বিদেশ সফরের একটা আলাদা জৌলুস আছে। লাল গালিচা, গার্ড অব অনার, করমর্দনের ছবি, রাষ্ট্রীয় ভোজ, যৌথ বিবৃতি, সব মিলিয়ে মনে হয়— পৃথিবী যেন নতুন করে ঘুরতে শুরু করেছে। দেশে ফিরে সরকারি প্রচারে তখন একের পর এক বিশেষণ ‘ঐতিহাসিক’, ‘যুগান্তকারী’, ‘নতুন দিগন্ত’, ‘অভূতপূর্ব সাফল্য’। আমাদের রাজনৈতিক অভিধানে এই শব্দগুলো এত বেশি ব্যবহৃত হয়েছে যে, এখন আর সেগুলো শুনে জনগণ খুব একটা বিস্মিত হয় না। বরং তারা অপেক্ষা করে আরও সাধারণ একটি প্রশ্ন করার জন্য, ‘ঠিক আছে, দেশটা কী পেলো?’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়েও সেই প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে চীন সফর শেষে সাংবাদিকেরা জানতে চেয়েছিলেন, নতুন অর্থনৈতিক সহায়তা কী মিললো, বড় কোনও বিনিয়োগের ঘোষণা এলো কিনা। প্রশ্নটি শুনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দৃশ্যত বিরক্ত হন। তিনি বলেন, কোনও সরকারপ্রধান ‘ভিক্ষার ঝুলি’ নিয়ে বিদেশে যান না। আত্মসম্মান নিয়ে যান, সম্পর্কের গভীরতা বাড়াতে যান, দুই দেশের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তুলতে যান।
মন্ত্রী মহোদয় ভুল বলেননি। আসলে একটি স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী বিদেশে গিয়ে ভিক্ষা চাইবে— এমন ধারণা কেবল অশোভন নয়, রাষ্ট্রের জন্য অপমানজনকও। আধুনিক কূটনীতি দানের থালা নিয়ে ঘোরার বিষয় নয়। এটি পারস্পরিক স্বার্থের হিসাব। এখানে কেউ কাউকে ভালোবেসে কিছু দেয় না, সবাই নিজের লাভ- লোকসানের অঙ্ক কষে। চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে বাংলাদেশের সুন্দর চোখ দেখে নয়, যেমন বাংলাদেশও চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে কেবল আবেগের বশে নয়। রাষ্ট্রের বন্ধুত্বেরও হিসাববিজ্ঞান আছে।
কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন জন্ম নেয়। যদি প্রধানমন্ত্রী ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে না-ই গিয়ে থাকেন, তাহলে সফরের ঝুলিতে কী ছিল? জনগণ কি সেই প্রশ্নও করতে পারবে না? গণতন্ত্রে প্রশ্ন কখনও রাষ্ট্রের অসম্মান নয়। বরং জবাবদিহিই রাষ্ট্রের মর্যাদা বাড়ায়।
এই সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে সরকার বলছে, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। আগে ছিল ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ’। এখন হয়েছে ‘কমিউনিটি অব শেয়ার্ড ফিউচার।’ কথাগুলো শেক্সপিয়রের নাটকের সংলাপের মতো, কাব্যময়! কূটনীতির ভাষা বুঝি এমনই হয়। সেখানে একটি শব্দ বদলাতে কখনও বছরের পর বছর আলোচনা চলে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এই নতুন অভিধানের মানে কী?
নাটোরের কৃষক জানতে চাইবেন, এতে সারের দাম কমবে? নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস শ্রমিক ভাববেন, এতে নতুন কারখানা হবে? বেতন-ভাতা বাড়বে? বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা তরুণ জানতে চাইবেন, এতে চাকরির সুযোগ বাড়বে? ব্যবসায়ী হিসাব করবেন, রফতানি বাড়বে কি?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষা আর মানুষের ভাষা এক নয়। তাই কূটনৈতিক সাফল্যকে শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনেই অনুবাদ করতে হয়।
তবে এই সফরকে নিছক আনুষ্ঠানিক বলাও অন্যায় হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দীর্ঘ বৈঠক হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সহযোগিতার
বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে সম্ভাব্য ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের আলোচনা হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মিয়ানমারকে আলোচনায় আনতে সহযোগিতার আশ্বাস এসেছে। অর্থনৈতিক করিডোর, যোগাযোগ, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য— বিভিন্ন ক্ষেত্রেই সহযোগিতার নতুন দরজা খোলার কথা বলা হয়েছে।
এগুলোকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন বিশ্বের রাজনীতি দ্রুত নতুন মেরুকরণের দিকে এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা এখন শুধু বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নেই— প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, সমুদ্রপথ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সব ক্ষেত্রেই দুই পরাশক্তির টানাপড়েন চলছে। ভারত নিজের আঞ্চলিক প্রভাব আরও সুসংহত করতে চাইছে। ইউরোপ নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নিজেকে পুনর্গঠন করছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গুরুত্বও বেড়েছে। বঙ্গোপসাগর, ইন্দো-প্যাসিফিক, আঞ্চলিক যোগাযোগ, সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন আর কেবল একটি ছোট বাজার নয়—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানও। চীন সেটি বোঝে। বাংলাদেশকেও সেটি বুঝতে হবে। তবে এখানেই সবচেয়ে বড় সতর্কতার জায়গা।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনও সামরিক জোট নয়—সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ভারসাম্য। বহু দশক ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা ছিল—সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। আজকের বিশ্বে এই নীতি আগের চেয়ে আরও বেশি প্রয়োজন। কারণ পরাশক্তিরা বন্ধুত্ব করতে যতটা আগ্রহী, নিজেদের প্রতিযোগিতায় অন্যদের টেনে আনতেও ততটাই উৎসাহী।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হওয়া ভালো। কিন্তু সেই সম্পর্ক যেন অন্য কারও সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় দূরত্ব তৈরি না করে। আবার অন্য কারও খাতির করতে গিয়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্কও নষ্ট করা যাবে না। ছোট রাষ্ট্রের কূটনীতি অনেকটা সিঙ্গেল বাঁশের ওপর দিয়ে হাঁটার মতো। একটু এদিক-ওদিক হলেই ভারসাম্য নষ্ট।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, আজকের পৃথিবীতে পররাষ্ট্রনীতি আর নিরাপত্তা আলাদা বিষয় নয়। কথাটি সত্য। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা কিংবা তাইওয়ান প্রশ্ন—সবই দেখিয়েছে, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কূটনীতি এখন একই সুতোয় বাঁধা।
কিন্তু সেই কারণেই আরও বেশি স্বচ্ছতা প্রয়োজন। ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বা কৌশলগত অংশীদারত্ব— এসব বিষয়ে জনগণকে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া দরকার। কারণ জাতীয় নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি জাতীয় আস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
মালয়েশিয়া সফরও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি প্রবাসী শ্রমিক। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে যত আলোচনা হয়, তার পেছনে এই মানুষগুলোর ঘামই সবচেয়ে বড় অবদান। ফলে মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজার, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক শক্তিশালী করা সরকারের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। নতুন সরকারের প্রথম বিদেশ সফর মালয়েশিয়ায় হওয়াটাও একটি রাজনৈতিক বার্তা: অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তবে সফরের প্রকৃত মূল্যায়ন কখনও সংবাদ সম্মেলনের মঞ্চে হয় না। আমাদের দেশে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার ইতিহাস দীর্ঘ। ফাইলের পর ফাইল ভরা আছে এমওইউ দিয়ে। অনেক প্রকল্প উদ্বোধনের আগেই সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে আর আলোর মুখ দেখেনি। তাই জনগণ এখন ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন দেখতে চায়। তারা জানতে চায়, কত বিনিয়োগ এলো, কত কারখানা হলো, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো, কতটা রফতানি বাড়লো।
সরকারেরও উচিত হবে এই প্রশ্নগুলিকে বিরক্তিকর মনে না করে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করা। কারণ জনগণ সরকারের প্রতিপক্ষ নয়— জনগণই সরকারের সবচেয়ে বড় অংশীদার। যে সরকার প্রশ্ন শুনতে চায় না, সে একসময় উত্তর দেওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে।
আরেকটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। চীন কোনও দাতব্য সংস্থা নয়। যুক্তরাষ্ট্রও নয়। ভারতও নয়। প্রত্যেক দেশ নিজের জাতীয় স্বার্থ নিয়েই এগোয়। বাংলাদেশকেও তাই করতে হবে। আবেগ দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি চলে না— চলে ঠান্ডামাথার হিসাব দিয়ে। বন্ধুত্বের হাত মেলাতে হয়, কিন্তু নিজের হাতের আঙুল গুনে গুনে।
শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই দুই সফরকে কেবল সৌজন্য সফর বললে যেমন ভুল হবে, তেমনই এটিকে এখনই যুগান্তকারী সাফল্যের তকমা দেওয়াও তাড়াহুড়ো হবে। বলা ভালো, সফরটি সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। কিন্তু দরজা খোলা আর ঘরে প্রবেশ করা এক জিনিস নয়। সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন দক্ষ কূটনীতি, দ্রুত বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সবচেয়ে বড় কথা— স্বচ্ছ জবাবদিহি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, কোনও সরকারপ্রধান ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বিদেশে যান না। কিন্তু জনগণও কাউকে ভিক্ষা চাইতে পাঠায় না। তারা পাঠায় দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে, নতুন সুযোগ তৈরি করতে, ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে তুলতে। তাই সফরের সবচেয়ে বড় সাফল্য প্রেস বিজ্ঞপ্তির বিশেষণে নয়, মানুষের জীবনে তার প্রভাবেই মাপা হবে।
লাল গালিচা একদিন গুটিয়ে যায়। করমর্দনের ছবিও কয়েক দিনের মধ্যে পুরোনো হয়ে যায়। যৌথ ঘোষণাপত্রও একসময় আর্কাইভে চলে যায়। কিন্তু যদি সেই সফরের ফলে তিস্তার পানি ব্যবস্থাপনায় অগ্রগতি হয়, নতুন শিল্প গড়ে ওঠে, কর্মসংস্থান বাড়ে, রফতানি বৃদ্ধি পায়, রোহিঙ্গা সংকটে কার্যকর অগ্রগতি আসে এবং বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়, তাহলে ইতিহাস এই সফরকে মনে রাখবে। আর যদি সবকিছু কেবল ঘোষণার মধ্যেই আটকে থাকে, তাহলে জনগণ আবারও সেই পুরোনো প্রশ্নটাই করবে, ‘বিদেশ সফর হলো, কিন্তু দেশ আসলে কী পেলো?’
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট