সীমান্তে ‘পুশইন’: একই আকাশের নিচে বিভক্ত মানবতা 

কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসে থাকা সুমি আক্তার ও বেলাল হোসেনের ছবি শুধু একটি পরিবারের দুর্ভাগ্যের গল্প নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্ত রাজনীতির এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। একদিকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ, অন্যদিকে বাংলাদেশের বিজিবি। মাঝখানে কয়েকজন অসহায় মানুষ, যাদের পরিচয়, নাগরিকত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই রাষ্ট্রের মধ্যে অচলাবস্থা। তাদের প্রশ্ন— “আমরা কোন দেশের মানুষ?”

বিস্ময়কর হলো, এই ঘটনাগুলো এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন বাংলাদেশে দায়িত্ব নিতে এসে ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলছেন, “আমাদের একই আকাশ, একই বাতাস, একই স্বপ্ন।” তিনি আরও বলেছেন, ভারত ও বাংলাদেশের ১৬০ কোটি মানুষ একসঙ্গে চললে বিশ্বমঞ্চে বৃহৎ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া সম্ভব।

কূটনৈতিক ভাষায় এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা। কিন্তু সীমান্তের শূন্যরেখায় বসে থাকা সুমি, বেলাল কিংবা তাদের শিশু সন্তানদের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নটি ভিন্ন। যদি সত্যিই দুই দেশের একই আকাশ ও একই স্বপ্ন থাকে, তাহলে সেই আকাশের নিচে কেন কিছু মানুষ দিনের পর দিন রাষ্ট্রহীনতার অনিশ্চয়তায় পড়ে থাকবে? যদি দুই দেশের সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ হয়, তাহলে বিদ্যমান কূটনৈতিক কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে সীমান্তে মানবিক সংকট তৈরির অভিযোগ উঠছে কেন?

সাম্প্রতিক সময়ে কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাট, সাতক্ষীরা ও কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় কথিত ‘পুশইন’ নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই লোকজনকে সীমান্তে এনে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ভারতের বক্তব্য, তারা অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশিদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর অধিকার রাখে।

এখানেই মূল প্রশ্ন— একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকার কোথায় শেষ হয়, আর আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের দায়বদ্ধতা কোথা থেকে শুরু হয়?

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত বিরোধ, অবৈধ অনুপ্রবেশ কিংবা মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসনের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিদ্যমান। সাধারণ নিয়ম হলো, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাগরিকত্ব যাচাই, প্রশাসনিক তথ্য সংগ্রহ, প্রয়োজন হলে বায়োমেট্রিক মিলিয়ে দেখা এবং দুই দেশের সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত সীমান্ত চেকপোস্টে আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর। অর্থাৎ কোনও ব্যক্তিকে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে সীমান্তে এনে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়ার বিধান এই কাঠামোর কোথাও নেই।

আন্তর্জাতিক আইন রাষ্ট্রকে তার ভূখণ্ডে অবৈধভাবে অবস্থানকারী বিদেশিকে বহিষ্কারের অধিকার দেয়। কিন্তু বহিষ্কার বা ডিপোর্টেশন এবং পুশইন এক বিষয় নয়। ডিপোর্টেশন একটি স্বীকৃত আইনি প্রক্রিয়া, পুশইন একটি বিতর্কিত সীমান্ত আচরণ। একটি আইনের পথ, অন্যটি শক্তির প্রদর্শন হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে।

এই কারণেই দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্য এবং সীমান্ত বাস্তবতার মধ্যে একটি অস্বস্তিকর বৈপরীত্য দৃশ্যমান হয়। একদিকে “একই বাতাস” ও “অভিন্ন স্বপ্ন”-এর ভাষা, অন্যদিকে সীমান্তে পরিচয়হীন মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা। একদিকে আঞ্চলিক সহযোগিতার স্বপ্ন, অন্যদিকে মানবিক সংকটের অভিযোগ। কূটনৈতিক সৌজন্য ও সীমান্ত বাস্তবতার এই ব্যবধানই আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

অবশ্য বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে। কোনও ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশি নাগরিক হলে তাকে গ্রহণ করা বাংলাদেশের দায়িত্ব। ভুল পরিচয়ে কাউকে বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন অন্যায়, তেমনই প্রকৃত নাগরিককে গ্রহণে অনীহাও গ্রহণযোগ্য নয়। তাই সমাধান আবেগে নয়, তথ্যভিত্তিক যাচাইয়ের মধ্যেই নিহিত।

ভারত দাবি করছে, তাদের কাছে হাজার হাজার সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিকের তথ্য রয়েছে। বাংলাদেশ বলছে, অনেক ক্ষেত্রে ভারতীয় নাগরিক, রোহিঙ্গা কিংবা তৃতীয় দেশের ব্যক্তিদেরও বাংলাদেশি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে এটি কেবল সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়— এটি পরিচয়, নাগরিকত্ব ও মানবাধিকারের প্রশ্ন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্নও রয়েছে। যদি দুই দেশের মধ্যে কার্যকর প্রত্যাবাসন কাঠামো থাকেই, তাহলে সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টি করে এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হবে? আন্তর্জাতিক সম্পর্কে শক্তিশালী রাষ্ট্র অনেক সময় কূটনৈতিক আলোচনায় প্রভাব বিস্তার বা চাপ প্রয়োগের কৌশল ব্যবহার করে। ফলে পুশইন বিতর্ককে শুধু প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না। এটি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের সঙ্গেও যুক্ত।

তবে যে ব্যাখ্যাই দেওয়া হোক, সীমান্তের শূন্যরেখায় একটি শিশু ক্ষুধায় বা তৃষ্ণায় কাঁদলে সব রাজনৈতিক যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। মানবিকতার প্রশ্ন তখন রাষ্ট্রনীতির ঊর্ধ্বে চলে যায়।

সমাধানের প্রথম শর্ত হলো, বিদ্যমান প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণ করা। দ্বিতীয়ত, নাগরিকত্ব নিয়ে বিরোধ থাকলেও খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও অস্থায়ী আশ্রয়ের মতো মৌলিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বিষয়টিকে রাজনৈতিক উত্তেজনার হাতিয়ার না বানিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।

সবশেষে, দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে একটি সুন্দর স্বপ্ন রয়েছে— একই আকাশ, একই বাতাস, একই ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই স্বপ্নের সত্যিকারের পরীক্ষা হবে সীমান্তে। কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত চরিত্র কূটনৈতিক মঞ্চের ভাষণে নয়, বরং সবচেয়ে দুর্বল মানুষের প্রতি তার আচরণে প্রতিফলিত হয়।

যেদিন সীমান্তের শূন্যরেখায় বসে থাকা সুমি, বেলাল এবং তাদের সন্তানদেরও একই আকাশের নিচে সমান মর্যাদা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে, সেদিনই ‘অভিন্ন স্বপ্ন’-এর ভাষা কেবল কূটনৈতিক অলংকার হয়ে থাকবে না, তা বাস্তবতার রূপ নেবে।

লেখক:  সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট, জীবন সদস্য, বাংলা একাডেমি