থাকা সরকারি কর্মচারী সাধারণত আরও মনোযোগী, উৎপাদনশীল ও দায়িত্বশীল হন। তার কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, সেবার মান উন্নত হয় এবং জনগণও তার সুফল পায়।

‎এছাড়া মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত বেতন কমে যাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা জরুরি। অর্থনীতির ভাষায় নামমাত্র বেতন অপরিবর্তিত থাকলেও মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত বেতন কমে যেতে পারে। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি আগের তুলনায় একই অর্থ দিয়ে কম পণ্য ও সেবা কিনতে পারেন। গত এক দশকে বাংলাদেশে যে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে, তা সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয়কে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। তাই নতুন পে-স্কেল অনেকাংশে সেটার ভারসাম্য রক্ষার একটি প্রক্রিয়া।

‎তবে পে-স্কেল প্রণয়নের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি। রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা, রাজস্ব আয়, উন্নয়ন ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে। একইসঙ্গে বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে কর্মদক্ষতা, জবাবদিহি এবং সেবার মানোন্নয়নের বিষয়গুলোও যুক্ত করা যেতে পারে। অর্থাৎ এটি এমন একটি প্রক্রিয়া হওয়া উচিত, যাতে কর্মচারী এবং রাষ্ট্র— উভয় পক্ষই উপকৃত হয়।

‎সরকারি চাকরিজীবীদের অনেকেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করেন। দুর্গম চরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা, পাহাড়ি অঞ্চল কিংবা সীমান্ত এলাকায় কর্মরত অসংখ্য চাকুরিজীবী পরিবার থেকে দূরে থেকে রাষ্ট্রের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের ত্যাগ ও অবদান অনেক সময় দৃশ্যমান হয় না। কিন্তু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত ব্যবস্থাপনা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন, কৃষি উন্নয়ন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাদের জন্যও একটি ন্যায্য ও যুগোপযোগী বেতন কাঠামো প্রয়োজন।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। একজন সরকারি চাকরিজীবীও একজন সন্তা, বাবা, মা কিংবা পরিবারের অভিভাবক। তারও স্বপ্ন আছে, দায়িত্ব আছে, উদ্বেগ আছে। তিনি চান বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা করাতে, পরিবারের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়তে। কিন্তু আয়ের সবটাই যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়েই শেষ হয়ে যায়, তাহলে সেই স্বপ্নগুলো ক্রমেই অধরা হয়ে ওঠে।

‎রাষ্ট্রের উন্নয়নের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের জীবনমান উন্নত করা। সরকারি চাকরিজীবীরাও সেই মানুষেরই অংশ। তারা রাষ্ট্রের সেবক, কিন্তু তারাও নাগরিক। তাই তাদের জীবনমানের উন্নয়নকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র তার কর্মচারীদের ন্যায্য জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করবে, এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা।

‎সবশেষে বলা যায়, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেলের দাবি কেবল বেতন বৃদ্ধির দাবি নয়— এটি বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, মানবিক মর্যাদা, কর্মদক্ষতা এবং রাষ্ট্রের সেবার মানের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি যৌক্তিক দাবি। বাজারে জিনিসপত্রের ক্রমবর্ধমান মূল্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার সামগ্রিক ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সময়োপযোগী পে-স্কেল এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রয়োজন। রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও জনগণের সেবার স্বার্থেই সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক নিরাপত্তা এবং সম্মানজনক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা উচিত। কারণ সন্তুষ্ট, নিরাপদ ও প্রেরণাপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীবাহিনীই একটি দক্ষ, কার্যকর এবং জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি।

লেখক: অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

 

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় হাইকোর্টের রায় স্থগিত
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় হাইকোর্টের রায় স্থগিত
নাতনিকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় নানাকে কুপিয়ে হত্যা
নাতনিকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় নানাকে কুপিয়ে হত্যা
মানদণ্ড পূরণ করলে যেকেউ স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে: ডা. জাহেদ  
মানদণ্ড পূরণ করলে যেকেউ স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে: ডা. জাহেদ  
‘সবাইকে নিয়ে অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়তে চেয়েছিলেন জিয়াউর রহমান’
‘সবাইকে নিয়ে অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়তে চেয়েছিলেন জিয়াউর রহমান’
সর্বশেষসর্বাধিক