আমাদের বাস্তবতা কি ‘আনবিলিভেবল’র মতো হতে পারে না 

যৌন সহিংসতার শিকার শিশু ও নারীদের অধিকার ও সঠিক তদন্তের জন্য বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে কেউ বা কোনও সংস্থা যদি ধারাবাহিকভাবে কাজ করে, তাহলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব। সঠিক বিচার এবং উপযুক্ত মানসিক সহযোগিতা পেলে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার একজন মেয়ে, চরম অন্ধকার থেকে বের হয়ে যে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারেন, ’আনবিলিভেবল’-এর সত্য ঘটনা এটিই প্রমাণ করেছে।

২০০৮ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে আমেরিকার ওয়াশিংটন এবং কলোরাডো অঙ্গরাজ্যে ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক ধর্ষণের সত্য ঘটনা এবং পুলিশের ত্রুটিপূর্ণ তদন্তের ওপর ভিত্তি করে তৈরি নেটফ্লিক্সের ‘আনবিলিভেবল’ সিরিজটি। মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখলাম সিরিজটি। শুধু বাংলাদেশের মতো দেশেই নয়, খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও যে ভিকটিমের পক্ষে ধর্ষণের ঘটনা প্রমাণ করা কতটা কঠিন, সিরিজটিতে সেটাই দেখানো হয়েছে। তবে এখানে শেষপর্যন্ত সত্যের জয় হয়েছে।

সিরিজটির মূল ঘটনাটি ২০১৫ সালে প্রোপাবলিকা এবং দ্য মার্শাল প্রজেক্টের প্রকাশিত পুলিৎজারজয়ী অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘An Unbelievable Story of Rape’ থেকে নেওয়া হয়েছে।

২০০৮ সালে ওয়াশিংটনের লিনউডে ১৮ বছর বয়সী মেরি অ্যাডলার (ছদ্মনাম) নামের এক তরুণী পুলিশে অভিযোগ করেন যে, এক মুখোশধারী ব্যক্তি তার ঘরে ঢুকে তাকে ছুরির মুখে বেঁধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধর্ষণ করেছে। মেরি ছোটবেলা থেকেই একাধিক পালক পরিবারে (Foster Care) বড় হওয়ায় মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত ছিলেন।

মানসিক ট্রমার কারণে ধর্ষণ ঘটনার পর তার আচরণে তীব্র কান্নাকাটি বা ভেঙে পড়ার মতো স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ ছিল না। তদন্তকারী পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তারা মেরির এই শান্ত আচরণ এবং জবানবন্দির ছোটখাটো অসঙ্গতি দেখে তাকে সন্দেহ করতে শুরু করেন। এমনকি মেরির এক সাবেক পালক মা-ও পুলিশকে বলেন যে, মেরি হয়তো মনোযোগ পাওয়ার জন্য মিথ্যা বলছেন।

পুলিশ ক্রমাগত মানসিক চাপ দিয়ে মেরিকে জেরা করতে থাকে। একপর্যায়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে মেরি নিজের অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন এবং ‘আমি মিথ্যা বলেছি’ বলে কাগজে সই করতে বাধ্য হন। পুলিশ উল্টো মেরির বিরুদ্ধেই মিথ্যা মামলা দায়ের করে এবং তাকে ৫০০ ডলার জরিমানা করা হয়।

মেরি যখন নিজের শহরে সবার কাছে ‘মিথ্যেবাদী’ হিসেবে লাঞ্ছিত হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই কলোরাডোতে একই কায়দায় বেশ কয়েকজন নারী ধর্ষণের শিকার হন। কলোরাডোর দুই নারী গোয়েন্দা খুব সংবেদনশীলভাবে ভিকটিমদের পাশে দাঁড়ান। তারা বুঝতে পারেন যে, এটি একজন সিরিয়াল রেপিস্টের কাজ। তারা গভীর তদন্তের মাধ্যমে ২০১১ সালে ক্রিস্টোফার ম্যাককার্থি (ছদ্মনাম) নামে এক অপরাধীকে গ্রেফতার করেন।

