একটা মুভি দেখলাম। হিন্দি মুভি। দিল ধড়কনে দো। এখানে একটা বিষয় ছিল— স্বামী এবং শাশুড়ি বারবার বলছেন— তারা তাদের ছেলের বউকে কাজ করার, নিজের কোম্পানি খোলার স্বাধীনতা দিয়েছেন। আগে ওই পরিবারের বউদের চাকরি করার অনুমতি ছিল না। উত্তরও তারা পেয়েছেন— ওই বউয়ের স্বাধীনতা কি তার স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির পকেটে থাকে? পকেট থেকে বের করলেন আর দিয়ে দিলেন!
আমরাও কিন্তু প্রায়ই বলি— আমার স্বামী কত ভালো, আমাকে অনেক স্বাধীনতা দেয়। ইচ্ছেমতো শপিংয়ের স্বাধীনতা, বাবার বাড়ি যাওয়ার স্বাধীনতা। এমনকি ১৮ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদেরও বলতে শুনেছি—আমার বাবা অনেক ভালো, আমাকে অনেক স্বাধীনতা দিয়েছে! আবার অনেক নিরপেক্ষ সাংবাদিক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষের বিশিষ্টজনদের দেখেছি, সরকারের কাছে আবেদন করছেন, ‘আমাদের কথা বলতে দিন! বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেবেন না।’
এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার— যখন একটা মানুষ অন্যের অধীনে থাকে, তখনই তাকে স্বাধীনতা দিতে হয়। আমরা রাষ্ট্রের অধীন। বউ স্বামীর আর আমাদের দেশের সন্তানরা চাকরি পাওয়ার আগ পর্যন্ত বাবা-মায়ের অধীনে থাকেন। কিছু ব্যতিক্রম আছে, থাকে। তবে সেটা উদাহরণ, সর্বজনীন নয়।
আমাদের মতো ছোট্ট ও গরিব দেশের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে এই অধীনতার মনস্তত্ত্ব এমনভাবে মিশে আছে যে, এখানে অধিকারকে ভাবা হয় অনুগ্রহ, আর স্বাধীনতাকে মনে করা হয় ওপরওয়ালার দেওয়া উপহার।
অথচ মানবাধিকারের সংজ্ঞায় কী বলা হয়েছে? মানুষ পৃথিবীতে জন্ম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কিছু অধিকার নিয়ে জন্মায়। এগুলো রাষ্ট্র, সরকার, পরিবার কিংবা কোনও ব্যক্তির দান নয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা জাতীয়তা— কোনও কিছুর ভিত্তিতেই এই অধিকার বদলে যাওয়ার কথা নয়। বেঁচে থাকার অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার, মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের অধিকার— এসব মানুষের জন্মগত অধিকার। কাগজে-কলমে সংজ্ঞাটা খুব সুন্দর।
এখন দেখি বড় বড় দেশগুলোতে কী হয়? যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপিয়ান দেশগুলোতে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে পরিবার খুব বেশি হস্তক্ষেপ করতে পারে না। ব্যক্তি স্বাধীনতা অন্যের পকেটে থাকে না। সেখানে সাধারণ মানুষ মোটামুটি ন্যায়বিচার পায়, মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় খুব কমই। রাষ্ট্র ও আইন ব্যক্তির অধিকারের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অবশ্যই সেসব দেশে সব সমস্যা শেষ হয়ে যায়নি, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও ঘটে। তবে ব্যক্তি অধিকারের ভাষাটি সেখানে অনেক বেশি প্রতিষ্ঠিত।
কিন্তু বিশ্বমঞ্চে এসে ছবিটা যেন বদলে যায়। বিশ্বমঞ্চে এই মানবাধিকার কি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ হয়? আমাদের পাশের দেশ ভারত, অনেক বড় দেশ। সেখানে কি সংখ্যালঘু নির্যাতন হয় না? ধর্মের নামে সেখানে কি সংখ্যালঘুদের ওপর আইন করে অনেক কিছু চাপিয়ে দেওয়া হয় না? সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দেশটিতে বিতর্ক রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্ম, জাতিগত পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক মতের কারণে মানুষ বৈষম্যের শিকার হয়। প্রশ্ন হলো, মানবাধিকার যদি সত্যিই সর্বজনীন হয়, তাহলে এই বৈষম্যগুলো কেন এত দীর্ঘস্থায়ী?
এই যে এখন ইরান যুদ্ধ চলছে—আচ্ছা, এই ইরানের ওপর আচমকা যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় কি মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়নি? প্রথমেই তারা হামলা চালিয়েছিল ইরানের একটি স্কুলে। ছোট ছোট শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়নি?
গাজার দিকে তাকান। ইসরায়েলি হামলায় সেখানে নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। ঘরবাড়ি স্কুল-কলেজ, এমনকি হাসপাতাল পর্যন্ত গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে কোন মানবাধিকারটা রক্ষা করা হয়েছে? ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কথা না হয় বাদই দিলাম। ইউক্রেনকে তবু বড় বড় দেশগুলো সাহায্য করছে। সেখানে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটলেও— আন্তর্জাতিক সহায়তা, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বৈশ্বিক সংহতি অনেক বেশি দৃশ্যমান ছিল। কিন্তু গাজার মানুষগুলোর পাশে কে দাঁড়িয়েছে? এখনও সেখানে খাবার, পানি, বাসস্থান, চিকিৎসার জন্য হাহাকার চলছে। আচ্ছা, গাজা বা ইরানের শিশুর কি বেঁচে থাকার অধিকার নাই? যেখানে বাঁচতেই দেওয়া হচ্ছে না, সেখানে মৌলিক সুযোগ-সুবিধা ও স্বাধীনতাগুলো ভোগ করবে কী করে?
আবার যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর মানবাধিকার বিষয় রিপোর্ট প্রকাশ করে। যেখানে কোন কোন দেশগুলোতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে— সেটা লেখা থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের এই মানবাধিকার রিপোর্টের চেয়ে বড় কৌতুক আর কী হতে পারে? যে রাষ্ট্র নিজে ইরানে হামলা চালাচ্ছে, গাজায় বা লেবাননে বোমাবর্ষণের পেছনের কুশীলবদের মদদ দিচ্ছে, সে-ই আবার পৃথিবীর বাকি অংশকে মানবাধিকারের ছবক দিচ্ছে!
এই বৈশ্বিক ও সামাজিক বাস্তবতাই আজ মানবাধিকারের সংজ্ঞাটিকে উল্টেপাল্টে দিচ্ছে। আর এই পরিবর্তনের পেছনে কাজ করছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর।
পরিবারে যেমন স্বামী বা শ্বশুরবাড়ি মনে করে চাকরি করতে দেওয়াটা তাদের দয়া বা মহানুভবতা, বিশ্বরাজনীতিতেও পরাশক্তিগুলো ঠিক একই মনস্তত্ত্ব খাটায়। গাজা বা ইরানের শিশুদের বেঁচে থাকার অধিকারটা তাদের জন্মগত অধিকার ছিল না, সেটা যেন পরাশক্তিদের দয়ার ওপর নির্ভরশীল। গাজাবাসীদের সহায়-সম্বলহীন ভিখারি বানিয়ে তারা যখন আবার আকাশ থেকে ত্রাণের প্যাকেট ফেলে, তখন তারা আসলে মানবাধিকার রক্ষা করে না, নিজেদের অপরাধবোধ ঢাকার একটা মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেলে। সাধারণ মানুষও অবচেতনভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করে— অধিকার কোনও সহজাত বিষয় নয়, এটা শক্তিশালী পক্ষ থেকে পাওয়া এক ধরনের খয়রাত বা দান। এই বিশ্বাসই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ তখন মানুষ নিজের অধিকার দাবি করতেও সংকোচ বোধ করে। সে কৃতজ্ঞ হতে শেখে, প্রতিবাদ করতে নয়।
কাগজে লেখা আছে মানবাধিকার সবার জন্য সমান। কিন্তু গাজার শিশুর রক্ত আর ইউক্রেনের শিশুর রক্তের রঙ কি এক দেখায় বৈশ্বিক গণমাধ্যম? না। এখানে কাজ করে অন্যকরণের মনস্তত্ত্ব। বছরের পর বছর ধরে নির্দিষ্ট কোনও জাতি, ধর্ম বা বর্ণের মানুষের মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি কিংবা দুর্ভোগ দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাই। এক সময় আমাদের ভেতরে এক ধরনের ‘সহানুভূতির ক্লান্তি’ তৈরি হয়। আমরা তখন টিভির পর্দায় শিশুর লাশ দেখেও ভাত খেতে পারি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুদ্ধের ছবি স্ক্রল করে পরের ভিডিওতে চলে যাই। আমাদের মনস্তত্ত্ব এটাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়। আমরা অবচেতনভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করি, পৃথিবীর কিছু মানুষের জীবন যেন অন্যদের তুলনায় কম মূল্যবান। তখন মানবাধিকারের সংজ্ঞাটাও অদৃশ্যভাবে বদলে যেতে থাকে।
মানবাধিকারের নতুন সংজ্ঞা তাই আজ আর সর্বজনীন নয়— এটি এখন চামড়ার রঙ, ভৌগোলিক অবস্থান আর পাসপোর্টের ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী আর বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী কি সব জায়গায় একই ধরনের সমাদর পায়?
যখন পরিবারে একজন নারী, সমাজে একজন সংখ্যালঘু, কিংবা বিশ্বে গাজা-ইরানের মতো ভূখণ্ডের মানুষ দেখে—যেকোনও নিয়ম বা সনদ তাদের বাঁচাতে পারছে না, তখন তাদের মনস্তত্ত্বে এক বিরাট ধস নামে। তারা অধিকারের আশা ছেড়ে দিয়ে স্রেফ টিকে থাকার আদিম মনস্তত্ত্বে চলে যায়। তখন মুক্তচিন্তা, বাকস্বাধীনতা বা আত্মমর্যাদার মতো উচ্চতর মানবাধিকারগুলো বিলাসিতা মনে হয়। তখন মানুষের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়— যেকোনও মূল্যে কেবল বেঁচে থাকা। একটি সভ্য সমাজের জন্য মানুষের মনস্তত্ত্বের এই পতন সবচেয়ে বিপজ্জনক।
তাহলে মানবাধিকারের সংজ্ঞাটা আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়ালো? বইয়ের পাতার সেই সুন্দর সংজ্ঞা আমরা প্রতিনিয়ত পড়ছি, নাকি না বুঝে মুখস্থ করছি? বাস্তবতা হলো, মানবাধিকার আজ আর কোনও ধ্রুব সত্য নয়। পরিবারে যেমন এটি আটকে আছে পুরুষের কর্তৃত্ববাদী পকেটে, ঠিক তেমনই বিশ্বমঞ্চে এটি বন্দি হয়ে আছে পরাশক্তিদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের পকেটে। তারা পকেট থেকে ইচ্ছেমতো অধিকার বের করে ইউক্রেনকে দেয়, আবার নিজেদের স্বার্থে গাজা বা ইরানের ক্ষেত্রে তা পকেটে লুকিয়ে ফেলে।
যতক্ষণ না এই পকেট সংস্কৃতির অবসান ঘটছে, যতক্ষণ না পরিবার থেকে রাষ্ট্র— সব স্তরে মানুষ অন্যকে অধিকার দেওয়ার অহংকার ছেড়ে মানুষকে শুধু মানুষ হিসেবে মেনে নিতে শিখছে, ততক্ষণ মানবাধিকারের সংজ্ঞা কেবলই ক্ষমতাবানদের মনস্তাত্ত্বিক ভণ্ডামির দলিল হয়েই টিকে থাকবে। আর সাধারণ মানুষ কেবলই দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাববে— জন্ম নিলে মানুষ হওয়া যায়। কিন্তু মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকারটা চড়া মূল্যে কিনতে হয়!
লেখক: সাইকোলজিস্ট