দর্শনকে আবশ্যিক বিষয় করা হোক 

ইকরাম কবীর
২৩ জুন ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ২৩ জুন ২০২৬, ১৪:০০

পড়ালেখা নিয়ে এখন সরকারি পর্যায়ে অনেক কথাবার্তা হচ্ছে। হয়তো অনেক গবেষণাও হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হলে, আমাদের সন্তানেরা কী কী বিষয় পড়লে তাদের উপকার হবে, দেশের উন্নতি হবে– এসব বিষয়ে আমরা দেখছি, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক আলোচনা হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে এসব বিষয়ে জানাচ্ছেন।

আমাদের সন্তানেরা আসলে পরীক্ষায় ভালো ফল করা, চাকরি পাওয়া এবং বর্তমান পৃথিবীতে প্রতিযোগিতা করার জন্য প্রস্তুত হতে চায়। আমরা যারা আশির দশকে এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি তারাও সেই একই চিন্তা থেকে পড়ালেখা করেছি। যদিও আমরা দেখেছি, আমাদের সময় ডাক্তারি ও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার প্রতি সবার ঝোঁক বেশি ছিল, কিন্তু তারপরও আমাদের দেশে অন্যান্য বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও কিছু কারিগরি শিক্ষায় মোটামুটি বিনিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার মাধ্যমে দেশের যেই সামগ্রিক উন্নতি আমরা চাই, তা হয়নি।

কয়েকদিন আগে বিষয় হিসেবে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনে আর ডিগ্রি দেওয়া হবে কী হবে না তা নিয়ে বেশ শোরগোল শুনলাম। কোন বিষয় পড়বো আর কোনটা পড়বো না, কোন বিষয় দেশের কাজে লাগবে বা লাগবে না, তা নিয়ে আলাপ আমরা করতেই পারি। অনেক দেশেই বিষয় নিয়ে সারাক্ষণ আলাপ হচ্ছে। সেই তুলনায় আমাদের দেশে কম হচ্ছে।

তবে আমি একটি বিষয়কে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে চাই– তা হচ্ছে দর্শন। আমি মনে করি, এই বিষয়টির মানুষের মনকে ইতিবাচক চিন্তায় পরিপূর্ণ করে, সমাজকে বদলে দেওয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা আছে। কিন্তু আমাদের দেশে দর্শনকে কোনও গুরুত্বই দেওয়া হয় না। বরং আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, তখন সবাই দর্শনের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে হাসাহাসি করতো।

আমরা যদি এদেশে চিন্তাশীল নাগরিক গড়ে তুলতে চাই, গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে চাই, সমাজে অসহিষ্ণুতা কমাতে চাই, জনপরিসরে আমাদের আচরণ এবং আলোচনার পথ আরও সুগম করতে চাই, সবাইকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করতে চাই, তাহলে আমি মনে করি— আমাদের ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত দর্শনকে বাধ্যতামূলক বিষয় করা উচিত।

দর্শনকে আমরা ভুলভাবে বুঝি। আমরা মনে করি, এটি এমন একটি জটিল বিষয়, যা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা আলোচনা করবেন। দর্শন শব্দটি শুনলেই আমাদের সক্রেটিস-প্লেটো-নিৎসা-সার্ত-কামুর কথা মনে হয়। আমরা মনে করি, দার্শনিকরা আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু ভাবেন এবং আমাদের এমন সব কথা বলে যাবেন, যার সাথে বাস্তব জীবনের কোনও সম্পর্ক নেই।

আমরা ভুল ভাবি। দর্শন আমাদের চিন্তা করতে শেখায় এবং সেই চিন্তাই আমাদের জীবনের বাস্তবতা তৈরি করে। আসলে দর্শন হচ্ছে চিন্তা করার অধ্যয়ন। এটি আমাদেরকে শেখায় কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, যুক্তি-প্রমাণাদি পরীক্ষা করতে হয়, তর্ক-বিতর্ক করতে হয়, দুর্বল যুক্তি চিহ্নিত করতে হয়, ভিন্ন মতামত বুঝতে হয় এবং তারপর, নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। দর্শন আমাদের কী ভাবতে হবে তা নয়, বরং কীভাবে ভাবতে হবে তা শেখায়।

আমাদের মতো একটি অনুন্নত দেশের জন্য এগুলো বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত দেশ হলেও দর্শনের শিক্ষার প্রয়োজন রয়েই যায়।

একসময় আমাদের দেশে অনেক তথ্য ছিল না; আমরা তেমন কিছু জানতে পারতাম না। তবে এখন তথ্যের অভাব আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নয়। আমরা তথ্যের মহাসাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি। আসল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সত্য ও অসত্যের মধ্যে পার্থক্য ধরতে পারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিদিন আমাদের সামনে গুজব, প্রচারণা, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, বিকৃতি এবং বিভ্রান্তিকর গল্পের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা প্রতিদিন হাজার হাজার তথ্যের মুখোমুখি হয়, কিন্তু সেগুলোকে সমালোচনামূলকভাবে যাচাই করতে শেখাতে আমরা পারছি না।

দর্শন এই সমস্যাটির অনেকটা সমাধান দিতে পারে।

যেসব শিক্ষার্থী যুক্তিবিদ্যা ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা শেখে, তারা বুঝতে পারে যুক্তি কীভাবে কাজ করে। তারা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, দুর্বল যুক্তি, আবেগকে ব্যবহার করে মানুষকে প্রভাবিত করার কৌশল এবং প্রমাণহীন দাবিগুলো চিহ্নিত করতে পারে। ফলে ভুল তথ্য বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের শিকার হওয়ার ঝুঁকি তাদের কমে যায়। তারা যা শোনে, তা অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে, প্রশ্ন করতে শেখে।

যে সমাজে মানুষেরা প্রশ্ন করতে শেখে, তাদের প্রতারিত করা যায় না।

সহনশীলতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক মত, ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও সামাজিক শ্রেণির মানুষের বাস। কিন্তু সবার মতামত আমরা গ্রহণ করার জন্যে তৈরি নই। মতের অমিল হলেই আমাদের আলোচনা তিক্ত হয়ে যাচ্ছে, ভীষণ ঝগড়াঝাঁটি হচ্ছে। এর একটি বড় কারণ হলো— আমাদের শেখানোই হচ্ছে না কীভাবে ভিন্নমতকে সম্মান জানিয়ে আলোচনা করতে হয়।

আমার কাছে মনে হয় দর্শন পড়লে ও জানলে মানুষের মধ্যে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিনয় তৈরি হয়। আমরা অন্যের মতামত যা হয়তো আমার মতের সাথে মেলে না, তা মনোযোগ দিয়ে শুনতে শিখি। আমরা বুঝতে শিখি যে, জটিল সমস্যার সহজ উত্তর খুব কমই থাকে। আমরা এটাও বুঝতে পারি যে, দুইজন মানুষ একে অপরের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতেই পারে, কিন্তু তাই বলে তাদের শত্রু হয়ে যেতে হবে না।

আজকের বিভক্ত, বিভ্রান্ত ও মেরুকৃত বাংলাদেশে এই শিক্ষার খুবই প্রয়োজন। যখন একটি দেশের মানুষ একে অপরকে আক্রমণ না করে যুক্তি ও ধারণা নিয়ে আলোচনা করতে পারে, তখন সেই দেশ আরও পরিণত হয়ে ওঠে বলে আমার বিশ্বাস।

দর্শনচর্চার আরেকটি বড় উপকার হচ্ছে নৈতিক বিকাশ। প্রতিটি সমাজকেই কিছু মৌলিক নৈতিক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা উচিত? নাগরিকদের একে অপরের প্রতি কী দায়িত্ব রয়েছে? সমাজের সম্পদ কীভাবে বণ্টন হলে সবার উপকার হবে? ন্যায়বিচার বলতে কী বোঝায়? একটি সুন্দর সমাজ কেমন হওয়া উচিত?

ধর্মীয় দর্শনও আমাদের এই শিক্ষাই দেয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমরা ধর্মের দর্শনের শিক্ষা না নিয়ে শুধু খুঁটিনাটি অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিয়ে মেতে থেকেছি। বিশ্বের অনেক দেশ ধর্মীয় দর্শন চর্চা করে, দেশের মানুষকে ধর্ম নিয়ে শিক্ষিত ও আগ্রহী করতে পেরেছে। ধর্ম হচ্ছে ধরম এবং ধরম হচ্ছে কর্ম– আমরা কী কাজ করবো এবং কীভাবে করবো। এটিই দর্শন।

আমি মনে করি, শুধু বিজ্ঞান এবং অর্থ-জ্ঞান দিয়ে এসব প্রশ্নের উত্তর পুরোপুরি ভাবে দেয়া সম্ভব নয়। দর্শন আমাদের ছেলেমেয়েদের নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে উৎসাহিত করবে। এটি তাদের নিজেদের কর্মের পরিণতি বুঝতে সাহায্য করবে। একইসঙ্গে দর্শন তাদের মধ্যে সহমর্মিতা গড়ে তুলবে, কারণ তারা অন্য মানুষ কীভাবে পৃথিবীকে দেখে এবং কীভাবে জীবনকে অনুভব করে, তা নিয়ে ভাবতে শিখবে। দুর্নীতি, অসততা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অসহিষ্ণুতা এবং বৈষম্যের মতো অনেক সমস্যার মূল কারণ প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব নয়। এগুলোর জন্ম হয় নৈতিক বিচারের ব্যর্থতা থেকে।

আমরা ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারি, ব্যাংকিং বা অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষিত হতে পারি, কিন্তু তারপরও অনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি। এমন উদাহরণ আমাদের চারপাশে সারাক্ষণই দেখছি। দর্শন এমন একটি নৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে, যা শুধু কারিগরি বা পেশাগত শিক্ষা দিয়ে তৈরি করা সম্ভব নয়।

দর্শনের অর্থনৈতিক উপকারিতার কথাও বলা যায়। আমরা অনেকেই মনে করি যে, দর্শনের আসলে বাস্তব কোনও মূল্য নেই, কারণ এটি সরাসরি কোনও নির্দিষ্ট পেশার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করে না। কিন্তু এই ধারণা সত্য নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে শ্রমবাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যন্ত্র এরই মধ্যে অনেক প্রযুক্তিগত কাজ সেরে ফেলতে পারছে। প্রযুক্তি আরও যত এগোবে, বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল বা কেরানি টাইপের কাজের বড় অংশই অটোম্যাটিক হয়ে যাবে।

তবে কিছু দক্ষতা সব সময় মূল্যায়িত হবে। আর দর্শন সেই দক্ষতাগুলোই মানুষের মধ্যে গড়ে তুলবে। যেমন ধরুন, চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, নৈতিকভাবে বিচার করার ক্ষমতা, যোগাযোগের এবং পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা।

সারা বিশ্বে এখন বড় বড় এমপ্লয়য়ার-প্রতিষ্ঠানগুলো এই সক্ষমতাকেই কর্মক্ষেত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা বলে মনে করছে। যে শিক্ষার্থী কোনও সমস্যাকে বিশ্লেষণ করতে পারে, উত্তর যাচাই করতে পারে, পরিষ্কারভাবে নিজের কথা বলতে পারে এবং বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে, প্রযুক্তি যতই বদলে যাক না কেন, তার মূল্য কখনও কমবে বলে মনে হয় না। তাই আমি মনে করি, দর্শন অবসর সময়ে পড়ার কোনও বিষয় নয়, এটি জরুরি এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতির জ্ঞান। সব সময়ের জ্ঞান।

পৃথিবীর অনেক দেশ দর্শন শিক্ষার উপকারিতা উপলব্ধি করেছে। এর অন্যতম হচ্ছে ফ্রান্স। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে মাধ্যমিক শিক্ষার শেষ বছরে দর্শন একটি বাধ্যতামূলক বিষয়। ফরাসি শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক চিন্তাধারা সম্পর্কে শেখে এবং জটিল প্রশ্ন বিশ্লেষণের অনুশীলন করে। এর উদ্দেশ্য দার্শনিক তৈরি করা নয়; বরং এমন সচেতন নাগরিক তৈরি করা, যারা চিন্তা করতে পারে।

ফিনল্যান্ডের উদাহরণও দেওয়া যায়। বিশ্বের অন্যতম সফল শিক্ষাব্যবস্থার দেশ হিসেবে ফিনল্যান্ডের প্রশংসা প্রায়ই শোনা যায়। সেখানে ছোটবেলা থেকেই সমালোচনামূলক চিন্তা ও দর্শনচর্চা শিক্ষার অংশ। এই পদ্ধতির কারণে ফিনল্যান্ডে সামাজিক স্থিতি ও নাগরিক আস্থার হার অনেক বেশি।

ইংল্যান্ডে ‘ফিলসফি ফর চিলড্রেন’ নামে দর্শন নিয়ে একটি উদ্যোগ স্কুল পর্যায়ে চালু আছে। তারা গবেষণা করে দেখেছে, এসব কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের যুক্তি প্রয়োগ করার ক্ষমতা, যোগাযোগের দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাস উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়। অস্ট্রেলিয়াতেও স্কুল পর্যায়ে দর্শন শিক্ষার বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। সেখানেও সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দর্শন বিষয়ে ডিগ্রি নিয়ে অনেক ভালো চাকরি হবে, সেই চিন্তা করলে দর্শন পড়ার প্রয়োজন নেই। এই শিক্ষা নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার প্রস্তুতির শিক্ষা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

[email protected].

 

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
হ্যারিকেন লালার পর ধেয়ে আসছে আরেক ঝড় ‘মোকে’, ভারী বৃষ্টির শঙ্কা
হ্যারিকেন লালার পর ধেয়ে আসছে আরেক ঝড় ‘মোকে’, ভারী বৃষ্টির শঙ্কা
মেসি পেলেন ৯২৩তম গোল, কিন্তু... 
মেসি পেলেন ৯২৩তম গোল, কিন্তু... 
একটি ফ্লাইট কেন কখনও নির্ধারিত সময়ের আগেই পৌঁছে যায়
একটি ফ্লাইট কেন কখনও নির্ধারিত সময়ের আগেই পৌঁছে যায়
বাংলাদেশ ব্যাংকের এডি পদে নিয়োগে যেসব প্রস্তুতি জরুরি
বাংলাদেশ ব্যাংকের এডি পদে নিয়োগে যেসব প্রস্তুতি জরুরি
সর্বশেষসর্বাধিক