ম্যাককার্থির কম্পিউটার ও হার্ডডিস্ক তল্লাশি করে পুলিশ ভিকটিমদের প্রচুর ছবি উদ্ধার করে। সেই ছবিগুলোর মধ্যে একটি মেয়ের ছবি ছিল, যার বুকের ওপর তার ওয়াশিংটনের আইডি কার্ডটি রাখা ছিল। সেই মেয়েটি আর কেউ নন, স্বয়ং মেরি অ্যাডলার। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, মেরি সম্পূর্ণ সত্যি বলেছিলেন এবং পুলিশি ব্যবস্থার গাফিলতির কারণে একজন সিরিয়াল রেপিস্ট বছরের পর বছর মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল।

সত্য প্রকাশের পর মেরি লিনউড শহরের প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেন এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেড় লাখ ডলার পান। লিনউড পুলিশ বিভাগ তাদের ভুলের জন্য মেরির কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়।

আদালত এই সিরিয়াল ধর্ষককে এমন কঠোর শাস্তি দিয়েছিল, যেন সে বাকি জীবনে আর কখনও কারাগার থেকে বের হতে না পারে। আদালত তাকে কলোরাডো এবং ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের অপরাধের জন্য পৃথকভাবে সর্বোচ্চ সাজা প্রদান করেছিল। তাকে মোট ৩৯৬ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তার কোনও ধরনের প্যারোল (শর্তসাপেক্ষ মুক্তি) পাওয়ার সুযোগ নেই, যার অর্থ তাকে আমৃত্যু কারাগারের ভেতরেই থাকতে হবে।

সবচেয়ে ইতিবাচক ব্যাপার হলো, সেই রেপ ভিকটিমরা ভয়াবহ  ট্রমা এবং পুলিশি হেনস্তা কাটিয়ে নতুন ও সুন্দর জীবন শুরু করতে পেরেছেন। তাদের সুরক্ষার স্বার্থে মিডিয়া ও প্রশাসন তাদের আসল নাম-পরিচয় ও বর্তমান অবস্থান গোপন রেখেছে। অপরাধী গ্রেফতার হওয়ার পর এবং তার কঠোর শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার কারণে তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। পরবর্তীকালে ভিকটিমরা এই সিরিজটি তৈরিতে এজন্যই সম্মত হয়েছিলেন, যেন অন্য কোনও ভিকটিমকে তাঁর বা তাঁদের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়।

এত দূর থেকেও আমরা স্যালুট জানাই কলোরাডোর সেই দুই নারী গোয়েন্দাকে, যাদের আন্তরিক চেষ্টায় প্রকৃত অপরাধীকে ধরা সম্ভব হয়েছে।

আমরা দেখেছি, বাংলাদেশে রেপ ভিকটিমকে সরাসরি সহযোগিতা করার ও সমর্থন জানানোর ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের খুব অভাব। এখানেও ধর্ষণের ভুক্তভোগীকে প্রথমে অবিশ্বাস করা হয়। এরপর তাকে যদি বিচার প্রক্রিয়ায় বারবার একই ঘটনার বর্ণনা দিতে হয়, আক্রমণাত্মক জেরা সহ্য করতে হয়, বা চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তাহলে এটি হয় ‘secondary victimization’ বা ‘দ্বিতীয়বার ভুক্তভোগী হওয়া’— যেটা আমরা ওয়াশিংটনের রেপ ভিকটিম মেরি অ্যাডলারের ক্ষেত্রেও দেখেছি।

ট্রমার কারণে একজন ভুক্তভোগীর আচরণ ‘প্রত্যাশিত’ না-ও হতে পারে, বা কেউ দেরিতে অভিযোগ করেছেন মানেই কিন্তু তার অভিযোগ মিথ্যা নয়। যৌন সহিংসতার শিকার শিশু ও নারী প্রায়ই উদ্বেগ ও বিষণ্নতা, অপরাধবোধ বা আত্মদোষারোপ, সামাজিক কলঙ্কের ভয়, ও পরিবার বা সমাজের চাপের মধ্যে থাকেন।

ধর্ষণ শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়— এটি একজন মানুষের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক জীবনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এরপর বিচার পাওয়ার পথে যদি ভুক্তভোগীকে আবারও অপমান, ভয় বা অবিশ্বাসের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে তারা অনেকেই অভিযোগ করতে ও বিচার প্রক্রিয়া চালাতে নিরুৎসাহিত হন।

