আমাদের পাশে থাকা মানুষই গৃহকর্মী নির্যাতন করেন। যারা গৃহকর্মী নির্যাতন করেন, তারা আমাদের চিরচেনা দুষ্কৃতকারী নন, বরং এই সমাজের শিক্ষিত ও উচ্চপদস্থ নানা পেশার মানুষ। এরা আমাদের পরিচিতজন, বন্ধুও হতে পারেন। দু’মুঠো খাওয়া, দুটি সস্তা পোশাক, সামান্য কয়টা টাকা ও একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দরিদ্র মানুষগুলো নিজের পরিবার-পরিজন ছেড়ে নগরের দালানবাড়িতে কাজ করতে আসেন। এদের মধ্যে যেমন আছে ৯ বছরের রিক্তামণি, তেমনই আছে তরুণী মিলন দাস।
রিক্তামণিকে ধানমন্ডির একটি উঁচু ভবন থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগ উঠেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে। শিশুটিকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। শিশুটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তার বাঁ হাতও ভাঙা ছিল। এর মাত্র ৩/৪ দিন আগে খুলনার সোনাডাঙ্গা থানার পুলিশের এএসআই দম্পতির বিরুদ্ধে গৃহকর্মী নির্যাতনের। অভিযোগ এসেছে। গৃহকর্মী মিলন দাসের হাত থেকে তরকারির বাটি পড়ে যাওয়ায়, তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন নেমে আসে। মুখসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গরম কড়াইয়ের ছ্যাকা দেওয়া ও কান ধরে উঠ-বস করানোসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের প্রমাণ রয়েছে মেয়েটির শরীরে। অভিযোগ আছে, এধরনের নির্যাতন চালানো হতো প্রায়ই।
এখন দুই অভিযুক্ত দম্পতি রিমান্ডে আছেন। তদন্ত হবে, মামলা চলবে। সমাজের ক্ষমতাধর ও আলিশান একটা অবস্থান থেকে গরাদের ভেতরে প্রবেশের ব্যাপারটা কোনোভাবেই সুখকর নয়। তার ওপরে আছে পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মীদের প্রশ্ন, চাহুনি। জানি না, তারা সন্তানদের কাছে এই আচরণের কী জবাব দেবেন। অবশ্য সন্তানরা যদি গৃহকর্মী নির্যাতনকে কোনও অপরাধ বলে মনে না করে, তাহলে কোন প্রশ্ন থাকবে না। সাধারণত পরিবারে যদি অন্যের ওপর অত্যাচারের প্র্যাকটিস থাকে, তাহলে সন্তান তাই শেখে, সেই আচরণকেই যৌক্তিক বলে মনে করে এবং পরবর্তীকালে সেও তাই করে।
এ প্রসঙ্গে এমন একটা ঘটনার কথা লিখছি, যা গৃহকর্মীর প্রতি আমার ধারণা একেবারে বদলে দিয়েছিল। বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতো ২০/২১ বছরের নূরজাহান। আমি ক্লাশ ফোরে পড়ি। একবার নূরজাহানের ওপর বিরক্ত হয়ে ওকে একটা ধাক্কা মেরেছিলাম। আম্মা তাই দেখে খুব বকা দিলো। যদিও নূরজাহান বলেছিল ‘‘ও ছোট মানুষ, রাগ হইয়া করছে।”
কিন্তু আব্বা-আম্মার কাছে আমার এই আচরণটি ছিল খুবই গর্হিত অপরাধ। আমাকে নূরজাহানের কাছে ক্ষমা চাইতে হলো, কারণ নূরজাহান বয়সে বড়। আব্বা বলেছিল, ‘‘শুধু অভাবের কারণে অন্যের বাসায় কাজ করাটা খুব কষ্টের।’’
নির্দেশ এলে, এরপর থেকে আমি যেন কখনও বাসার গৃহকর্মীর গায়ে হাত না তুলি। কোনও অভিযোগ থাকলে যেন আম্মাকে জানাই।
সেই প্রথম, সেই শেষ। এখন আমি ৬০ বছরের একজন মানুষ। এরপর কোনোদিন আর কারও গায়ে হাত তুলিনি। কাউকে পছন্দ না হলে, অসুবিধা সত্ত্বেও বিদায় করে দিয়েছি। এই কথাগুলো এজন্য বললাম যে, আমাদের পারিবারিক শিক্ষা যেমন, আমরা সেরকম আচরণই শিক্ষা পাই। বাড়িতে থাকা সাহায্যকারী মানুষটিকে আমরা যদি পরিবারের সদস্য বলে মনে করি, তাহলে সেও হয়তো নিজেকে সেইভাবেই তৈরি করবে।
গ্রাম বা শহরের বস্তি এলাকা থেকে গৃহকর্মী হিসেবে যারা কাজ করতে আসেন, তারা সবাই দক্ষ ও সৎ হবেন, এমন কোনও কথা নেই। সবার ব্যবহার সুন্দর নাও হতে পারে। গৃহকর্মীর কাজ গৃহমালিকের নাও পছন্দ হতে পারে। সেক্ষেত্রে তাকে আটকে রেখে নির্যাতন করতে হবে কেন? কেন নির্যাতন করতে করতে মেরে ফেলতে হবে?
এরপর আছে পুলিশি ঝামেলা, আইন-আদালত, কারাভোগ, সালিশ, টাকা দিয়ে মিটমাট করানোর চেষ্টা। এর চাইতে অনেক ভালো হয়, পছন্দ না হলে বিদায় করে দেওয়া। আমরা কেউ কেউ মনে করি, গৃহকর্মী আমাদের ক্রীতদাস। কয়টা টাকার বিনিময়ে তাদের সাথে যা খুশি, তাই করা যায়। এমনকি গৃহকর্মীকে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানিও করা যায়। ভদ্র, শিক্ষিত ও ধনী পরিবার মানেই যে ভালো মানুষের পরিবার, তা কিন্তু নয়।
দেখতে সুন্দর হলেই যে, মন সুন্দর হবে, তাও না। তাইতো গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনাগুলো সেইসব পরিবারেই ঘটছে বা ঘটনা প্রকাশিত হচ্ছে, যে সব পরিবার ‘সম্ভ্রান্ত’ অথবা ‘ধনী’ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে গৃহকর্মী নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট সরকারি কোনও তথ্য নেই। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর তথ্য অনুযায়ী ২০১৯-২০২৩ এই পাঁচ বছরে মোট ১৮৯ জন গৃহকর্মী ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হন।
অধিকারকর্মীরা মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি, কারণ অনেক ঘটনা মামলা পর্যন্ত গড়ায় না বা পারিবারিক ও আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে চাপা পড়ে যায়।
২০২৪-২৫ সালেও দেশে প্রতিবছর কমপক্ষে ৩০/৪০ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। দেশে শিশু ও নারী গৃহকর্মীরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। অধিকাংশই অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করেন, কাজের কোনও সময়সীমা নাই, লিখিত চুক্তি নেই, শ্রম আইনের পূর্ণ সুরক্ষাও পান না। ফলে তাদের প্রতি নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, রহস্যজনক মৃত্যু ও বিচারহীনতার চলছেই।
নিয়োগকর্তার অর্থ ও ক্ষমতার দাপটের কাছে বিচার পাওয়ার অধিকার বারবার হার মেনে যায়। প্রভাবশালী নিয়োগকর্তার চাপে, অনেক পরিবার মামলা করতে চায় না, ঘটনাগুলো আপসের মাধ্যমে চাপা পড়ে যায়।
অনেক মৃত্যুকে ‘আত্মহত্যা’ বা ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হিসেবে দেখানো হয়। যেহেতু আমাদের দেশে প্রায় ৯৫ শতাংশ গৃহকর্মী নারী, কাজেই ভুক্তভোগীদেরও বড় অংশ শিশু ও নারী। শতকরা ৮০ শতাংশ ভুক্তভোগীর বয়স ১৮ বছরের নিচে।
এদের অর্ধেকেরও বেশি কোনও না কোনও ধরনের মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অধিকাংশ গৃহকর্মী নির্যাতিত হওয়ার পরেও কোনও অভিযোগ করেন না, কারণ তাদের বিচার জানানোর কোনও জায়গা নেই। অনেকেই শিশু-কিশোরী, তাদের অন্য কোনও আশ্রয় নেই, গ্রাম থেকে এসে কাউকে চেনেন না এবং পুলিশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না।
নির্যাতনের কথা প্রকাশিত হলে, কেউ নিহত হলে, বা নির্যাতিত হয়ে হাসপাতালে গেলে বিচারের প্রশ্ন আসে। বড় ঘটনাগুলো বা বড় তারকা, পেশাজীবী অভিযুক্ত হলে গণমাধ্যমে আসে এবং আমরা জানতে পারি। এরপর প্রশ্ন আসে বিচারপ্রাপ্তির হার কত? মানবাধিকারকর্মী মতে, অধিকাংশ মামলায় অভিযোগই দায়ের হয় না। প্রভাবশালী নিয়োগকর্তারা সহজেই শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারেন।
অপরাধ করার পর যদি সেটা থেকে কেউ পার পেয়ে যায়, তখন নির্যাতনটা বাড়তেই থাকে। গৃহকর্মী নির্যাতনের ক্ষেত্রে বিচার পাওয়ার নজির খুবই বিরল। অনেক মামলা তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাব, আপস ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে শেষ পর্যন্ত রায় পর্যন্ত পৌঁছায় না।
গত ১০ বছরে বাংলাদেশে গৃহকর্মী নির্যাতনের দুটি মামলায় পূর্ণাঙ্গ বিচার ও সাজা হয়েছে। অধিকাংশ আলোচিত মামলায় এখনও বিচার শেষ হয়নি বা উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে। চট্টগ্রামে ২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এক গৃহকর্ত্রীকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। ঢাকার শেওড়াপাড়ার একটি মামলায়, প্রায় ১৫ বছর পর ২০২৫ সালে এক গৃহকর্ত্রীকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
২০১৫ সালে "গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি" গৃহীত হলেও এটি পূর্ণাঙ্গ আইন নয় এবং বাস্তবায়নও দুর্বল। এখানে গৃহ অভ্যন্তরে থাকা একজন শিশু, কিশোরী ও নারীর উপর যেকোনও ধরনের নিপীড়ণ হতে পারে। তাদের কর্মস্থল ব্যক্তিগত বাসা, যেখানে কোনও নজরদারির ব্যবস্থা নেই।
পাড়া-প্রতিবেশী, গার্ড বা অন্য গৃহকর্মী দেখলে বা বুঝতে পারলেও চূড়ান্ত ঘটনা না ঘটা পর্যন্ত মুখ খুলেন না, ভাবেন ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু আমাদের জানতে হবে কোনও সহিংসতার ঘটনাই ব্যক্তিগত নয়। অনেক নিয়োগকর্তা গৃহকর্মীদের "শ্রমিক" নয়, বরং নিচু শ্রেণির মানুষ হিসেবে দেখেন। ফলে অপমান, মারধর করা ও শাস্তি দেওয়াকে স্বাভাবিক বলে মনে করেন।
সমাজের একটি বৃহৎ অংশকে অবহেলা করে কীভাবে আমরা নিজেরা স্বাচ্ছন্দে থাকতে পারি? অফিস, বাসা, সন্তান, প্রবীণ বা অসুস্থ মানুষ সামলাতে গেলে একজন সাপোর্ট স্টাফ খুব দরকার। গৃহকর্মীরা যেমন নির্যাতনের শিকার হন, তেমনি গৃহকর্মী দ্বারাও নির্যাতনের কথা আমরা শুনেছি, দেখেছি গৃহকর্মীর হাতে খুন হওয়ার মতো ঘটনা।
তাহলে এমন সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাজ, পরিবার আমরা কিভাবেপেতে পারি যেখানে, গৃহকর্মী নির্যাতিত হবেন না, অন্যদিকে তাদের হাতে নির্যাতনের শিকার হবেন না পরিবারের সদস্যরা। সেইকারণেই নিবন্ধনকৃত কোন জায়গা থেকে বা গৃহ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে গৃহকর্মী নিয়োগ দেয়া উচিত। তবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। বিশ্বাস করতে হবে গৃহকর্মও একটি সম্মানজনক পেশা এবং গৃহকর্মী পরিবারের সদস্য, ক্রীতদাস নন।
শাহানা হুদা রঞ্জনা: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক