সম্প্রীতির বাংলাদেশ বনাম উগ্রবাদের কালো ছায়া

ফারিন বিনতে জহির
২৮ জুন ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ২৮ জুন ২০২৬, ১২:০০

গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অর্জন এককথায় অনন্য। কিন্তু এই সব দৃশ্যমান সাফল্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে, যদি রাষ্ট্র তার সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্বটি পালনে ব্যর্থ হয়, আর তা হলো ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠা।

বাংলাদেশ আজ এক সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। নতুন নির্বাচিত সরকারের সামনে যেমন রয়েছে জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের বিশাল সুযোগ, ঠিক তেমনই সামনে এসেছে কিছু গভীর উদ্বেগ, যা উপেক্ষা করলে আমাদের জাতীয় স্থিতিশীলতা হুমকিতে পড়তে পারে।

এর মধ্যে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক প্রবণতা হলো— আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এক সর্বনাশা সংস্কৃতি বা ‘মব ভায়োলেন্স’। রাজনৈতিক ক্ষোভ, আদর্শিক ভিন্নতা, ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট কিংবা সামাজিক হতাশাকে পুঁজি করে বিভিন্ন গোষ্ঠীর আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ইদানিং আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। একটি সভ্য সমাজে যখন উন্মত্ত জনতা একাধারে বিচারক, জুরি এবং জল্লাদের ভূমিকা নেয়, তখন রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দুর্বল হতে বাধ্য। এই ‘মব রুল’ বা জনতার শাসন শেষ পর্যন্ত এক ভীতিকর দায়হীনতার সংস্কৃতি তৈরি করে।

জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকারের প্রধানতম দায়িত্ব হলো— আইনশৃঙ্খলার পূর্ণ পুনরুদ্ধার। অন্তর্বর্তীকালীন পর্ব পার হয়ে দেশ এখন একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোতে প্রবেশ করেছে। তাই এই নির্বাচিত সরকারের আমলে কোনও অপরাধী, উগ্রপন্থী বা আইন অমান্যকারী যেন কোনও ধরনের ‘সেফ জোন’ বা নিরাপদ আশ্রয়স্থল না পায়, তা নিশ্চিত করার দায় সম্পূর্ণভাবে এই প্রশাসনের।

মব ভায়োলেন্স কেবল তাৎক্ষণিক ভুক্তভোগীকেই শেষ করে না, বরং রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। সাধারণ মানুষ যখন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, আদালতের চেয়ে রাজপথের জনতাই দ্রুত বিচার করতে পারে— তখন বিচার বিভাগ, পুলিশ ও পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থা চিরতরে হারিয়ে যায়। ইতিহাস বলে, মব কালচারকে শুরুর দিকেই কঠোর হস্তে দমন না করলে তা পরবর্তীকালে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

তাই সরকারের উচিত কোনও আপস না করে, অপরাধীর রাজনৈতিক বা আদর্শিক পরিচয় বিবেচনা না করে, শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করা। প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। আইনের সিলেক্টিভ বা বেছে বেছে প্রয়োগ সমাজকে আরও মেরুকরণের দিকে ঠেলে দেবে। সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগই পারে জনগণের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনতে।

আইনশৃঙ্খলার এই সংকটের মধ্যেই আরেকটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও আশঙ্কাজনক ঘটনা সামনে এসেছে। সম্প্রতি সাভারে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের গায়ে পাকিস্তানের প্রাতিষ্ঠানিক সিল বা চিহ্ন থাকার খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গভীর এবং স্বচ্ছ তদন্তের দাবি রাখে।

কোনও সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণিত তথ্য ছাড়া এই ঘটনার পেছনে বিদেশি রাষ্ট্রের সরাসরি হাত রয়েছে কিনা, সে বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্যে যাওয়া হয়তো তাড়াহুড়ো হবে। তবে এই ঘটনা আমাদের একটি নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে— অবৈধ অস্ত্রের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ চক্রের হাত থেকে বাংলাদেশ এখনও সম্পূর্ণ সুরক্ষিত নয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের ইতিহাস বেশ পুরোনো। আঞ্চলিক ব্ল্যাক মার্কেট ও চোরাই রুটগুলো এখনও সক্রিয়। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিপন্ন করতে পারে, এমন যেকোনও ধরনের বিদেশি অনধিকার চর্চা বা প্রভাবের বিষয়ে ঢাকাকে চরম সতর্ক থাকতে হবে। পাকিস্তানসহ সব দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বজায় রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত— জাতীয় নিরাপত্তা, নিজস্ব গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং কৌশলগত সতর্কতা।

বিশেষ করে বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ায় যখন ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তুঙ্গে, তখন এই নিরাপত্তা ইস্যুটি আরও জটিল আকার ধারণ করে। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এখন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর নজরকাড়ার কেন্দ্রে। ফলশ্রুতিতে, অনেক আন্তর্জাতিক পক্ষই তাদের নিজস্ব স্বার্থ হাসিলের জন্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আদর্শিক পরিমণ্ডলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশে উগ্রবাদী ও চরমপন্থী সংগঠনের তৎপরতা নিয়ে বিদেশি প্রতিনিধিদের দেওয়া বিভিন্ন সতর্কতা বা প্রতিবেদনকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। তবে একইসঙ্গে, এই দাবিগুলোকে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে বাংলাদেশের নিজস্ব গোয়েন্দা মূল্যায়ন এবং স্বাধীন তদন্তের কষ্টিপাথরে যাচাই করতে হবে। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা নীতি যেন কোনও বাইরের দেশের ‘ন্যারেটিভ’ বা প্রচারণায় চালিত না হয়ে, কেবলই আমাদের নিজস্ব এবং যাচাইকৃত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।

ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশ একটি মডারেট, সহনশীল ও বহুত্ববাদী সমাজ হিসেবে পরিচিত— যেখানে ভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে আসছে। এই অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি কেবল জাতীয় গৌরবের বিষয়ই নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, বৈদেশিক বিনিয়োগ, পর্যটন এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও আমাদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা রাজপথে কোনও ধরনের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, ধর্মীয় উগ্রবাদ কিংবা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা বাংলাদেশের বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করতে পারে। আজকের এই বিশ্বে যেকোনও অভ্যন্তরীণ সহিংসতা মুহূর্তেই আন্তর্জাতিক সংবাদের শিরোনাম হয় এবং দেশের ভাবমূর্তি নির্ধারণ করে। অতএব, কোনও রাজনৈতিক বা আদর্শিক গোষ্ঠীকে যেন ঘৃণা, বা সহিংসতা ছড়ানোর সুযোগ না দেওয়া হয়, তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

নির্বাচিত সরকারের সামনের চ্যালেঞ্জটি কেবল রাজপথের নিরাপত্তা রক্ষা নয়, বরং যে সাংবিধানিক মূল্যবোধের ওপর বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে, তাকে রক্ষা করা। উগ্রপন্থী বা সহিংস গোষ্ঠীগুলোকে জনপরিসর দখল করতে দিলে রাষ্ট্র তার নিয়ন্ত্রণ হারাবে।

দেশের সিংহভাগ মানুষ শান্তি, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সামাজিক সম্প্রীতি চায়, অনন্তকাল ধরে চলা রাজনৈতিক সংঘাত বা অস্থিতিশীলতা নয়। আইনের শাসনের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে একটি সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী কৌশল নিয়ে এগোতে হবে— প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে স্পষ্ট এবং কঠোর নির্দেশনা দিতে হবে, যাতে কোনও মব বা জমায়েত সহিংস রূপ নেওয়ার আগেই তা প্রতিহত করা যায় এবং উসকানিদাতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা যায়।

দ্বিতীয়ত, অবৈধ অস্ত্র চোরাচালান, উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক এবং বিদেশি সংযোগ রয়েছে এমন সন্দেহভাজন কার্যক্রমের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি দ্বিগুণ করতে হবে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক নেতা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সামাজিক ইনফ্লুয়েন্সারদের এগিয়ে আসতে হবে, যাতে তারা প্রকাশ্যে মব জাস্টিসের নিন্দা জানান এবং শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে দাবি আদায়ের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করেন।

চতুর্থত, তৃণমূল পর্যায়ে বিভিন্ন সম্প্রীতিমূলক কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে তরুণ সমাজ যেন কোনও ধরনের উগ্রবাদের দিকে ধাবিত না হয়, সেজন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে।

পঞ্চমত, সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন এটা অনুভব করতে পারে যে, আইন সবার জন্য সমান, তা তিনি সামাজিকভাবে যত প্রভাবশালীই হোন না কেন।

ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশ বরাবরই সংকটকাল পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো এক স্থিতিস্থাপক জাতি। আমরা যুদ্ধ, রাজনৈতিক সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠেছি কেবল যৌথ সংকল্পের জোরে। মব ভায়োলেন্স, অবৈধ অস্ত্র আর উগ্রবাদের এই নতুন আপদকেও আমাদের প্রজ্ঞা, পেশাদারিত্ব এবং ন্যায়ের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে।

কোনও গোষ্ঠীই আইনের ঊর্ধ্বে নয়, জনগণের রায়ে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকারের সামনে এটি প্রমাণ করার এক ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মবের গায়ের জোরে নয়, বরং নির্বাচিত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল রাজনৈতিক প্রয়োজন নয়, বরং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার অপরিহার্য শর্ত।

আমাদের সামনে পথ এখন দুটি— হয় আমরা একটি ভীতিকর মব কালচারের কাছে রাষ্ট্রকে সঁপে দেবো, না হয় প্রতিষ্ঠানের হাতে বিচার সোপর্দ করে আইনের শাসনকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবো। আজ আমরা কতটা দৃঢ়ভাবে এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়াবো, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনের বাংলাদেশের স্থায়িত্ব এবং বৈশ্বিক ভাবমূর্তি।

লেখক: পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব লুইভেল, যুক্তরাষ্ট্র

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
অভিমান ভুলে রাজপ্রাসাদে ফিরছেন হ্যারি-মেগান, নাতি-নাতনির অপেক্ষায় রাজা চার্লস!
অভিমান ভুলে রাজপ্রাসাদে ফিরছেন হ্যারি-মেগান, নাতি-নাতনির অপেক্ষায় রাজা চার্লস!
একসাথে মরতে গাড়িতেই বোমা ফাটালেন সাবেক প্রেমিক, তারপর যা ঘটলো
একসাথে মরতে গাড়িতেই বোমা ফাটালেন সাবেক প্রেমিক, তারপর যা ঘটলো
কড়াইল বস্তিসহ ৫৮ এলাকায় ১ লাখ ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা
কড়াইল বস্তিসহ ৫৮ এলাকায় ১ লাখ ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা
নির্যাতিত নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনে বাজেটে বরাদ্দ রাখার আহ্বান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর
নির্যাতিত নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনে বাজেটে বরাদ্দ রাখার আহ্বান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর
সর্বশেষসর্বাধিক