তাই ধর্ষণ মামলার ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে আমরা চাই বিচারব্যবস্থার সংবেদনশীল এবং ভুক্তভোগীবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি। রাষ্ট্র কি এমন একটা ইউনিট গঠন করতে পারে না, যে ইউনিট যৌন হয়রানির শিকার নারী, মেয়েশিশু ও ছেলেশিশুদের নিয়েই কাজ করবে। তদন্ত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত রাষ্ট্রযন্ত্র একটি হাত হিসেবে ভিকটিমের পাশে দাঁড়াবে।

এমন একটা ইউনিট চাই, যারা বিনামূল্যে বা খুব স্বল্প ব্যয়ে ভিকটিমকে সব ধরনের আইনি সহায়তা দেবে। যেমন- বৈজ্ঞানিক ও ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ, ডিএনএ পরীক্ষা, ফরেনসিক বিশ্লেষণ, কাউন্সেলিং এবং সাক্ষ্য ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলবে। শুধু ভুক্তভোগীর ‘আচরণ কেমন ছিল’ তার ওপর নির্ভর না করে অন্যান্য প্রমাণের ওপর গুরুত্ব দেবে।

বাংলাদেশে কিছু ইতিবাচক ব্যবস্থা রয়েছে, যেমন- ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’, এবং ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’। এই সেন্টার আইনি সহায়তা প্রদানের সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি যদি ভিকটিমকে সামাজিক হয়রানির হাত থেকে রক্ষা, তদন্তের মানের সামঞ্জস্যতা রক্ষা ও বিচারে দীর্ঘসূত্রিতার বিষয়টি দেখে, তাহলে এর প্রভাব বহুদূর বিস্তৃত হবে। এখন অনেক দেশেই ভিকটিমের নিরাপত্তা, সম্মান, ক্ষমতায়ন ও গোপনীয়তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, আমাদেরকেও তাই দিতে হবে।

ভুক্তভোগীকে অসম্মান বা অপ্রয়োজনীয় কষ্ট না দিয়ে ও প্রমাণের যথাযথ মানদণ্ড বজায় রেখেই বিচার সম্পন্ন করা উচিত। একটি সত্যিকারের ভুক্তভোগীবান্ধব বিচারব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যেখানে ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশু বিচার চাইতে গিয়ে আরেকবার মানসিক নির্যাতনের শিকার না হন। একইসঙ্গে বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ ও  প্রমাণভিত্তিক। একদিকে ভুক্তভোগীর মর্যাদা যেমন একটি বড় বিষয়, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ন্যায়বিচারের প্রতি সমাজের আস্থা যেন বজায় থাকে।

রামিসার মামলার রায় মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে হয়ে যাওয়ার একমাত্র কারণ হলো— এই অপরাধকে রাষ্ট্র নিজে গ্রহণ করেছে এবং সেভাবেই বিচারিক কার্যক্রম চালিয়েছে। এখানে শিশুটি মারা গেছে বলে হয়তো ভিকটিমকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হলো না। সে বেঁচে গেল কঠিন জিজ্ঞাসাবাদ, চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা প্রমাণের অতিরিক্ত চাপের মুখোমুখি হওয়া, ট্রমা, একাধিকবার সাক্ষ্য দেওয়া ও সামাজিক হয়রানির থেকে।

কিন্তু আদালতকে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট, ডিএনএ ও ফরেনসিক প্রমাণ, ঘটনাস্থলের আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষ বা পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য, আসামির জবানবন্দির ভিত্তিতে সেই অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ খুঁজতে হয়েছে। এগুলো সবই আইনগতভাবে প্রমাণের মানদণ্ড।

আমরা শুধু চাই, রাষ্ট্র প্রতিটি ধর্ষণ মামলাকে এমনভাবে চালানোর উদ্যোগ নিক, যাতে ভিকটিমকে মানসিক ও আইনি সহায়তা দেওয়া হয়। দ্রুত বিচার চাই কিন্তু এও চাই যে, ন্যায়বিচারের মান যেন ক্ষুণ্ন না হয়। ধর্ষণ-ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে বিচারব্যবস্থা সংবেদনশীল হোক এবং প্রমাণের প্রক্রিয়া হোক ভুক্তভোগীবান্ধব।

লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক